রেজুওয়ান কোরেশী, জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১১:৩৬ এএম
ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও অযত্ন-অবহেলায় ধ্বংসের পথে সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও জমিদার বাড়ি। প্রবা ফটো
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার পাইলগাঁও গ্রামে অবস্থিত তিনশ বছরের প্রাচীন পাইলগাঁও জমিদার বাড়ি। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেও অযত্ন-অবহেলায় আজ ধ্বংসের পথে। একসময় এই অট্টালিকায় পুঁথিপাঠ হতো, হতো পালাগান। বাদ যেত না কোনো উৎসব। দরিদ্র-অসহায় কেউই ফিরে যেত না খালি হাতে। ৭০ বছর বয়সি স্থানীয় এক বৃদ্ধা স্মৃতিচারণ করে বলেন, পুজো-পার্বণ, যাত্রাগান, বিচারসভাÑ সবই ছিল এই বাড়িকে কেন্দ্র করে। এ যেন এক জীবন্ত ঐতিহ্যের আঁতুড়ঘর।
প্রায় সাড়ে ৫ একর জমির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই জমিদার বাড়িটি শুধু জগন্নাথপুর নয়, পুরো সুনামগঞ্জ অঞ্চলের ইতিহাস-ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন। দক্ষিণ দিকে বয়ে চলেছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী কুশিয়ারা নদী, যা বাড়িটির নান্দনিকতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, জমিদারি শাসনের পতন ঘটে প্রায় দেড়শ বছর আগে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জমিদার পরিবার ভারতে চলে গেলে এই বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। এরপর থেকে কোনো রকমে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাসাদোপম ভবনটি।
যদিও বর্তমানে বাড়িটি অযত্নে পড়ে রয়েছে, তবুও তরুণ প্রজন্মের অনেকে ইতিহাস জানার আগ্রহে পরিবার নিয়ে ঘুরে আসেন এখানে। পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বাড়ির মধ্যে থাকা বিশাল দুটি শানবাঁধানো দিঘি, কাছারিঘর এবং কারাগার কক্ষ। জমিদার বাবুরা এখানে প্রজাদের বিচার কার্য পরিচালনা করতেন বলে জানা যায়।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই জমিদার বংশের গোড়াপত্তন করেন রাঢ়দেশ থেকে আগত কানাইলাল ধর, যিনি ঘরজামাই হয়ে পাইলগাঁওয়ে বসবাস শুরু করেন। তার বংশধর বালক দাস থেকে এই বংশের বিস্তার ঘটে। পরবর্তীতে উমানন্দ ধর ওরফে বিনোদ রায় মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের কাছ থেকে ‘চৌধুরী’ খেতাব পান।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক অচ্যূতচরণ চৌধুরী পাইলগাঁওর জমিদার বংশের রসময় বা রাসমোহন চৌধুরী হতে প্রাপ্ত সূত্রে লিখেছেন, পাইলগাঁওয়ে বহু পূর্বকালে পাল বংশীয় লোক বসবাস করত। এ গোষ্ঠীয় পদ্মলোচন নামক ব্যক্তির এক কন্যার নাম ছিল রোহিনী। রাঢ় দেশের মঙ্গলকোট হতে আগত গৌতম গোত্রীয় কানাইলাল ধর রোহিনীকে বিয়ে করে ঘরজামাই হয়ে এখানেই বসবাস শুরু করেন। কানাইলাল ধরের আট পুরুষ পরে বালক দাস নামের এক ব্যক্তির উদ্ভব হয়। তার কয়েক পুরুষ পর উমানন্দ ধর ওরফে বিনোদ রায়ের মাধব রাম ও শ্রীরাম নামে দুই পুত্রের জন্ম হয়। মাধব রামের দুই পুত্র মদনরাম ও মোহনরাম। মোহনরামের ঘরে দুর্লভরাম, রামজীবন, হুলাসরাম ও যোগজীবন নামে চার পুত্রের জন্ম হয়। এদের মধ্যে হুলাসরাম চৌধুরী বানিয়াচং রাজ্যের রাজা দেওয়ান উমেদ রাজার অনুগ্রহে আতুয়াজান পরগনায় কিছু ভূমি দানপ্রাপ্ত হন। পরবর্তীতে হুলাসরাম চাষ অযোগ্য ভূমিগুলোকে চাষযোগ্য করে তুললে এগুলোই এক বিরাট জমিদারিতে পরিণত হয়ে ওঠে। হুলাসরামের ভ্রাতুষ্পুত্র বিজয়নারায়ণের একমাত্র পুত্র ব্রজনাথ চৌধুরী জমিদারি বর্ধিত করে এক প্রভাবশালী জমিদারে পরিণত হন। ব্রজনাথ চৌধুরীর দুই পুত্র রসময় ও সুখময় চৌধুরী। রসময় চৌধুরীর পুত্র ব্রজেন্দ্র নারায়ণই ছিলেন এ বংশের শেষ জমিদার।
এই বংশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি ছিলেন ব্রজেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী। তিনি ছিলেন সিলেট কংগ্রেসের সভাপতি এবং আসাম আইন পরিষদের সদস্য। তার পিতা রসময় চৌধুরী এবং দাদা ব্রজনাথ চৌধুরীর হাত ধরেই জমিদারির ব্যাপক প্রসার ঘটে।
কলেজছাত্র রাশিম উদ্দিন বলেন, এটা শুধু একটা বাড়ি না, এটা একটা ইতিহাস। সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্য।
জগন্নাথপুরের প্রবীণ সাংবাদিক অমিত দেব বলেন, জমিদার বাড়িটি সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হলে এটি জাতীয় ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হয়ে উঠতে পারে। দেরি হলে ইতিহাস হারিয়ে যাবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরকত উল্লাহ জানান, পাইলগাঁও জমিদার বাড়ি সংরক্ষণের জন্য যাবতীয় তথ্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জের এই ঐতিহাসিক জমিদার বাড়িটি শুধু ইট-পাথরের একটি প্রাচীন ভবন নয়; এটি এক জীবন্ত ইতিহাস। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, ইতিহাসের পাতায় হয়তো আর বেশিদিন টিকে থাকবে না পাইলগাঁওয়ের জমিদার বাড়িটির নাম।