মাশরুর মুর্শেদ, খুলনা
প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৫ ১১:০৪ এএম
খুলনায় প্রবেশের কয়েকটি প্রধান সড়কে সমন্বয়হীনতা, ধীরগতি ও নিম্নমানের কাজের কারণে দুর্ভোগে যানবাহন ও পথচারীরা। প্রবা ফটো
খুলনায় প্রবেশের প্রধান পাঁচটি সড়ক দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। সমন্বয়হীনতা, ধীরগতি ও নিম্নমানের কাজের কারণে বছরের পর বছর ধরে উন্নয়নের নামে চলছে দুর্ভোগ। ফলে থমকে গেছে জনজীবন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-উৎপাদন। স্থানীয় অর্থনীতিতে নেমে এসেছে স্থবিরতা।
সড়কগুলো রয়েছে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি), সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতায়। কিন্তু চার সংস্থার মধ্যে চরম সমন্বয়হীনতায় প্রকল্পগুলো বছরের পর বছর ঝুলে আছে।
শিপইয়ার্ড সড়ক
খুলনা নগরীর রূপসা ট্রাফিক মোড় থেকে খানজাহান আলী (রূপসা) সেতু পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ শিপইয়ার্ড সড়কের দুর্দশা এক দশকের বেশি সময় ধরে স্থায়ী হয়েছে। একসময় এ সড়কের পাশে সক্রিয় ছিল ২৭টি চালকল, বর্তমানে চলছে মাত্র ৬টি। ব্যবসায়ীদের হিসাবে চালকল খাতে বছরে ১০০ কোটির বেশি লোকসান হচ্ছে। কাঠ ব্যবসায়ীদের ক্ষতি ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, আর বান্দাবাজার এলাকার ৪৫০টি দোকান ও ব্যবসায়ীর ক্ষতি বছরে অন্তত ৫০ কোটি। ফলে এ সড়কের কারণে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ক্ষতি গুনতে হচ্ছে।
২০১৩ সালে একনেকে অনুমোদন পাওয়া এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৯৯ কোটি টাকা। কিন্তু কাজ শুরু হতে সময় লেগে যায় ৯ বছর। শেষ পর্যন্ত ২০২২ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান লিমিটেড অ্যান্ড মাহাবুব ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড। নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত, তবে এখনও অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি। এ সময়ের মধ্যে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫৯ কোটি টাকা।
স্থানীয় সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল অভিযোগ করেন, একটি সড়কের কারণে লক্ষাধিক মানুষ এক যুগ ধরে কষ্ট পাচ্ছে। তবে খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালক মো. আরমান হোসেন বলেন, সড়কের ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে, বাকিটা দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।
গল্লামারী ব্রিজ
দক্ষিণ-পূর্বের খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ময়ূর নদের ওপর সড়ক ও জনপথ বিভাগের আওতাধীন গল্লামারী স্টিল আর্চ সেতুটি সাড়ে ৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালে। ৬৮ দশমিক ৭০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১৩ দশমিক ৭০ মিটার প্রস্থের সেতুর কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল গত বছরের (২০২৪) ৩০ জুন। প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় চলতি বছরের ৩০ মার্চ পর্যন্ত। ওই সময়ের মধ্যেও শেষ করতে না পারায় দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয় চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। কিন্তু সেই মেয়াদও অতিবাহিত হয়েছে। এজন্য তৃতীয় দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক ও সওজের খুলনা জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. জাকির হোসেন বলেন, আশা করছি বর্ধিত মেয়াদের মধ্যে সেতুর কাজ সম্পন্ন হবে।
বাস্তুহারা বাইপাস
শহরের পশ্চিম দিকের বাস্তুহারা বাইপাস সড়কটি বর্তমানে খুলনার সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। এখানে প্রায় কোনো যানবাহনই চলাচল করে না। কেবল ঝুঁকি নিয়ে কিছু ট্রাক ও শ্রমজীবী মানুষ এ পথ ব্যবহার করেন। প্রথমে কেডিএ সড়কটি নির্মাণ করে কেসিসি ও এলজিইডির কাছে হস্তান্তর করলেও এলজিইডির অংশে কোনো সংস্কার হয়নি। ফলে আংশিক কাজ হলেও সড়কটি পুরোপুরি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও খুলনা প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হক বলেন, প্রতিদিনই মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে, অথচ এলজিইডি কোনো উদ্যোগই নেয়নি।
মুজগুন্নী মহাসড়ক
সোনাডাঙ্গা থেকে নতুন রাস্তা মোড় পর্যন্ত মুজগুন্নী মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে রয়েছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, বন বিভাগ, কর কমিশনার কার্যালয়সহ ডজনখানেক সরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রায় ২১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ে সড়ক সংস্কার এবং ৩৩ কোটি টাকায় ড্রেন নির্মাণসহ মোট ৫৫ কোটি টাকার কাজ শেষ হয় ২০২৩ সালের মে মাসে। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় সড়কটি আবারও ভাঙাচোরা হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো রাস্তা ডুবে যায়।
সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট কুদরত ই খুদা বলেন, অপরিকল্পিত নকশা ও নিম্নমানের কাজের কারণে রাষ্ট্রের প্রায় ৫৫ কোটি টাকা নষ্ট হয়েছে।
কেসিসির প্রধান প্রকৌশলী মশিউজ্জামান খান জানান, সড়কটি আরও উঁচু করা উচিত ছিল। নতুন একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে, যার আওতায় দ্রুত মুজগুন্নী মহাসড়ক মেরামত করা হবে।
শিববাড়ি-রয়েল মোড় সড়ক
‘কোভিড-১৯ রেসপন্স অ্যান্ড রিকভারি’ প্রকল্পের আওতায় ২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে শিববাড়ি থেকে রয়েল মোড় পর্যন্ত সড়কটি ২০২২ সালে সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ৯ মাসের মাথায় সড়কটি আবারও ভাঙাচোরা হয়ে গেছে।
বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান বলেন, ‘কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও যদি সড়ক ৯ মাসেই নষ্ট হয়ে যায়, তবে এর দায় কেসিসি এড়াতে পারে না।’