শাখাওয়াত হোসেন সোহান, রাজবাড়ী
প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ১৬:৫৮ পিএম
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ পৌরসভার বহুতল মার্কেট নির্মাণে ড্রইং, ডিজাইন ও পাইলিং থেকে শুরু করে পুরো নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কাজ শেষ হওয়ার মাত্র ২ মাস আগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ফরিদপুরের তাশা কনস্ট্রাকশন লিঃ ও জান্নাত কনস্ট্রাকশন (জয়েন্ট ভেঞ্চার) মূল কাজে হাত দেন। ইতোমধ্যে কার্যাদেশ প্রাপ্তির পর প্রায় ১০ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ে কাগজে কলমে কথিত মাটি পরীক্ষার কাজ মাত্র শেষ হয়েছে। পাইলিংয়ের কাজ কেবল শুরু হয়েছে। কার্য সমাপ্তির মাত্র ২ মাস সময় বাকি আছে মাত্র। অথচ স্থানীয় কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে এরই মধ্যে প্রায় এক কোটি টাকার বিল উত্তোলন করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। এখনো মূল ভবনের নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অধীন আইইউজিআইপি প্রকল্পের আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গোয়ালন্দ পৌরসভায় ৭ তলা ভীত বিশিষ্ট ৩ তলা মার্কেট নির্মাণের জন্য এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর অর্থায়নে ৯ কোটি ২৭ হাজার ৪০৪ টাকায় বরাদ্দ দেওয়া হয় ওই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। এজন্য প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই কল্পে স্থান নির্বাচন, মাটি পরীক্ষা (সয়েল টেস্ট), ড্রইং ও ডিজাইন সম্পন্ন করা হয়। গত বছর ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর প্রকল্পের কার্যাদেশ প্রদান করা হয় প্রতিষ্ঠানটিকে। এতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে ফরিদপুরের তাশা কনস্ট্রাকশন লিঃ ও জান্নাত কনস্ট্রাকশন (জয়েন্ট ভেঞ্চার) নির্মাণকাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যাদেশ প্রাপ্ত হয়। কার্যাদেশ প্রাপ্তির পর থেকে এক বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
সরেজমিন নির্মাণকাজ পরিদর্শনকালে দেখা যায়, গোয়ালন্দ বাজারের প্রাণকেন্দ্রে মার্কেটের নির্ধারিত স্থানটি চারপাশ টিনের বেড়ায় আবৃত করে সেখানে পিকাস্ট পাইলিংয়ের কাজ চলছে। এই কাজে ঠিকাদারের পক্ষে উপ-ঠিকাদার হিসেবে নিয়োজিত ‘বিলটেক্স টেকনোলজি’-এর প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান জানান, এ পর্যন্ত তারা ২৫ ফুট দীর্ঘ মোট ২১টি পাইলিং করতে সক্ষম হয়েছেন। নির্মাণকাজের টেন্ডার শিডিউলে ৫০ ফুট দীর্ঘ পাইলিং স্থাপনের উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও অর্ধেক আকারের পাইলিং করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের বিষয়ে ওই প্রকৌশলী বলেন, এখানকার মাটি খুবই শক্ত। যে কারণে ২৫ ফুটই যথেষ্ট।
প্রত্যক্ষদর্শী বাজারের উৎসুক একাধিক ব্যবসায়ী সাংবাদিকদের তথ্য ও ভিডিও সংগ্রহের সময় এগিয়ে এসে বলেন, এখানে ৫০ ফুটের স্থলে ২৫ ফুটের পাইলিং করা হচ্ছে। তাও আবার নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের কারণে কোনো কোনো পাইল মাঝ পথে ভেঙে যাচ্ছে।
তারা বলেন, বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ পাইলিংয়ের জন্য ৫০ ফুটের পূর্ব নির্ধারিত ১৪০টির স্থলে ২৫ ফুটের ২৮০টি পাইল স্থাপনের কথা বলেছেন। তবে, এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দপ্তরের কোনো লিখিত আদেশ কিংবা শিডিউল সংশোধনীর কোনো তথ্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কিংবা গোয়ালন্দ পৌর কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেননি।
এদিকে কারিগরি ত্রুটিসহ বিভিন্ন বিষয়ে জানার জন্য গোয়ালন্দ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে গেলে নির্বাহী প্রকৌশলী ফেরদৌস আলম খান বলেন, সয়েল টেস্টের সাথে ডিজাইনের কিছুটা তারতম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাইলিংয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি ও দৈর্ঘ কমিয়ে পাইলিংয়ের কাজ বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, মাটির বেয়ারিং ক্যাপাসিটি বাড়ানোর জন্য পাইলিং একভাবে করলেই চলে।
কাজের বাস্তবায়নের ধীরগতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পূর্বে এ বাজারের পুরাতন দোকানগুলো নিলাম প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও অপসারণ হতে বাড়তি সময় ব্যয় হওয়ায় নির্মাণকাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়ে যায়। কাজটি নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে না, এজন্য পিডি অফিস থেকে সময় বাড়িয়ে নেওয়া যাবে।
তিনি বলেন, ৭০ শতাংশ পাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় এক কোটি টাকার একটি বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
গোয়ালন্দ পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বে নিয়োজিত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদুর রহমান ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে বিল প্রদানের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে, নির্মাণকাজের পুরো বিষয়টি কারিগরি ও প্রকৌশলগত বিষয় উল্লেখ করে তা এড়িয়ে যান।
এদিকে পুরো কাজের ধীর গতি, শিডিউলে বর্ণিত নির্দেশনা উপেক্ষা করে পাইলিং স্থাপনসহ বিভিন্ন অনিয়মের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাশা কনস্ট্রাকশন লি. ও জান্নাত কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী শহীদুল ইসলাম বলেন, কাজটি স্থানীয় ঠিকাদার সালাউদ্দিন চৌধুরী ও জাহাঙ্গীর হোসেনসহ বেশ কয়েকজন ঠিকাদার বাস্তবায়ন করছে। এতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তারপরও তিনি বিষয়টি দেখে পরে জানাবেন বলে মোবাইল ফোনে উল্লেখ করেন।