× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ঈশ্বরদী-ঢালারচর প্রকল্প

উচ্চ ব্যয়ের রেল গলার কাঁটা

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ১৫ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৪৮ এএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

উন্নয়নের গল্প শুনিয়ে ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ নির্মাণ করা হয়। বলা হয়, রেলপথটি আঞ্চলিক সংযোগ ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহার হবে। মাত্র পাঁচ বছরেই ব‍্যয়ের পুরো টাকা যাত্রী চলাচলে উঠে যাবে। কিন্তু আকাশ-কুসুম পরিকল্পনায় নেওয়া উচ্চ ব‍্যয়ের এই রেলপথটি এখন গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে। নতুন নির্মিত ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথ রাজস্ব আদায়ের অর্জন করতে পেরেছে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে।

বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেলপথটি থেকে রাজস্ব আয় হয়েছে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৮৯ কোটি। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার মাত্র শূন্য দশমিক ৬০ শতাংশ আয় হয়েছে। 

আইএমইডির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ঈশ্বরদী-ঢালারচর রেলপথটি ১ হাজার ৭১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত। ৭৬ দশমিক ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটির আয় ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্য থেকে অনেক কম। বর্তমানে এই রুটে মাত্র একটি ট্রেনের জোড়া চলাচল করছে। বর্তমান আয় হারে এ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় তুলতে সময় লাগবে ৯৮৯ বছরেরও বেশি।

পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র জানায়, ২০১০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ৯৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। লক্ষ্য ছিল ধলাশার করিডোরকে জাতীয় রেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের সুবিধা উন্নত করা।

৮২ দশমিক ৪৩ কিলোমিটার রেললাইন, যার মধ্যে ৭৬ দশমিক ৮০ কিলোমিটার মূল লাইন এবং ৫ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার লুপ লাইন ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো নির্মাণ ২০১৫ সালের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্প শেষ হতে আরও চার বছর লেগে ২০১৯ সালে সম্পন্ন হয়। ব‍্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭০০ কোটি কোটি টাকার বেশি।

তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে তৈরি আইএমইডির প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পটি দৈনিক মাত্র একটি ট্রেন চলাচল করায় তার লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ধলাশার থেকে ট্রেনটি ভোরে ছাড়ে এবং রাজশাহী থেকে রাতে ফিরে আসে। ফলে ওই এলাকার যাত্রীদের কাছে এটি কম কার্যকর মনে হয়। এ ছাড়া ট্রেনে সীমিত আসন সংখ্যা অনেক যাত্রী ভ্রমণ করতে পারছেন না।

প্রতিবেদনে প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, ক্রয় ও সমাপ্তির পর সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম, অদক্ষতা ও অবকাঠামো অপর্যাপ্ত ব্যবহারের বিষয়গুলোও উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষার অভাবে দুর্বল প্রকল্প প্রস্তাবনা করা হয়েছিল, যা একাধিকবার সংশোধন এবং দীর্ঘসূত্রতায় রূপ নেয়। প্রভাব মূল্যায়ন দলের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নির্মিত রেললাইনের অনেক অংশে পর্যাপ্ত ব্যালাস্ট নেই। এছাড়া রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো স্থায়ী কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

জনবল সংকটে ১১টি স্টেশনের মধ্যে ৬টির সিগন্যাল ব্যবস্থা অকার্যকর রয়েছে, যা গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। বর্তমানে ৬২টি অনুমোদিত পদের মধ্যে মাত্র ১৭ জন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা ২৭ দশমিক ৪২ শতাংশ।

এছাড়া কিছু স্টেশনে কর্মীদের জন্য নির্মিত আবাসিক ভবন খালি পড়ে থাকায় দরজা-জানালা চুরি হয়েছে। প্রতিবেদনে এসব অবকাঠামোকে ‘সরকারি অর্থের অপচয়’ বলা হয়েছে।

৩৯ কোটি টাকার হিসাব দিতে পারছে না রেল

প্রকল্পে ১৪টি নিরীক্ষা আপত্তির মধ্যে ১০টি এখন নিষ্পত্তি হয়নি, যার অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৩৯ কোটি ৯০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্প শেষ হওয়ার ছয় বছর পরও এসব সমস্যার সমাধান হয়নি, যা উদ্বেগজনক। এ বিষয়ে অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

আইএমইডি জানায়, ভূমি অধিগ্রহণের জন্য দেওয়া অর্থ থেকে উৎসে কর কাটা হয়নি। এ খাতে অর্থের পরিমাণ সাড়ে ৪ কোটি টাকা। মালামাল উৎপাদন করলেও নির্মাণ সংস্থা হিসেবে ভ্যাট কাটায় সরকারের ৫ লাখ ৪২ হাজার ৮৮০ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। যুক্তিসঙ্গত কারণ না থাকার পরও ঠিকাদারের চাহিদামতে, কাজ সমাপ্তির মেয়াদ বাড়ানোর অনুমোদন করা হয়।

অননুমোদিত বিলম্বকালের জন্য ক্ষতিপূরণ বাবদ ঠিকাদারের কাছে সাড়ে ৭ কোটি আদায় করতে হবে। দরপত্রে অংশগ্রহণ না করা সত্ত্বেও বিধিবহির্ভূতভাবে মেসার্স রোজলীন ট্রেডার্সের সঙ্গে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৯ হাজার ৮০০ টাকা চুক্তি সম্পাদন ও ঠিকাদার নিয়োগে গুরুতর অনিয়ম হয়েছে। প্রকল্প থেকে ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা রেল রাজস্ব খাতে অনিয়ম করা হয়েছে। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে লং ওয়েলডেড রেল না করে শর্ট ওয়েলডেড রেল করায় সরকারের ক্ষতি ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা।

এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় ৬৭৬ ঘনমিটার পাথর অতিরিক্ত কেনায় সরকারের ৪৫ লাখ ২৯ হাজার ৬৬৯ টাকা অপচয় হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর ফলে পরামর্শক খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অনিয়মিতভাবে ১৬ কোটি ১৫ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ভাউচার ছাড়াই জেনারেল রিকোয়ারমেন্টস নামে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে অনিয়মিতভাবে ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ডব্লিউ ডি-৬ নম্বর প্যাকেজে অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করায় সরকারের ক্ষতি ২৩ লাখ ১০ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা। ডব্লিউডি-২ নম্বর প্যাকেজের মাধ্যমে প্রয়োজনের অতিরিক্ত রেল কেনায় সরকারের ১ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে।

ক্রয় অনিয়ম প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৩ লাখ ৯১ হাজার টাকার চুক্তি দেওয়া হয়েছে এমন এক ঠিকাদারকে, যিনি টেন্ডারে অংশই নেননি।

সম্ভাব‍্য সমীক্ষা ছাড়াই অনুমোদন

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক বলেন, ধলাশারের রেললাইন নির্মাণের অগ্রাধিকার কম ছিল দেশের বিদ্যমান রেল করিডোরের সুযোগ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রেক্ষাপটে।

তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় অতীতে নেওয়া অনেক প্রকল্পের মধ্যে এটি একটি। পরিচালন সক্ষমতার অভাব এবং সম্ভাবনা কম থাকায় এ লাইন কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি।

২০০৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেললাইন নির্মাণের অঙ্গীকার করেছিলেন। যেহেতু প্রকল্পটি তৎকালীন পরিকল্পনামন্ত্রী এ কে খন্দকারের নিজ জেলা পাবনায় ছিল, তাই কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই এটি অনুমোদিত হয়েছিল, তিনি যোগ করেন।

যে গল্পে প্রকল্প নেওয়া হয় 

প্রকল্পের অধীনে নির্মিত হয় ১০টি নতুন স্টেশন। ছোট-বড় ৯১টি সেতু নির্মাণ করা হয়। আছে ৬০টি লেভেল ক্রসিংসহ আরও স্থাপনা। নতুন এ রেলপথ চালুতে রেল কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, রেলপথটি আঞ্চলিক সংযোগ ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের বিকল্প রুট হিসেবে ব্যবহার হবে। ভবিষ্যতে পদ্মা ও যমুনা নদীর ওপর ওয়াই আকৃতির সেতু নির্মাণ করা হলে রেললাইনটি রাজবাড়ী ও ভাঙ্গা হয়ে পদ্মা সেতুর রেল লিংকের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। এতে ঢাকার সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগ স্থাপিত হবে।

অন্যদিকে মানিকগঞ্জ জেলা রেলের আওতাভুক্ত করা যাবে। এ ছাড়া রেলপথটি পাবনা জেলা সদর, সুজানগর, সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলাকে রেল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করেছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা