প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০২৫ ০০:০৫ এএম
ছবি: সংগৃহীত
না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন বরেণ্য শিক্ষাবিদ, কথাসাহিত্যিক ও শিল্প-সাহিত্যসমালোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। গতকাল শুক্রবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে আবারও লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয় তাকে। কিন্তু শুভানুধ্যায়ীদের মঙ্গলকামনা ও চিকিৎসকদের নিরন্তর প্রচেষ্টার পরও সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে বিকাল ৫টায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তিনি রাজধানীর ল্যাবএইড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর ৩ মাস ২২ দিন।
শুক্রবার বিকালে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ল্যাবএইড হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফারুক আহমেদ এবং প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশ-এর প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মরদেহ বারডেমের হিমঘরে রাখা হয়েছে বলে তার পরিবার, বন্ধু ও স্বজনেরা জানিয়েছেন। শিক্ষক, কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও শুভানুধ্যায়ীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আজ শনিবার ১০টা ৩০ মিনিটে তার মরদেহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার সামনে আনা হবে। সকাল ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হবে। এরপর বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা হবে। পরে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হবে।
অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মৃত্যুতে শোকবিহ্বল তার শিক্ষক, পরবর্তী সময়ে সহকর্মী বরেণ্য শিক্ষাবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, ‘খুবই মেধাবী ছাত্র ছিল। আমি যেসব ছাত্র নিয়ে গর্ব করি তাদের মধ্যে একজন মনজুরুল। প্রথমে তাকে ছাত্র হিসেবে পেয়েছি, পরে সহকর্মী হিসেবে। গত ৩ অক্টোবর (শুক্রবার) রাজধানীর ধানমন্ডিতে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে যাওয়ার পথে গাড়িতে অসুস্থ হয়ে পড়েন অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। গাড়িচালক তাকে একজনের সহায়তায় পাশের একটি হাসপাতালে নেন। খবর পেয়ে প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলামসহ অন্যরা সেখানে যান। সেখান থেকে তাকে ল্যাবএইড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা জানান, তার ‘ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক’ হয়েছে। ওইদিন রাতেই তার হৃদ্যন্ত্রে (হার্টে) দুটি রিং পরানো হয়। পরে রবিবার সন্ধ্যায় অবস্থা ‘সংকটাপন্ন’ হলে সৈয়দ মনজুরুলকে ভেন্টিলেশন সাপোর্টে নেওয়া হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ‘ভেন্টিলেশন সাপোর্ট’ ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছিলেন তিনি। সবশেষ গতকাল শুক্রবার সকালে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের শারীরিক অবস্থার গুরুতর অবনতি হলে তাকে সকালে আবারও লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। দিনভর চেষ্টা শেষে এদিন বিকাল ৫টায় চিকিৎসকরা লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নিয়ে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, গত শনিবার থেকে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম স্যারের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। অক্সিজেন লেভেল কমতে থাকে, ফুসফুসে পানি জমার কারণে পরিস্থিতি খারাপের দিকে গেলে গত রবিবার সন্ধ্যায় লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। প্রায় ৪৮ ঘণ্টা লাইফ সাপোর্টে থাকার পর তার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। পরে আবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে পুনরায় লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। বিকাল ৫টায় চিকিৎসকেরা লাইফ সাপোর্ট সরিয়ে নিয়ে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।’
অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ১৯৫১ সালের ১৮ জানুয়ারি সিলেটে শহরে জন্মগ্রহন করেন। তার মা রাবেয়া খাতুন ও বাবা সৈয়দ আমীরুল ইসলাম। তিনি সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৬ সালে মাধ্যমিক এবং ১৯৬৮ সালে সিলেট এম সি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৭২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর করেন। ১৯৮১ সালে তিনি কানাডার কুইন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইয়েটস-এর কবিতায় ইমানুয়েল সুইডেনবার্গের দর্শনের প্রভাব বিষয়ে পিএইচডি করেন। পেশাগত জীবনে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘সিএমআই’ নামে ব্যাপক জনপ্রিয় এই শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরের পর ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশে যোগ দেন। ব্যক্তিজীবনে এক সন্তানের জনক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম। তার ছেলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন।
২০১৮ সালে একুশে পদক প্রাপ্ত বরেণ্য এই সাহিত্যিকের উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থগুলো হলোÑ‘স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠ গল্প’ (১৯৯৪), ‘থাকা না থাকার গল্প’ (১৯৯৫), ‘কাঁচ ভাঙ্গা রাতের গল্প’ (১৯৯৮), ‘অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প’ (২০০১), ‘প্রেম ও প্রার্থনার গল্প’ (২০০৫), ‘সুখদুঃখের গল্প, ‘বেলা অবেলার গল্প’ ইত্যাদি। তার উপন্যাসের মধ্যে রয়েছেÑ‘আধখানা মানুষ্য’ (২০০৬) ‘দিনরাত্রিগুলি’, ‘আজগুবি রাত’, ‘তিন পর্বের জীবন’, ‘কানাগলির মানুষেরা’ ইত্যাদি। তার উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থগুলো হলোÑ‘নন্দনতত্ত্ব’ (১৯৮৬), ‘কতিপয় প্রবন্ধ’ (১৯৯২), ‘অলস দিনের হাওয়া’, ‘মোহাম্মদ কিবরিয়া’, ‘রবীন্দ্রানাথের জ্যামিতি ও অন্যান্য শিল্পপ্রসঙ্গ’ ইত্যাদি। এ ছাড়াও মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কাজী নজরুল ইসলাম, শামসুর রাহমানেরর ওপর তার উল্লেখযোগ্য গবেষণা কর্ম রয়েছে। কথাসাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।