এম জাহেদ চৌধুরী, চকরিয়া (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১২:১৯ পিএম
প্রতীকী ছবি।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের চকরিয়া অংশ দিন দিন পরিণত হচ্ছে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়। রাতে মহাসড়কসহ চকরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন স্থানে ডাকাতি, ছিনতাই, রশির ফাঁদ পেতে মোটরসাইকেল আরোহীদের টার্গেট করাসহ নানা অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। এতে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারগামী হাজারো যাত্রী প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে যাতায়াত করছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চকরিয়াস্থ মহাসড়কের ফাঁসিয়াখালী, হারবাং, খুটাখালী ও ডুলাহাজারার বিভিন্ন অরণ্যঘেরা ঢালু এলাকায় ও উপজেলার অভ্যন্তরীণ সড়কের কুমারী ব্রিজ, সুরাজপুর, বাদশার টেক, জালিয়াপাড়া, ডুমখালী, বরইতলী, কেবি জালাল উদ্দীন সড়ক, সাহারবিলসহ সড়কের বিভিন্ন স্থানে গাছ ফেলে, গাড়ি দাঁড় করিয়ে ব্যারিকেড, রশির ফাঁদ পেতে বিভিন্ন যাত্রীবাহী যানবাহন ও মোটরসাইকেল আরোহীদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতির ঘটনা ঘটাচ্ছে ডাকাতরা। এতে প্রাণহানি পর্যন্ত ঘটেছে। মহাসড়কের দুপাশে ঘন বন ও অরণ্য থাকায় ডাকাতরা সহজে আড়াল নিতে পারছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এভাবেই গত ৩ মাসে ২০টির বেশি ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। তবে মাত্র কয়েকটি ঘটনা নিয়ে ভুক্তভোগীরা পুলিশের দ্বারস্থ হলেও বেশিরভাগ মানুষ সর্বস্ব খোয়ানোর পরও থানায় অভিযোগ করে না, উল্টো হয়রানির শঙ্কায়। এমনকি কক্সবাজারে আসা পর্যটকরাও দুটি ঘটনা অবহিত করেনি পুলিশকে।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাত ঘড়ির কাঁটায় তখন ১২টা। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফাঁসিয়াখালী ঢালাÑ চারপাশে ঘন অরণ্য, নীরবতা আর অন্ধকারে হঠাৎ ছায়ার মতো নড়ে ওঠে কয়েকজন মানুষ। দুই পাশে দাঁড়িয়ে তারা টেনে ধরে রাখে এক টুকরো মোটা রশি। মুহূর্তেই অচেনা এক ফাঁদ তৈরি হয়ে যায় ব্যস্ত মহাসড়কে।
এ সময় কক্সবাজার থেকে চকরিয়াগামী দুটি মোটরসাইকেল ফাঁকা সড়ক দিয়ে ছুটে আসে ঝড়ের বেগে। আরোহীরা কেউ টেরই পাননি সামনে অপেক্ষা করছে মারণফাঁদ। হঠাৎ রশিতে আটকে তারা ছিটকে পড়েন সড়কের বুকে। ভাঙা হাড়ের শব্দ, গড়াগড়ি খাওয়া শরীর, সবকিছু ঘটে এক পলকে। ঠিক তখনই অন্তরাল থেকে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে ১০-১২ জন সশস্ত্র ডাকাত। হাতে থাকা দা, ছুরি, ধারালো অস্ত্র দিয়ে শুরু হয় এলোপাতাড়ি কোপ। আতঙ্কে-ব্যথায় আর্তচিৎকারে রক্ষা মেলেনি তাদের। লুটে নেওয়া হয় সর্বস্ব। রক্তাক্ত দেহগুলো ফেলে রাখা সড়কে।
কিছুক্ষণ পর দূর থেকে আসা গণপরিবহনের আলোয় দেখা যায় সড়কে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে চার যুবকের দেহ। চালক-যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পুলিশে খবর দেন। স্থানীয়দের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে নেওয়া হয় চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে চিকিৎসক মাহমুদুল হককে (২৫) নামে এক যুবককে মৃত ঘোষণা করেন। মাহমুদুল উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালীর নবী হোসেনের ছেলে। আহতরা হলেন একই এলাকার মো. সাগর (২৫), নূর হোসাইন (২৭) ও ঈদগাঁও থানার ইসলামপুর ইউনিয়নের উত্তরখানগোনা গ্রামের যুবক আবু রায়হান (২৫)। তারা ৪ জন পরস্পর বন্ধু। পরে আহতদের আশঙ্কাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
এ ঘটনার পর পুলিশের একাধিক টিম গতকাল শুক্রবার সকাল ১০টা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে ডাকাতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত একজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তার কাছ থেকে নিহত বাইক যাত্রীর মানিব্যাগ উদ্ধার হয়েছে। একই অভিযানে আরও তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে জিজ্ঞাসাবাদে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।
স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের দাবি, মহাসড়কের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, বাড়তি পুলিশি টহল এবং বনাঞ্চল ও মৎস্য জোনে যৌথ বাহিনীর অভিযান চালানো জরুরি। অন্যথায় রাত্রিকালীন চলাচলে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত সম্ভব নয়।
চকরিয়া থানার ওসি তৌহিদুল আনোয়ার বলেন, মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে নিয়মিত টহল জোরদার করা হলেও জনবলের সীমাবদ্ধতায় সব সময় নজরদারি করা সম্ভব হয় না।
তিনি আরও বলেন, একটি পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়নের প্রায় ৬ লাখ জনসংখ্যা নিয়ে চকরিয়া উপজেলা। উপজেলার পশ্চিমে বিশাল মৎস্য জোন পূর্বে অরণ্যঘেরা পাহাড়। অংশ দুটি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বললেই চলে। প্রায়শই অপরাধ সংঘটিত হওয়া মৎস্যঘেরে অপরাধ ঘটার খবর পেলেও পুলিশ পৌঁছার আগেই অপরাধীরা সটকে পড়ে। ওই এলাকার মৎস্যঘের মালিকরা পুলিশকে সহযোগিতা করলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও অপরাধ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হতো।