আদম বেপারি চক্রের কীর্তি
সাইফ বাবলু
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:০৫ পিএম
চাঁদপুরের হাওয়া আক্তার চাকরির আশায় মালয়েশিয়ায় যাবেন বলে রাজধানীর এক এজেন্সিকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দেন। কিন্তু কুয়ালালামপুরে পৌঁছানোর পর তিনি ইমিগ্রেশন পার হতে পারেননি। কারণ তাকে পাঠানো হয়েছে ট্যুরিস্ট বা ভ্রমণ ভিসায়। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে চাকরির ভিসা প্রমাণ করতে না পারায় খালি হাতে দেশে ফিরে আসতে হয়েছে তাকে।
হাওয়া আক্তারের মতো এ রকম অনেকেই প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ট্যুরিস্ট ভিসায় তাদের মালয়েশিয়ায় নেওয়া হয়। চাকরি সংক্রান্ত কোনো বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সবাইকে বিমানবন্দর থেকে ফেরত পাঠায় মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন। বাংলাদেশের কতিপয় ট্রাভেল এজেন্সির যোগসাজশে কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরের একটি দালাল চক্র এ কাজে জড়িত বলে জানা গেছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত জুলাই ও আগস্টে ২৬৭ বাংলাদেশি ট্যুরিস্ট ভিসাধারীকে এয়ারপোর্ট থেকে ফেরত পাঠিয়েছে মালয়েশিয়া। পুলিশ বলছে, গত ৮ মাসে ৩ হাজারের বেশি বাংলাদেশি এভাবে ফেরত এসেছেন। কাজ দেওয়ার কথা বলে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৫ লাখ টাকা চুক্তিতে ট্যুরিস্ট ভিসায় তাদের মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল।
পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের ২৫ জুলাই ফেরত আসা বাংলাদেশিদের মধ্যে চাঁদপুরের হাওয়া আক্তার, শরীয়তপুরের জাজিরার মো. আব্দুল আলিম মাতাব্বরের মেয়ে কনিকা আক্তার, একই এলাকার মিলন মাতাব্বরের মেয়ে মিনহা আক্তার, যশোরের ঝিকরগাছার শালংগা গ্রামের মনিরুজ্জামানের ছেলে মো. রাকিবুল আলাম, পিরোজপুরের রামনাথপুর গ্রামের ইউনুছ আলীর ছেলে মো. ইউসুফ আলীসহ ৪৯ জনের সঙ্গে কথা বলেছে পুলিশ। প্রত্যেকেই জানিয়েছেন, এজেন্সি এবং দালাল তাদের চাকরি দেওয়ার কথা বলে ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে। বিমানে ওঠার আগেই দালালের হাতে কমপক্ষে সাড়ে ৩ লাখ টাকা তুলে দিতে হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ২৫ জুলাই ৪৯ বাংলাদেশি ছাড়াও ২৬ জুলাই ৩১ জন, ২৭ জুলাই ৬৭, ২৮ জুলাই ১২, ২৯ জুলাই ১৫ এবং ৩০ জুলাই ৫ বাংলাদেশি মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর বিমানবন্দর থেকে ফেরত আসেন। একই কারণে ৩ আগস্ট ২১ জন, ৫ আগস্ট ৩৫, ৬ আগস্ট ১৮ এবং ৯ আগস্ট ১৪ জন ফেরত আসেন। এসব বাংলাদেশির নাম-পরিচয়, পাসপোর্ট নম্বর, দালালদের মোবাইল নম্বর এবং ট্রাভেল এজেন্সির নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি)।
যোগাযোগ করা হলে সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোস্তাফিজুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গত ৮ মাসে ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় যাওয়া ৩ হাজারের বেশি বাংলাদেশি ফেরত এসেছেন। এর মধ্যে গত ২ মাসে (জুলাই-আগস্ট) ফেরত আসা ২৬৭ জন বাংলাদেশির নাম-ঠিকানা পাওয়া গেছে। তারা ২৪টি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে গেছেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, ইতোমধ্যে পুলিশ ফেরত আসা বাংলাদেশিদের সঙ্গে যোগযোগ শুরু করেছে। তারা প্রতারণার শিকার হলেও অজানা ভয়ে কিংবা পুনরায় মালয়েশিয়া যাওয়ার আশায় মুখ খুলতে চাচ্ছেন না। এর নেপথ্যে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (অ্যাটব) সদস্যভুক্ত বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সির নাম আসতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, জুলাই ও আগস্টে যেসব এজেন্সির বিরুদ্ধে ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে, তাদের মধ্যে রয়েছেÑ টেক অব এসএ, ট্রিপ লাভার লিমিটেড, জান্নাত এয়ার অ্যাভিয়েশন, মুন এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, ডেবন এয়ার অ্যাভিয়েশন লিমিটেড, জিনাতুন এয়ার ট্রাভেলস, টেক অব ট্রাভেলস, ফার্স্ট ট্রিপ লিমিটেড, রহমান ট্রাভেলস হাউস, এফই বিডি লি., টিউইন ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস, এয়ার ট্রাভেলস, এসএস হলিডে, মাই সিভিল ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস, টোটাল ট্রাভেলস সলুয়েশন, সান বে অ্যাভিয়েশন লিমিটেড, এয়ার চ্যানেল ইন্টারন্যাশনাল, মাই এন জেড ওয়ার্ল্ড ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, জাফর ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, এনএসএস ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেল, মেহেরাব এয়ার ইন্টারন্যাশনাল, দরবার ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস, এয়ার ট্রাভেল নুন ও কসমস হলি ডে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন গোয়েন্দা সংস্থা এবং সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ টিমের তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) অতিরিক্ত ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, মালয়েশিয়ার অভিবাসন আইন সম্পর্কে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অধিকাংশের কোনো ধারণা নেই। যেসব বাংলাদেশি ট্যুরিস্ট ভিসায় মালয়েশিয়ায় যাচ্ছেন, তারা অতিসাধারণ এবং গ্রামগঞ্জের খেটে খাওয়া মানুষ। দালালের মিথ্যা আশ্বাসে উন্নত জীবনের আশায় মালয়েশিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করেছেন তারা। শাহজালাল (রা.) বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন চ্যানেল পার করে বিমানে উঠিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি প্রত্যেককেই মালয়েশিয়ায় প্রবেশসহ কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার নিশ্চয়তা দিয়েছে দালাল চক্র। সেই ভরসায় তারা জমিজমা বিক্রি করে অথবা সুদে টাকা ধার নিয়ে দালালদের হাতে তুলে দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই মালয়েশিয়ায় ঢুকতে পারেননি।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, গত ৮ মাসে যেসব বাংলাদেশি ফেরত এসেছেন তার মধ্যে জুলাই ও আগস্ট মাসে ফেরত আসা ২৬৭ বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলেছে বিমানবন্দরে থাকা পুলিশ। তারা জানতে পেরেছেন, কাজ দেওয়ার কথা বলে প্রত্যেকের কাছ থেকে দালালরা সাড়ে ৩ লাখ টাকা নিয়েছেন। চুক্তি মোতাবেক মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর আরও দেড় থেকে ২ লাখ টাকা দিতে হবে। কিন্তু ফেরত আসার পর তাদের কাছে দালাল চক্র এবং ট্রাভেল এজেন্সির নাম-ঠিকানা, মোবাইল নম্বর জানতে চাইলে অনেকেই সেগুলো দিতে অস্বীকার করেন। তার পরও পুলিশ কৌশলে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সি ও দালাল চক্রের নাম-ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করেছে।
মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে জনশক্তি রপ্তানিকারক মো. আলাউদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, মালয়েশিয়ায় ট্যুরিস্ট ভিসার প্রক্রিয়া হয় ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরস এজেন্সির মাধ্যমে। তবে শুধু ট্রাভেল এজেন্সি হলেই হবে না, ওই এজেন্সিকে মালয়েশিয়ার সরকারের তালিকাভুক্ত হতে হবে। ট্যুরিস্ট ভিসা মূলত ট্যুরিস্টদের জন্যই। শ্রমিকদের সেই ভিসায় পাঠানোর বিষয়টি অবশ্যই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সরকারের দায়িত্বশীলদের ব্যর্থতা।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করা জনশক্তি রপ্তানিকারক আলতাফ হোসেন টেলিফোনে এই প্রতিবেদককে জানান, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার এয়ারপোর্টে একটি চক্র রয়েছে। এ চক্রের সহযোগিতায় বাংলাদেশি শ্রমিকরা ট্যুরিস্ট পরিচয়ে মালয়েশিয়ায় যান। মালয়েশিয়ায় বর্তমানে ৫ লাখের বেশি অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছেন, যাদের অধিকাংশ বিভিন্ন সময়ে ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে দেশটিতে প্রবেশ করেছেন।