প্রভাবশালীদের ভিন্ন পছন্দ
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৯ আগস্ট ২০২৫ ১০:২৮ এএম
আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৫ ১০:৫০ এএম
প্রবা ফটো
সাত মাস শূন্য থাকার পর ৩ আগস্ট মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে সচিব পদে নিয়োগ দেওয়া হয় পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এসএম শাকিল আখতারকে। কিন্তু অদৃশ্য কারণে এখন পর্যন্ত তিনি মন্ত্রণালয়ে যোগ দিতে পারেননি। কবে যোগ দেবেন বা আদৌ দিতে পারবেন কি না তা নিয়ে চলছে নানা কানাঘুষা। ফলে এখনও মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেনই আছেন সচিবের রুটিন দায়িত্বে।
জানা গেছে, সচিব হিসেবে তোফাজ্জেল হোসেনই মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি বিশেষ গোষ্ঠীর অতিপছন্দের। তাকে পদোন্নতি দিয়ে এই মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে নিয়োগ দিতে উপদেষ্টাকে জনপ্রশাসন আধাসরকারি পত্র (ডিও লেটার) লিখিয়ে নিয়েছে। তাও আবার তিন দফা তাগাদা দিয়ে ডিও দেওয়া হয়েছে। তার সুপারিশের কর্মকর্তাকে নিয়োগ না দেওয়ায় নতুন সচিবের যোগদান নিয়ে বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই মন্ত্রণালয়ে নতুন সচিব হিসেবে অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া হতে পারেÑ এমন গুঞ্জনও প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়ে শোনা গেছে।
সূত্র বলছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের একাধিক প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে কাজ করেছিলেন তোফাজ্জেল হোসেন। তারপরও বর্তমান একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠী উপদেষ্টাকে ভুল বুঝিয়ে ডিও লেটার লিখিয়ে নিয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এসএম শাকিল আখতারকে সচিব নিয়োগ দিয়েছে। এরপরও একটা পক্ষের প্রভাবে তার যোগদান বাধাগ্রস্ত করেছে। তিনি যাতে যোগদান করতে না পারেন সেজন্য খোদ উপদেষ্টাকে ভুল বোঝানো হচ্ছে। যে কারণে এখনও নতুন সচিব পদে যোগ দিতে পারেননি। এদিকে নিয়োগের দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পরও কাজে যোগ দিতে না পারার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরে আলোচনা হচ্ছে। যোগ দিতে না পারার বিষয়টিকে প্রশাসনিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। এমন ঘটনাকে নজিরবিহীন বলছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। সচিব নিয়োগ দেওয়ার এতদিনেও যোগদান করতে না পারার বিষয় নিয়ে নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ওই মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে যাকে দেওয়া হয়েছে তাকে যোগদান করতে দেওয়া হয়নি। ওখানে হয়তো নতুন কিছু হবে।
কবে মন্ত্রণালয়ে যোগ দেবেন এমনটা জানতে এসএম শাকিল আখতারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠালেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নতুন সচিবের বাড়ি বগুড়া হলেও এখনও কাজে যোগদান করতে পারছেন না। কবে যোগদান করবেন তা বলা মুশকিল। তবে যেদিন তিনি নিয়োগের আদেশ পেয়েছেন সেদিনই উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নিজের পরিচয় তুলে ধরেন।
জানা যায়, গত বছরের ৬ নভেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দারকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। তিনি বিসিএস ১৩ ব্যাচের। এরপর গত ২০ নভেম্বর চুক্তিতে থাকা বিসিএস ৮২ ব্যাচের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদকে এই মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে বদলি করা হয়। পরবর্তীতে এই মন্ত্রণালয়ে নতুন সচিব নিয়োগ না দিয়ে গত ২৯ ডিসেম্বর আকমল হোসেন আজাদকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য পদে বদলি করা হয়। পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যের পদটিও সচিব পদমর্যাদার। ফলে গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর থেকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিবের পদটি ফাঁকা। সবশেষ এই মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. তোফাজ্জেল হোসেন সচিবের রুটিন দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে গত ৩ আগস্ট পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব এসএম শাকিল আখতারকে সচিব পদে পদোন্নতির পর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ সচিব নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। সে হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার ১৫ দিন পার হলেও যোগদান করতে পারেননি সচিব এসএম শাকিল।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, সচিবের নিয়োগ আটকে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালীদের ভিন্ন পছন্দের বিষয়। তারাই উপদেষ্টাকে প্রভাবিত করে তিন দফায় বর্তমান অতিরিক্ত সচিব তোফাজ্জেল হোসেনকে সচিব করার অনুরোধ করতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে আধা সরকারি পত্র (ডিও লেটার) পাঠিয়েছেন। যদিও তোফাজ্জেল হোসেন বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে শেখ হাসিনার আস্থাভাজন আমলা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি ২০১০ সালের ৩১ নভেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ পর্যন্ত তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস), ২০১৩ সালে ২৫ মার্চ থেকে ১০ নভেম্বর ফের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর পিএসের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়াও ২০১৪ সালের ১৯ অক্টোবর থেকে ২০১৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর পিএস ছিলেন।
সূত্র বলছে, তোফাজ্জেলকে সচিব করতে উপদেষ্টার পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে লেখা ডিওতে বলা হয়েছে, তোফাজ্জেল হোসেন একজন দক্ষ, যোগ্য ও সৎ কর্মকর্তা। তিনি রুটিন দায়িত্বে থেকে সচিবের কাজ সঠিকভাবে পালন করছেন। তাই তাকে পদোন্নতি দিয়ে সচিব হিসেবে পদায়ন করা হোক। সিদ্ধান্ত গ্রহণে সময়ের প্রয়োজন হলে সেই পর্যন্ত অন্য কাউকে এই পদে পদায়ন না করে তাকে আপাতত রুটিন দায়িত্বেই রাখা হোক।
এদিকে নিয়োগ পাওয়ার দুই সপ্তাহ পরও সচিব পদে যোগ দিতে না পারায় মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাজ ও চলমান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। বড় বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নেওয়া বন্ধ রয়েছে বলে সূত্রে জানা গেছে।