সাইফুল ইসলাম, সালথা-নগরকান্দা (ফরিদপুর)
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ১৩:০৬ পিএম
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার একটি বিলে ফুটেছে সাদা রঙের শাপলা ফুল। প্রবা ফটো
প্রতিবছর বর্ষাকালেই ফরিদপুরের সালথা উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিল ও নিচু জমির জলাশয় শোভা পায় নানা রঙের জাতীয় ফুল শাপলা। জলাশয়গুলোয় ভাসমান সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে ফুটে রয়েছে সাদা শাপলা। শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করতে শত শত নারী-পুরুষ ও তরুণ-তরুণী নৌকায় ঘুরতে আসছেন প্রতিদিনই। শাপলার কোমলতা যেমন মন ছুঁয়ে যায়, তেমনি এর সরল সৌন্দর্যে লুকিয়ে থাকে গ্রামের নিঃশব্দ কাব্য।
সম্প্রতি সরেজমিন উপজেলার গট্টি ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, খোঁয়াড় গ্রাম ঘেঁষে রাস্তার দক্ষিণ পাশে দোপের (জলাশয়) পানিতে সবুজ পাতার ওপর মাথা উঁচু করে সৌন্দর্য ছড়াচ্ছে সাদা শাপলা। অসংখ্য মানুষের ভিড়। কেউ করছেন ক্যামেরাবন্দি, কেউবা সৌন্দর্য উপভোগ করছেন শাপলার।
এ গ্রামটির সৌন্দর্যে ঘেরা মায়াভরা শাপলা ফুলের বর্ণনা করে হেমায়েত ফকির বলেন, ‘মায়াময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর আমার শৈশব-কৈশোরের বেড়ে ওঠা গর্বের ছোট্ট একটি গ্রাম ‘খোঁয়াড় গ্রাম’। যে গ্রামটির সৌন্দর্য বর্ষাকালে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় জাতীয় ফুল শাপলা। সাদা শাপলা যেমন বাংলাদেশের জনগণের প্রতীক, তেমনিভাবে শাপলার সাদা রঙ আমাদের গ্রামের সহজ-সরল মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। গ্রামের উত্তর ও দক্ষিণ পাশের বর্ষার থইথই পানি আর সঙ্গে সাদা শাপলা ফুল আমাদের গ্রামটিকে এক নৈসর্গিক সৌন্দর্য দিয়েছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসন থেকে এ সৌন্দর্য রক্ষাতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে গ্রামটি হতে পারে ভ্রমণপিপাসুদের জন্য তীর্থস্থান।’
বিপুল জলরাশির উপরিভাগে ফুটে থাকা অজস্র শাপলা শোভা পাচ্ছে। দেখলে মন ভরে যায়। গ্রামবাংলার অকৃত্রিম রূপ, ছায়া-মায়া সবই যেন ধারণ করে আছে এই শাপলার বুকে। বর্ষায় এ গ্রামে শুধু মাটি নয়, হৃদয়ও জেগে ওঠে। আর সেই জাগরণের নিঃশব্দ সাক্ষী হয়ে ওঠে শাপলা ফুল। সাদা, সবুজ আর গোলাপি রঙে সে জানান দেয় প্রকৃতির শুদ্ধ সৌন্দর্যের গল্প। কথাগুলো বলছিলেন গ্রামটির আরেক বাসিন্দা মাফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, চারদিক থেকে ভেসে আসে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কোলাহল। এ ছাড়াও রয়েছে দেশি প্রজাতির হরেক রকমের মাছের আনাগোনা।
খোঁয়াড় গ্রামের আবু মুসা নামের এক যুবক বলেন, এই শাপলার দোপে শুকনোর সময় পেঁয়াজ আর পেঁয়াজ শেষে পাটের চাষ করা হয়। আর এই ক্ষেতে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিবছর গজায় শাপলা ফুলের গাছ। আর এ মনোমুগ্ধকর পরিবেশে শাপলা ফুলের হাসি দেখতে আশপাশের এলাকার তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সের মানুষ প্রতিদিন ভিড় জমায়।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ গ্রামের মানুষ শাপলার ভাসমান ফুলের মধ্য দিয়ে ডিঙি নৌকা কিংবা তালগাছের ডোঙা চালিয়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যান। যেতে যেতে অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করেন। কেউ কেউ হাত বাড়িয়ে তুলে নেয় দুয়েকটি শাপলা ফুল।
তাদের দাবি, একসময় এ গ্রামের মানুষ ও কিশোর-কিশোরীরা বিলঝিলে ও দোপে ডুব দিয়ে শালুক তুলে আনত। শাপলার শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত শালুক সিদ্ধ করে খেয়ে জীবন বাঁচাতেন অনেকে। এখন গ্রামীণ অর্থনীতিও দ্রুত বদলাচ্ছে। মাটির নিচ থেকে শালুক তুলে খাওয়ার লোক তেমন চোখে পড়ে না। তবে অনেকেই শাপলা ফুল সবজি হিসেবে রান্না করে খাচ্ছেন।
সালথা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুদর্শন শিকদার বলেন, আমরাও মাঝেমধ্যে ছুটির দিনে এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাই। শাপলা গ্রামের মানুষ সবজি হিসেবে খেতে খুব পছন্দ করে। আর এ ফুলের বীজ ও গুঁড়ো দিয়ে খই বানানো হয়। যোগ করেন, শাপলা ভাজি করে খেতে খুব মজা। এতে পুষ্টিগুণও আছে। জলজ সবুজ ডাঁটায় আছে ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ।
শাপলা রাজ্যে যেভাবে যেতে পারেন
ফরিদপুর শহর থেকে বাস কিংবা অটোতে করে ৮-১০ কিমি পেরিয়ে ঠেনঠেনিয়া কিংবা বালিয়াগট্টি বাজারে প্রথমে নামবেন। এখান থেকে পুনরায় অটোরিকশা বা ভ্যানে করে খোঁয়াড় গ্রামে গেলেই দেখতে পাবেন শাপলা ফুলের এই মায়াবী সৌন্দর্য।