× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর

প্রশাসনে আসেনি কাঙ্ক্ষিত স্থিতি

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৫ ১১:১৩ এএম

ছবি : সংগৃহীত

ছবি : সংগৃহীত

নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ আজ এক বছর পূর্ণ হচ্ছে। ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট তিনি প্রধান উপদেষ্টা পদে শপথ গ্রহণ করেন। এক বছর পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে আসেনি। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ বাতিল শুরু করে। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই বর্তমান সরকার নিজেরাই মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্যসচিবসহ বেশ কয়েকজনকে একের পর এক চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। এসব কর্মকর্তা ছয় থেকে আট বছর আগে সরকারি চাকরি থেকে অবসরে গিয়েছিলেন। প্রশাসন, বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগে সংস্কার আনার লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা মোট ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। এর মধ্যে সংস্কার কমিশনের ১৬টি প্রস্তাব বাস্তবায়ন হয়েছে আর ৮৫টি বাস্তবায়নাধীন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বঞ্চিত এক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একদিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করছে; একই সময়ে চুক্তিতে নতুন করে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সরকার চাইলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিতেই পারে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার ঢালাওভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনের কাঠামো অনেকাংশে ভেঙে পড়েছে। 

সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বর্তমান সরকার যেসব কর্মকর্তাকে চুক্তিতে সচিব নিয়োগ দিয়েছে, তারা গত সরকারের আমলে বঞ্চিত ছিলেন। অনেক আগেই তাদের মধ্যে অনেকেই সচিব হতে পারতেন। তাই যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের সচিব করেছে সরকার। তবে ঢালাও চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া সমীচীন নয়। 

জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিগত সরকারের আমলে বঞ্চিত কর্মকর্তারা পদোন্নতির দাবিতে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর জায়গায় প্রকাশ্য বিক্ষোভ করেছেন। একই সাথে আন্তঃক্যাডার-বৈষম্য দূর করতে প্রশাসন ক্যাডার বাদে ২৫ ক্যাডার প্রকাশ্য আন্দোলন করেছে, কর্মবিরতি পালন করেছে। দাবির কথা উল্লেখ করে সামাজিক মাধ্যমে লেখালেখি করায় অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছেন। প্রশাসন পিরামিডের আদলে গঠন করার কথা থাকলেও আগের মতোই পদের চেয়েও কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রশাসনের আকার ছোট করার চিন্তাভাবনা থাকলেও সেটি সম্ভব হয়নি। আগের মতোই মাথা ভারী প্রশাসন নিয়ে চলতে হচ্ছে। 

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জনপ্রশাসনে নজিরবিহীন বিক্ষোভ ও অস্থিরতা দেখা গেছে। সচিবালয়ের মতো স্পর্শকাতর স্থানে প্রকাশ্য বিক্ষোভ হয়েছে। এমনটি বাংলাদেশের প্রশাসনের ইতিহাসে নজিরবিহীন। এমনকি ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও প্রশাসনে এমন অস্থিরতা ছিল না। 

অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর ফ্যাসিস্টমুক্ত প্রশাসন গড়ার কথা থাকলেও সেটিও বাস্তবায়ন হয়নি। বরং ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের অনেকেই সচিব হয়েছেন আবার ওই সময়ে যারা সচিব পদে ছিলেন, তারাও স্বপদে বহাল রয়েছেন। তবে ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন সচিবকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। কয়েকজনকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে। জনপ্রশাসনে পদের চেয়ে বিপুল সংখ্যক বেশি কর্মকর্তা থাকায় প্রশাসনে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা দেখা দিয়েছে। অথচ জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনপ্রশাসন সংস্কারের নানা উদ্যোগ নিয়েছিল। তা এখন কাগজে-কলমের মধ্যে রয়ে গেছে বলে মনে করছেন প্রশাসন সংশ্লিষ্ট অনেকেই।

এ বিষয়ে সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবু আলম শহিদ খান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, দলীয় বলয় থেকে বের হতে হলে রাজনৈতিক সরকারকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আইনের সুরক্ষা দিতে হবে। এজন্য সরকারি চাকরিজীবীদের সুরক্ষায় বাংলাদেশে ‘সরকারি চাকরি আইন ২০১৮’ নামে একটি আইনটিও পাস হয়েছে। এর সুষ্ঠু প্রয়োগ নিশ্চিত করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ভয়ে দায়িত্ব পালনে সুরক্ষা দেওয়া গেলে প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত, রাখা সম্ভব হবে। 

সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আনোয়ার ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পদোন্নতির লোভে যেসব কর্মকর্তা বিগত সরকারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করেছেন, তারাই পুরস্কার পেয়েছিলেন। মেধা ও যোগ্যতার দিক থেকে এগিয়ে থাকার পরও অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতি পাননি। এসব কর্মকাণ্ডে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মনে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। যা পরবর্তীতে প্রকাশ্য ক্ষোভে রূপ নেয়। 

পদ-পদোন্নতিসহ চাকরি-সংক্রান্ত নানা বিষয়ে বিভিন্ন ক্যাডারের দ্বন্দ্ব থামছেই না। ক্যাডার কর্মকর্তাদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ফেসবুকে নিজেদের দাবির পক্ষে লেখালেখি করায় শাস্তিমূলক হিসেবে ১৩ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। অতীতেও বিভিন্ন ক্যাডারের কর্মকর্তার মধ্যে দ্বন্দ্ব ছিল। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সরকার জনপ্রশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিচার বিভাগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের কার্যক্রম শুরু করে। সরকার গঠিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে গত এক বছরে প্রশাসন ও অন্যান্য ক্যাডারের মধ্যে দেখা দেয় প্রকাশ্য বিরোধ। 

চলতি বছরের মার্চ মাসে আন্তঃক্যাডার-বৈষম্য নিয়ে ২৫ ক্যাডার সংগঠনের সদস্যদের ফেসবুকে লেখালেখির কারণে ১২ কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত হন। এ ঘটনায় ২৫ ক্যাডার সংগঠনের নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বৈষম্যপূর্ণ রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে কাজে লাগিয়ে ২৫ ক্যাডারের কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করতে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। মূলত পদোন্নতি এবং সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য থেকেই আন্তঃক্যাডারের দ্বন্দ্ব বিরাজ করছে। 

দুর্নীতি দমন, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনসহ মোট ১১টি কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। সবগুলো সংস্কার কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে থাকা স্বল্পমেয়াদে বাস্তবায়নযোগ্য ১২১টি সুপারিশের মধ্যে ১৬টি ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া ৮৫টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নাধীন। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে এ তথ্য জানান প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব মোহাম্মদ শফিকুল আলম। 

তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা মোট ১১টি সংস্কার কমিশন করেছিলেন। ইতোমধ্যে কমিশনগুলো প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এ সংস্কার কমিশনগুলোর সুপারিশের মধ্যে যেগুলো আশু বাস্তবায়ন করা দরকার, সেটার ওপরে যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, সেটার আপডেট নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন, পুলিশ সংস্কার কমিশন, বিচার বিভাগ সংস্থার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার কমিশন ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোর মধ্যে আইন উপদেষ্টা ১২১টি সুপারিশ আশু বাস্তবায়নযোগ্য চিহ্নিত করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠান। এগুলোর মধ্যে মোট ১৬টি সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ৮৫টি বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। দশটি সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়ন হচ্ছে। আর দশটি বাস্তবায়নযোগ্য কি না তা নিয়ে এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হচ্ছে। 

গত এক বছরে প্রশাসনে উপসচিব ১৪১ জন, যুগ্ম সচিব ৪২৪ জন, অতিরিক্ত সচিব ১৮৯ জন, গ্রেড-১ ২৬ জন এবং সচিব/সিনিয়র সচিব ৪৫ জনসহ মোট ৭৮৫ জনকে নিয়মিত পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে উপসচিব চারজন, যুগ্ম সচিব ৭২ জন, অতিরিক্ত সচিব ৫২৮ জন এবং সচিব ১১৯ জন কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। উপসচিব ১৬ জন, যুগ্ম সচিব ১৫ জন অতিরিক্ত সচিব ৭৫ জন, গ্রেড-১ এর ৪৩ জন এবং সচিব/সিনিয়র সচিব ২৪ জনসহ মোট ১৬৪ জন কর্মকর্তা কর্মকাল শেষে অবসরে গেছেন। অতিরিক্ত সচিব পদে ১৯ জন গ্রেড-১ একজন এবং সচিব/সিনিয়র সচিব ৯ জনসহ মোট ২৯ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়েছে। গত এক বছরে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ২৪টি বিভাগীয় মামলা রুজু হয়। ৮টি বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। ১৬টি বিভাগীয় মামলা চলমান। ৩টি অধ্যাদেশ প্রণয়ন, ৩টি বিধিমালা সংশোধন, ১টি বিশেষ বিধিমালা প্রণয়ন ও ২২টি নিয়োগ বিধিমালা সংশোধনে সুপারিশ প্রদান করা হয়েছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা