অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৫ ১১:২৭ এএম
নগর ভবন। ছবি : সংগৃহীত
নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার এক বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের তিন দিন পর ৮ আগস্ট এই সরকার গঠিত হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের ‘গা-ঢাকা’ দেওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন স্তরের জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ করা হয়। তাদের স্থানে প্রশাসক হিসেবে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এর বড় প্রভাব পড়ে নাগরিক সেবার ওপর। শম্বুক গতিতে চলছে নাগরিক সেবা। এক বছর ধরে জনপ্রতিনিধি না থাকায় কার্যত ভেঙে পড়েছে স্থানীয় সরকার কাঠামো।
২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট পৌরসভার মেয়র, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের অপসারণ করা হয়। এর পরদিন ১৯ আগস্ট অপসারণ করা হয় উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস-চেয়ারম্যানদের। এক মাস পর ২৬ সেপ্টেম্বর দেশের ৩২৩টি পৌরসভার কাউন্সিলর ও ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়র এবং সব ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে একযোগে অপসারণ করা হয়। সিটি করপোরেশনগুলো হলোÑ ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, বরিশাল, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, রংপুর, গাজীপুর ও ময়মনসিংহ। তবে আদালতের আদেশে গত বছরের ৩০ নভেম্বর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র হিসেবে শপথ নিয়েছেন ডা. শাহাদাত হোসেন। যদিও তার সঙ্গে কোনো কাউন্সিলরের পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগে একজন নাগরিকের জন্মসনদ, নাগরিকত্ব সনদ, ওয়ারিশান সনদ, চারিত্রিক সনদ, প্রত্যয়নপত্র, মৃত্যুসনদ, অবিবাহিত সনদসহ অন্তত ১৪টি মৌলিক সনদ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দিতেন। এসব সনদ সরকারি চাকরি, জমির দলিল, উত্তরাধিকার প্রমাণ, সন্তানদের স্কুল-কলেজে ভর্তি ফরম পূরণসহ নানা কাজে অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে এই সেবা অনেক ক্ষেত্রেই বিলম্বিত হচ্ছে। জনপ্রতিনিধিরা শুধু সনদই দিতেন না, তারা এলাকাভিত্তিক বিচার-সালিশ, মশক নিধন কার্যক্রম, বাজার তদারকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তালিকা নির্ধারণ (যেমনÑ বিধবা ও বয়স্ক ভাতা) প্রভৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। উন্নয়ন কাজের তদারকি, সড়কের সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখাসহ স্থানীয় সমস্যা দ্রুত সমাধানে তারা ছিলেন সক্রিয়। কিন্তু বর্তমানে জনপ্রতিনিধি না থাকায় নাগরিকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। সময়মতো মিলছে না নাগরিক সেবা।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব মাদারটেক এলাকার বাসিন্দা আমিনুল কবির প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত মাসের ৩ তারিখে আমার চাচি মারা যান। তার বয়স ছিল ৮৪ বছর। তিনি হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে মারা যান। দাফন-কাফনের পর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কার্যালয়ে মৃত্যুসনদ নিতে গেলে তিন দিন ধরে ওয়ার্ড সচিবকে তার অফিসে পাইনি। বারবার ফোনে যোগাযোগ করেছি। পঞ্চম দিন পার হওয়ার পর ষষ্ঠ দিন সনদটি হাতে পেয়েছি। কাউন্সিলর থাকলে এত সময় লাগত না।’
বাংলাদেশ সিটি করপোরেশন কাউন্সিলর্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট কেএম নজরুল ইসলাম খান, যিনি গাজীপুর সিটি করপোরেশনের পূবাইল মেট্রো থানা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব এবং ৪০ নম্বর ওয়ার্ডের অপসারিত কাউন্সিলর, প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত ৫৪ বছরে কোনো সরকার এভাবে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধিদের একযোগে অপসারণ করেনি। একজন জনপ্রতিনিধি স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সেতুবন্ধন তৈরি করেন। সরকারের সুযোগ-সুবিধা ও নির্দেশনা প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়াই তার দায়িত্ব। শুধু সনদ নয়, জনগণের সুখে-দুঃখে পাশে থাকেন কাউন্সিলররা। তারা ২৪ ঘণ্টা এলাকায় থাকেন, জনগণ যেকোনো সময় তাদের পাশে পান। এই অপসারণে যেমন নাগরিক সেবা ভেঙে পড়েছে, তেমনি সাধারণ মানুষ পড়েছে চরম দুর্ভোগে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অপসারণের ফলে নগরজীবনে সমস্যা বেড়ে গেছে। নাগরিক জীবনের সমস্যাগুলো নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তেমন কোনো ভাবনা নেই। মানুষ রুটিন সেবাটাও ঠিকভাবে পাচ্ছে না। তারা ভোগান্তিতে পড়ছেন। এক বছর পার হয়ে গেলেও এখনও নাগরিকরা জানেন না, জনপ্রতিনিধিরা কবে ফিরবেন। একবার সরকার স্থানীয় নির্বাচনের কথা বলেছিল কিন্তু তা আর এগোয়নি।’