ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৫ ০৮:৪৩ এএম
আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৫ ১১:১৫ এএম
ছবি: প্রবা গ্রাফিক্স
নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার আজ এক বছরে পা রাখল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের মধ্যে গত বছরের ৮ আগস্ট তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নিয়েই তিনি বৈষম্যহীন মানবিক ও কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এক নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন। তারই ধারাবাহিকতায় ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা বিলোপ ও স্বৈরতন্ত্রের অবসান ঘটাতে রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে দলগুলোকে নিয়ে সংস্কারের কাজ প্রায় শেষ করেছে সরকার। ভঙ্গুর অবস্থা থেকে অর্থনীতির চাকাকে ধীরে ধীরে সচল করতে অভ্যন্তরীণ ও কূটনৈতিকভাবে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। পাশাপাশি ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বহুল প্রত্যাশিত জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের কাজ এগিয়ে নিতেও সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করে যাচ্ছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যথাসময়ে প্রকাশ করা হয়েছে জুলাই ঘোষণাপত্র। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারিতে রোজার আগে জাতীয় নির্বাচনের ঘোষণার মাধ্যমে দেশকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও বাস্তবায়নের পথে অন্তর্বর্তী সরকার।
নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অন্তর্বর্তী সরকারের গত এক বছরে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি বারবার সামনে আসছে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাবটি। পাহাড়সম প্রত্যাশা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়িত্বে বসানোর বর্ষপূর্তির ক্ষণে চাওয়া-পাওয়ার খতিয়ান কতটুকু মিলল তা নিয়েই কথা বলছেন অনেকে।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে শেখ হাসিনার। জনরোষ থেকে বাঁচতে তিনি পালিয়ে যান ভারতে। শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার পর এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। পুলিশ বিভাগ তখন কার্যত ছিল অদৃশ্য। থানা ছেড়ে এই বাহিনীর সদস্যরা জনরোষে পালিয়েছিল। এ অবস্থায় সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে দায়িত্ব নেয় সাধারণ শিক্ষার্থীরা। চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি প্রতিহত করতে রাত জেগে পাহারা বসায় ছাত্র-শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশের ইতিহাসে যা ছিল নজিরবিহীন। শুধু যে পুলিশ পালিয়েছে, তাই নয়। প্রধানমন্ত্রী পালিয়ে যাওয়ার পর সব মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও বড় অংশ পালিয়ে যায়। এমন এক নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খল অবস্থায় গত বছরের ৮ আগস্ট মধ্যে ছাত্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনে দায়িত্ব নেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
সরকারের ক্ষমতার উৎস
প্রত্যেকটি রাজনৈতিক সরকারের ক্ষমতার উৎস তাদের দলীয় রাজনীতি। কিন্তু বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নিজস্ব কোনো রাজনৈতিক দল নেই। গণঅভ্যুত্থানের সব রাজনৈতিক দলের সমর্থনে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সংসদ না থাকায় এ দায়িত্ব জাস্টিফাই করতে নেওয়া হয়েছে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স।
ছিল নানা প্রতিকূলতা
দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশি-বিদেশি নানা চাপ সামলাতে হয়েছে বর্তমান সরকারকে। নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের কাছ থেকে প্রতিবেশীসুলভসহযোগিতা ও সদাচরণ মেলেনি। দেশটি বাংলাদেশের বাংল রাজনৈতিক পরিবর্তন মেনে নেয়নি। আন্তর্জাতিক মহলেও ব্যাপক অপপ্রচারের সম্মুখীন হয়। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অপতৎপরতায় দেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হয়। এমনকি সচিবালয়ও কয়েক দফা দখলের চেষ্টা হয়।
মানুষ দীর্ঘদিন কথা বলতে পারেনি, দাবিদাওয়া পেশ করতে পারেনি। সরকার বদলের পর সবাই একসঙ্গে নিজেদের দাবিদাওয়া নিয়ে সভা-সমাবেশ শুরু করে। সব দাবি এ সরকারকে পূরণের চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এসব আন্দোলনের অধিকাংশেই পেছন থেকে কলকাঠি নেড়েছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
সরকারের সফলতা
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ নিয়ে যত অপপ্রচার ছিল তা প্রতিহত করা হয়েছে। অর্থনীতি ছিল নাজুক। সেখান থেকে অর্থনীতির গতি ফেরাতে কাজ করেছে এ সরকার। দিন দিন অর্থনীতি শক্তিশালী হতে শুরু করেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। বৈদেশিক ঋণচুক্তির বিল দেওয়া হচ্ছে। ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরানোর সঙ্গে আওয়ামী লীগের পাচারকৃত অর্থ ফেরানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকার প্রয়োজনীয় সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সে লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। বিচার, প্রশাসন, নারীসহ বিভিন্ন বিষয়ে গঠিত ১১টি সংস্কার কমিশনের দেওয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মতিতে সংস্কার কাজ এগিয়ে চলেছে। এসব সংস্কারের কিছু অন্তর্বর্তী সরকার বাস্তবায়ন করবে, আর কিছু আগামী সরকার।
অপরাধীদের বিচার শুরু
ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে চালানো নৃশংসতার বিচার শুরু হয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অপরাধের বিচার শুরু করা হয়েছে। জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অন্য অভিযুক্তদেরও বিচারের আওতায় আনা হচ্ছে। গঠিত হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে দুর্নীতি, অর্থপাচারসহ অন্যান্য অপরাধের সঙ্গে জড়িতদেরও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
নির্বাচনের সময় ঘোষণা
দেশে কবে নির্বাচন হবে, আদৌ হবে কি না এ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। সে অনিশ্চয়তার মেঘ সরিয়ে জাতীয় নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে। এজন্য নির্বাচন কমিশনকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে গত জুনে লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে কথা দিয়েছিলেন। সেই আলোকে সময়সূচি ঘোষণা হয়েছে। এতে উত্তেজনা কমে এসেছে। অর্থাৎ সরকার কথা রেখেছে।
ঝুলে আছে জুলাই সনদ
সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য সৃষ্টি না হওয়ায় জুলাই সনদ ঝুলে আছে। কেননা রাজনৈতিক দলগুলো একমত না হলে সরকার তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারে না। সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গেও খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেনি সরকার।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি কমেছে। সরকারে থাকা একজন উপদেষ্টা ছাড়া বাকি কারও প্রতি দুর্নীতির কথা শোনা যায় না। অথচ আগের মন্ত্রীরা দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল। দুর্নীতি রোধ করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক বলয়মুক্ত করার অলোচনা হচ্ছে। এখানে সাফল্য রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইমেজ বাড়ছে
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশের নিয়োগ কমে যাওয়ার একটি আশঙ্কা ছিল। সেসব দূর হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইমেজ বাড়ছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশের পক্ষে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ কমানো সম্ভব হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আসা শুরু হয়েছিল তা এখন আর নেই।
মব সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারছে না সরকার
সরকারের কিছু ব্যর্থতাও রয়েছে। এক্ষেত্রে বড় বিষয় 'মব সংস্কৃতি'। বিভিন্ন জায়গায় মব সৃষ্টি করে মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও মাজার ভাঙা হয়েছে। কিছু সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাও সৃষ্টি করেছিল। তবে সাফল্যের পুরস্কার ও ব্যর্থতার জন্য তিরস্কার নেই। কেননা এ সরকারে যেমন সফল উপদেষ্টা ও কর্মকর্তারা রয়েছেন, তেমনি ব্যর্থরাও আছেন। সেখানে সফল ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করা হয়নি। যাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে তাদের বদলানো হচ্ছে না। অর্থাৎ শাসনের জন্য কঠোরতা নেই সরকারের।
একই সঙ্গে পুলিশ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মামলাবাজি বন্ধ করতে পারেনি সরকার। আগে পুলিশ এসব করত, এখন রাজনীতিবিদরা করছে। অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা দেওয়ার বেশ ভালো উদ্যোগ ছিল। অনেককে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। নিহতদের পরিবারকে অর্থায়ন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরেও তাদের জন্য বড় ধরনের বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া বিচার বিভাগ কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে।
বিদেশি বিনিয়োগ কম এসেছে
দেশের অর্থনীতি এখন অনেকটাই স্থিতিশীল। ব্যাংক ব্যবস্থা ভালো হলেও বিদেশি বিনিয়োগ তেমন বাড়েনি। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও হাত গুটিয়ে। তা ছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বেশ সাফল্য দেখিয়েছে সরকার। রমজান মাসে মানুষ খুবই প্রশান্তিতে কাটিয়েছে। তবে পরবর্তীতেও দ্রব্যমূল্য অনেকটা স্থিতিশীল থাকলেও ঘাটে ঘাটে চাঁদাবাজি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। খাদ্যে ভেজাল দেওয়া কমছে। ভোক্তা অধিদপ্তর সক্রিয় থাকায় বাজার মোটামুটি স্থিতিশীল।
সেবা খাত চলছে জোড়াতালি দিয়ে, এখানে আহামরি উন্নতি হয়নি। আর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে তেমন মনোযোগ দেওয়া হয়নি। শিক্ষা খাতেও মনোযোগ কম। গণমাধ্যম কমিশন করলেও কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে এ খাতে নৈরাজ্য রয়েই গেছে।
এক চরম প্রতিকূলতার মধ্যে এই সরকার ভালো-মন্দ মিলিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে পদার্পণ করছে। এটা সরকারের নতুন পথ। এখনকার প্রধান কাজ একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা। প্রায় দেড় দশক গণতন্ত্র ছিল নির্বাসনে, নির্বাচন ছিল প্রহসন। সেই অভিশপ্ত অধ্যায় পেরিয়ে এ সরকার নির্বাচন ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় জাতিকে এগিয়ে দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত। প্রত্যাশা ছিল বিপুল। তার কিছু পূরণ হলেও অপূর্ণ রয়ে গেছে অনেক কিছুই। কিন্তু তাতে হতাশার চোরাবালিতে পথ হারানো যাবে না।
স্বৈরাচারমুক্ত পরিবেশে পৃথিবীর অনিন্দ্যসুন্দর আয়োজনের প্রতিটা দিন নতুন আহ্বানের, আনন্দের। কেবল অপ্রাপ্তির আর্তনাদে মুখ কালো করে থাকা নয়। কী পাইনি তার হিসাব কষার মধ্যে কেবলই বেদনা ও নিরাশা। প্রাপ্তির স্মৃতিচারণেই জীবন আনন্দময় হয়ে ওঠে। এই আশা ও আনন্দই জাতির জীবনীশক্তি। একে কাজে লাগিয়ে সব অর্ঘ্য ভেঙে আমাদেরকে সামনে এগোতে হবে। কবির ভাষায়, কী পাইনি তারি হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি/ আজ হৃদয়ের ছায়াতে আলোতে বাঁশরি উঠিছে বাজি।