মাদক চোরাচালান
তানভীর হাসান ও শাহরিয়ার জামান দীপ
প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৪৮ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ভৌগোলিক কারণেই বাংলাদেশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। এশিয়ার মাদক চোরাচালানের তিনটি প্রধান অঞ্চলের কেন্দ্রে বাংলাদেশের অবস্থান। এতে আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছেন। গত ২৫ আগস্ট ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক কোকেন সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বড় চালান। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ গায়ানার নাগরিক ক্যারেন পেতুলা স্টাফেলকে। এরপরই গোয়েন্দারা চালানটির মূল হোতাদের অনুসন্ধানে নামে। পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তারের আগে পেতুলা ব্রাজিল থেকে কাতারের দোহা হয়ে বাংলাদেশে ওই চালান নিয়ে আসেন। তার পরবর্তী গন্তব্য ছিল ভারত। এ ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে থাকা পেতুলাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ ও আইনপ্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে কোকেনের এই চালানের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বড় একটি আন্তর্জাতিক চক্র। যারা মূলত বাংলাদেশ, ভারত, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, তানজানিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গোয়েন্দা নজরদারি আরও বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশের সূত্র বলছে, দেশে কোকেনের চালান ধরা পড়ার অর্থ দেশে নিয়মিতই কোকেন আসছে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় এর অধিকাংশ চালানই ধরা পড়ছে না। বাংলাদেশে কোকেনের চাহিদা নেই। কারণ চিকিৎসা নিতে আসা মাদকসেবীদের মধ্যে এখনও কোকেনসেবী পাওয়া যায়নি। এসব রোগীর ইতিহাস পর্যালোচনা করেই দেশে কোন ধরনের মাদকসেবী আছে, সেটা বোঝা যায়। সুতরাং বলা যায়, মাদক পাচারের অপ্রচলিত পথ হিসেবেই বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
জানা যায়, গত ১০ বছরে ধরা পড়া সব চালানই বাংলাদেশ হয়ে অন্য দেশে যাচ্ছিল। আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রের সদস্যরা কয়েকটি দেশ ঘুরে বাংলাদেশ হয়ে এসব মাদক পাচার করে ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। বাহকের তালিকায় বেশিরভাগই আফ্রিকান নাগরিক।
এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দাদের ধারণা, মাঝেমধ্যে কোকেনের বড় চালান ধরা পড়লেও বেশিরভাগই পার হয়ে যাচ্ছে। এর পেছনে দেশের ‘বিমানবন্দরে স্ক্যানিংয়ে দুর্বলতা’ অন্যতম। আর এ কারণেই পাচারের জন্য বাংলাদেশকে নিরাপদ মনে করছে মাদক ব্যবসায়ীরা।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত ১০ বছরে বাংলাদেশে প্রায় ৪১ কেজি কোকেন ধরা পড়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১৩ কেজি কোকেন ধরা পড়ে ২০২৩ সালে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৬ জানুয়ারি এক চালানেই ধরা পড়ে সাড়ে ৮ কেজি। ২০২২ সালে দেশে কোকেন ধরা পড়ে ৪ দশমিক ৫৭ কেজি। ২০২১ সালে ১ দশমিক ৫৫ কেজি। ২০২০ সালে ৩ দশমিক ৮৯৩ কেজি ও ২০১৯ সালে ধরা পড়ে ১ কেজি কোকেন। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৫ আগস্ট ৮.৬৬ কেজি, যার বাজারমূল্য ১৩০ কোটি টাকা।
জানা যায়, কোকেনসেবী রয়েছে বিশ্বজুড়ে। ব্যবহারকারীদের ৩০ শতাংশ উত্তর আমেরিকার, ২৪ শতাংশ দক্ষিণ আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের এবং ২১ শতাংশ ইউরোপের। এ ছাড়া আফ্রিকা ও এশিয়ায়ও সেবনকারী রয়েছে।
দক্ষিণ আমেরিকা থেকে মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে সবচেয়ে বেশি কোকেন পাচার হয়। এ ছাড়া সমুদ্র ও আকাশপথে ব্রাজিল হয়ে বিভিন্ন দেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে উত্তর আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে কোকেন পাচার করা হয়।
দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কোকেন পাচারে এগুলো হচ্ছে প্রচলিত রুট। তবে এসব পথে ব্যাপক তল্লাশির কারণে নতুন পথে মাদক পাচারের চেষ্টা করছেন পাচারকারীরা। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতকে ব্যবহার করে ইউরোপ-আমেরিকায় পাচার করা হচ্ছে কোকেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, পেতুলা স্টাফেল পেশায় হেয়াড্রেসার হলেও মাদকের ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করাই তার মূল পেশা। এর আগেও মাদক পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে নিজ দেশ গায়ানায় জেল খাটতে হয়েছে তাকে। ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর গায়ানার চেডি জগন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কোকেন পাচারের অভিযোগে তার ৪ বছরের কারাদণ্ড এবং ২.৩ মিলিয়ন ডলার জরিমানা হয়েছিল। সেবার কোকেন নিয়ে নিউইয়র্কের জনএফ কেনেডি বিমানবন্দরের উদ্দেশে রওনা করার পথে ধরা পড়েন। আর এবার কাতারের দোহা থেকে ঢাকায় এসে কোকেনসহ ধরা পড়েছেন।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, মাদক চোরাচালান কাট আউট পদ্ধতিতে হওয়ায় ক্যারিয়াররা ঊর্ধ্বতন কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। ফলে ক্যারিয়ারকে গ্রেপ্তার করা গেলেও চক্রের মূল সদস্যদের খুঁজে পাওয়া যায় না।
মাদকের রুট হিসেবে কারবারিদের বাংলাদেশকে বেছে নেওয়া প্রসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, বিশ্বের অন্যতম প্রধান মাদক উৎপাদন ও চোরাচালানের রুট গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান), গোল্ডেন ওয়েজ (ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, নেপাল ও ভুটানের কিছু অংশ) নামে পরিচিত মাদক চোরাচালানের তিনটি প্রধান অঞ্চলের কেন্দ্রে বাংলাদেশের অবস্থান। ফলে বিশ্বের নানান দেশ থেকে বিভিন্ন রকমের ভয়ংকর মাদক পাচার হয় বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। এরই মধ্যে দেশে আসা এসব কোকেনের চালানও এই রুটের অংশ হিসেবে ট্রানজিট ব্যবহার করে অন্য দেশে যাচ্ছে। তবে চোরাকারবারিরা যে শুধু ট্রানজিট রুট ব্যবহার করছে তা নয়, বাংলাদেশের ভেতরেও কোকেনসহ নানান রকম মাদকের বাজার তৈরির চেষ্টা করছে।
অন্য একটি সূত্র জানায়, কোনো দেশের বিমানবন্দরে স্ক্যানিংয়ে দুর্বলতা থাকলে আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরা সেদেশের বিমানবন্দর দিয়ে মাদক পাচারের চেষ্টা চালায়। মাদক কারবারিরা পাচারের জন্য ওই দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে এবং তা কাজে লাগায়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক একেএম শওকত ইসলাম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কড়া নজরদারির কারণেই মাদক চোরাকারবারিরা রুট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে পারছে না। কোকেনের এই চালানের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।’