২০২৪-২৫ অর্থবছর
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২৫ ০৮:৪৮ এএম
গ্রাফিক্স/ প্রবা
বিদেশি ঋণের টাকায় গতিশীল হওয়ার কথা ছিল উন্নয়ন, বাড়ার কথা ছিল কর্মসংস্থান ও অর্থপ্রবাহ। অথচ বাস্তবতা হলো, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি ঋণের ৩৫ শতাংশই খরচ হয়নি। বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রায় ২৭ হাজার ৯২২ কোটি টাকা অলস পড়ে থেকেছে। শুধু বিদেশি ঋণ নয়, সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) জুড়েই এই ব্যর্থতা স্পষ্ট। সার্বিক বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা গত ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণের অর্থ অব্যবহৃত থাকা উন্নয়ন ব্যাহত করার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনছে। এর ফলে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়বে, ব্যয়ও বাড়বে। ঋণের অর্থ ব্যয় না হলেও ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাবে। তখন প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে; অর্থাৎ আয় না থাকলেও ব্যয় বহন করতে হবে। এ ছাড়া কমিটমেন্ট ফিও দাবি করতে পারে উন্নয়ন সহযোগীরা। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ঋণদাতাদের আস্থা নষ্ট হতে পারে, ভবিষ্যতে অর্থছাড় জটিল হয়ে উঠবে।
বরাদ্দের পরিমাণ, ব্যয়ের চিত্র
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে বরাদ্দ ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি, বিদেশি ঋণ ৮১ হাজার কোটি এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ১০ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা।
কিন্তু ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা। সরকারি তহবিল থেকে খরচ হয়েছে ৯০ হাজার ৮৯৯ কোটি, বিদেশি ঋণ থেকে ৫৩ হাজার ৭৮ কোটি এবং নিজস্ব অর্থায়ন থেকে ৯ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। ফলে সরকারি তহবিলের ৪৪ হাজার ১০১ কোটি, বিদেশি ঋণের প্রায় ২৮ হাজার কোটি এবং নিজস্ব তহবিলের ৬৯০ কোটি টাকা অব্যয়িত থেকে যায়।
কেন হলো এই অবস্থা?
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রকল্প অনুমোদন, অর্থছাড় ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত সময় লেগেছে। একদিকে দুর্নীতির অভিযোগ ও প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় অনেক প্রকল্প স্থগিত হয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক ঠিকাদার কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে ঋণ খরচ করা যায়নি।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বহু প্রকল্পে ঠিকাদার কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। আবার অনেক পরিচালক পদ ছেড়ে বদলি হয়েছেন। অনেক প্রকল্পের অপ্রয়োজনীয়তা ও দুর্নীতি ধরা পড়ায় যাচাই-বাছাই করতে হয়েছে। এতে প্রকল্পের গতি কমেছে। তবে এবারের অর্থবছরে শুরু থেকেই বাস্তবায়নে জোর দেওয়া হচ্ছে।
আইএমইডির সাবেক সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, যে কারণেই হোক আরএডিপির (সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) বাস্তবায়ন কম হওয়ায় উন্নয়নে যে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, সেটির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি রয়েছে। কেননা এ অবস্থায় প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কম হওয়ায় আগামীতে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়তে পারে। এ কারণে দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। সেই সঙ্গে প্রকল্পের বাস্তবায়ন কম হওয়ায় কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শ্রমিকদের জীবনমান কমে গেছে। এই ক্ষতি পোষাতে হলে মন্ত্রণালয়গুলোকে বিশেষ তদারকি করতে হবে।
খাতভিত্তিক খরচে বেহাল
৫৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এডিপি বাস্তবায়ন ছিল খুবই নাজুক। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা ছিল স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, ভূমি ও নির্বাচন কমিশনের। আইএমইডির তথ্য বলছে, এডিপিতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ১৯টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৫ হাজার ৬৭৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এক বছরের মধ্যে খরচ হয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের মাত্র ২১.৭৪ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের ১৫টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ২৮৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে ৩৫০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা (১৫.৩৬ শতাংশ)।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ৬টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৪৬৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। খরচ হয়েছে ১৭৪ কোটি ২৭ লাখ টাকা (৩৭.৪৬ শতাংশ)। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের ২টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৪২৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা। শেষ পর্যন্ত খরচ হয়েছে ১৩৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা (৩২.০২ শতাংশ)। জননিরাপত্তা বিভাগের ১৮টি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৬৩৬ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। ব্যয় হয়েছে ৬৪৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা (৩৯.৫৫ শতাংশ)। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সচিবালয়ের একটি প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ৭৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। খরচ হয়েছে ২৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা (৩৭.৪৬ শতাংশ)।