× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

হাজারো একর বনভূমি এনজিওর দখলে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব, কক্সবাজার থেকে ফিরে

প্রকাশ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ০৯:৩৮ এএম

উখিয়া-টেকনাফ বনাঞ্চল দখল করে তোলা হয়েছে অফিস, ওয়্যারহাউস। প্রবা ফটো।

উখিয়া-টেকনাফ বনাঞ্চল দখল করে তোলা হয়েছে অফিস, ওয়্যারহাউস। প্রবা ফটো।

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের বনাঞ্চল শুধু আশ্রিত রোহিঙ্গাদের চাপেই সংকুচিত হয়নি; দেশি-বিদেশি সংস্থাও (এনজিও, আইএনজিও) দখল করে নিয়েছে হাজারো একর সরকারি বনভূমি। সরকারি নোটিস ও আইনের তোয়াক্কা না করে এসব সংস্থা অফিস, ওয়্যারহাউস ও স্থাপনা গড়ে তুলেছে। অথচ এই জমি যদি সরকার লিজ দিত, বছরে শতকোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো। পক্ষান্তরে কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে দখলবাজ সিন্ডিকেটের হাতে।

সরেজমিন তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়ার বনভূমি দখলের নেপথ্যে এনজিও-আইএনজিও সিন্ডিকেট। ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে আশ্রয় নিতে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড়ি বনভূমি খুলে দেওয়া হয়। কয়েক বছরের মধ্যে হাজার হাজার একর বন কেটে আশ্রয়স্থল, বাজার ও দোকানপাট গড়ে ওঠে। সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন এনজিও, আন্তর্জাতিক সংস্থা বনভূমিতে অফিস স্থাপন শুরু করে। ওয়ালাপালংয়ের মুহুরীপাড়া এলাকায় বনের বিশাল অংশ দখল করে স্থাপনা করেছে মাইশা এন্টারপ্রাইজ। কোম্পানির ম্যানেজার রাশিক খান নিজের দাপটে স্থানীয়দের প্রবেশও সীমিত করেছেন। সাংবাদিক ঢুকলে ক্যামেরা চালাতে নিষেধ করা হয়। এমনই দৃশ্য মধুরছড়া, কুতুপালং, ফলিয়াপাড়া ও বিভিন্ন এলাকায়। কোথাও গড়ে উঠেছে বিশাল ওয়্যারহাউস, কোথাও অফিস, কোথাও আবার পশুখামারের আড়ালে প্রকল্প চালাচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। তারা সরকারের আদেশ-নির্দেশও মানছে না। সরকারের নোটিস অমান্যের পাশাপাশি তারা অহরহ আইন ভেঙে দাপট দেখিয়ে চলেছে।

২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর বন বিভাগের উখিয়া রেঞ্জ অফিস থেকে ব্র্যাক, ডব্লিউএফপি, আইওএম, ইউএনএইচসিআরসহ ছয়টি এনজিও-আইএনজিওকে নোটিস দেওয়া হয়। নোটিসে ছয় কর্মদিবসের মধ্যে বৈধ কাগজপত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু কোনো সংস্থাই জবাব দেয়নি। বরং তারা আগের মতোই দখল করা স্থাপনায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

বন আইন ১৯২৭ (সংশোধিত ২০০০) অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনে স্থাপনা নির্মাণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অথচ আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে স্থানীয় সংগঠন পর্যন্ত কেউই আইনের তোয়াক্কা করছে না

স্থানীয় সূত্র জানায়, এসব বনভূমি সরাসরি এনজিওরা দখল করেনিতারা স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছেস্ট্যাম্প চুক্তির নামে মাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি সিন্ডিকেটসাবেক উখিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী মধুরছড়ার একটি দখলকৃত জায়গা মাসে সাত লাখ ৫০ হাজার টাকায় ভাড়া দিয়েছেন আন্তর্জাতিক সংস্থা ডব্লিউএফপির কাছেমুহুরীপাড়ার ইব্রাহিম নামে এক দখলদার প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেনÑ তিনি বনভূমি দখল করে এনজিও ফোরামকে ভাড়া দিয়েছেন এবং মাসে লাখ টাকা আয় করছেন।

সচেতন মহল বলছে, এই অর্থ সরাসরি সরকারের কোষাগারে গেলে রাজস্ব আয় হতো শতকোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে এই টাকা চলে যাচ্ছে দখল সিন্ডিকেটের পকেটে। মাসে কোটি টাকা যাচ্ছে দখলদারদের হাতে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এনজিও প্রতিনিধিদের বক্তব্য প্রায় একইÑ তারা দখল করেনি, স্থানীয়দের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছেন। মাইশা এন্টারপ্রাইজের ম্যানেজার রাশিক খান দাবি করেন, তারা হাজি শামশুল আলম নামে এক স্থানীয়ের কাছ থেকে জায়গা ভাড়া নিয়েছেন। তবে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।

ব্র্যাকের কক্সবাজার ডিপিএম শাহরিয়ার শাহ জানিয়েছেন, তাদের একটি টিম আছে, যারা প্রকল্পের জন্য জমি নির্ধারণ করে এবং ভাড়া নেয়। ডব্লিউএফপির কর্মকর্তা লিটন ভূঁইয়া সাংবাদিককে অফিসে প্রবেশে বাধা দেন। পরে জানান বিষয়টি হেড অফিস দেখবে। আইওএমের সিনিয়র কর্মকর্তা মো. নাহিদ নোটিস পাওয়ার পরও কোনো উত্তর দেননি এবং সাংবাদিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে রাজি হননি। অর্থাৎ, সবাই দায় এড়িয়ে স্থানীয় দখলদারদের দিকে আঙুল তুলছেন। কিন্তু সত্য হলোÑ তাদের কার্যক্রম চলছে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে বনভূমিতে।

আরও জানা গেছে, উখিয়া-টেকনাফের এলাকাটি এখন পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠেছে। অথচ পাহাড়ি বনভূমি একসময় হাতি, হরিণ, বন্যশূকরসহ অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল ছিল। এখন দখলকৃত এলাকায় সড়ক কাটা হয়েছে, কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়েছে, বড় বড় স্থাপনা তৈরি হয়েছে। ফলে বন্যপ্রাণী তাদের স্বাভাবিক আবাস হারাচ্ছে। বিশেষ করে এশিয়ান হাতির করিডোর বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বন সংকোচনের কারণে হাতি মানুষের বসতিতে প্রবেশ করছে, বাড়ছে মানুষ-হাতি সংঘাত।

পরিবেশবিদরা বলছেন, এই দখলকৃত কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি হবে এবং উখিয়া-টেকনাফের পরিবেশ চিরতরে ধ্বংস হবে।

অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগের অবস্থান ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় বনভূমি এখন বন্যপ্রাণীর জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। উখিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, এনজিও-আইএনজিওগুলোকে নোটিস দেওয়া হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি। এখন আদালতের মাধ্যমে উচ্ছেদ প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) যারীন তাসনিম তাসিনের সঙ্গে কথা বলতে ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন ধরেননি। এদিকে স্থানীয়দের মতে, প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক দাতাদের ছত্রছায়ায় এনজিও-আইএনজিওর এসব দখল কার্যক্রম চলছেই।

রাজস্ব আদায়ের পথ খুলতে হবে

বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার যদি আইনি প্রক্রিয়ায় বনভূমি ইজারা দিত, তবে বছরে কয়েকশ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতো। কিন্তু এখন অবৈধ দখলদাররা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, সরকার পাচ্ছে না কিছুই। তাদের মতে, দখলকৃত এলাকা জরিপ করে চিহ্নিত করতে হবে। এনজিও-আইএনজিওর সব কার্যক্রম আইনের আওতায় আনতে হবে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে বিকল্প জমিতে স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। দখলবাজ সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

এলাকাবাসীর মতে, উখিয়া-টেকনাফের বনভূমি শুধু রোহিঙ্গা সংকটেই নয়, এনজিও-আইএনজিও, স্থানীয় সিন্ডিকেটের দখলদারিতেও ধ্বংসের পথে। সরকারি নোটিস অগ্রাহ্য করে যারা বনের জমি ব্যবহার করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ এখন সময়ের দাবি। আইন প্রয়োগ করা না হলে উখিয়ার বনভূমি শুধু বিলীনই হবে না, হারাবে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য। আর কোটি কোটি টাকা বেহাত হবে সিন্ডিকেটের হাতে, যা দেশের রাজস্ব খাতের জন্য বড় ক্ষতি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা