আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৫ ১৩:০০ পিএম
জুলাই আন্দোলনে রাজপথে নেমে আসে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ আলেম সমাজ। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট শনিবার যাত্রাবাড়ী থেকে তোলা। ফাইল ফটো
দীর্ঘ ১৬ বছর জাতির ওপর চেপে বসেছিল এক স্বৈরাচারী সরকার। মানুষকে তারা মানুষই মনে করেনি। নির্বিচারে গুম-খুন ছিল তাদের নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। তাদের নানা অরাজতকা, নির্যাতন ও গুম-খুনের বিরুদ্ধে গত বছরের জুলাইয়ে ফুঁসে ওঠে দেশবাসী। যার শুরুটা হয়েছিল কোটাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে। পরবর্তীতে সেটাই রূপ নেয় সরকার পতনের আন্দোলনে।
সেখানে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কোনো লাভ-লস না থাকলেও বিবেকের তাড়নায় তারা ওই আন্দোলনে যোগ দেন। ফলে আন্দোলন পায় নতুন মাত্রা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফুয়েল হিসেবে কাজ করে আলেমদের অংশগ্রহণ। সারা দেশে ৪২ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নিহত হন এই আন্দোলনে। আহত হন কয়েক হাজার। গত ৫ আগস্ট শুধু যাত্রাবাড়ী পয়েন্টেই আহত হন ২১৩ মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। যদিও ‘তরুণ আলেম প্রজন্ম ২০২৪’ নামের একটি সংগঠনের দাবি জুলাই বিপ্লবে ৯২ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও আলেম শহীদ হয়।
আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার বর্ণনা দিয়ে জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আজিজুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘২৩ জুলাই মাদ্রাসার পাশে দেখছিলামÑ কীভাবে পুলিশ একজন ভাইকে মেরে ফেলল। বিষয়টা সরাসরি দেখে আর বসে থাকতে পারিনি। ওইদিন থেকেই আন্দোলনে নেমে পড়ি। তখনও আমাদের পুরো মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দেয়নি। সবাই আলাদা আলাদা করে আন্দোলনে যেত। ২৩ জুলাই থেকে প্রতিদিন আন্দোলনে অংশ নিয়েছি।’
যেভাবে আন্দোলনে যুক্ত হয় মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা
জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকা ছিল পুরোদস্তুর রণক্ষেত্র এবং প্রধানতম প্রতিরক্ষা কেন্দ্র। সর্বস্তরের ছাত্র-জনতার সঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছিল আলেমসমাজও। যাত্রাবাড়ী বড় মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা রিদওয়ান হাসান আহ্বান করেন সংহতি সমাবেশ। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর থেকে তিনি এবং স্থানীয় আলেম ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা কৌশলগত কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মিশে আন্দোলনে অংশ নিচ্ছিলেন। ৩ আগস্ট কাজলা পেট্রোল পাম্পের সামনে ‘সাধারণ আলেম সমাজ’ ব্যানারে দেশের পরিচিত আলেমদের নিয়ে প্রকাশ্যে সংহতি সমাবেশ করেন এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সর্বাত্মক সংহতি প্রকাশ করেন তিনি। সেখানে জালেমের রক্তচক্ষুর সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে যান দেশের আলোচিত এক দল তরুণ আলেম।
আন্দোলন চলাকালীন সরকার দাবি করে আলেমসমাজ তাদের পক্ষে আছে। বিষয়টি নিয়ে আলেমদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং সামগ্রিকভাবে শিক্ষাঙ্গনকে নিরাপদ ও শিক্ষামুখী রাখতে সংহতির অংশ হিসেবে তারা ঘোষণা করেন ‘আমারও কিছু বলার আছে’ কর্মসূচি।
সেখানে আলেমরা দাবি করেন, বিগত কয়েকদিনে শত শত ছাত্র-জনতাকে হত্যা, জুলুম ও নির্যাতনের ঘটনায় সাধারণ আলেমসমাজ উদ্বিগ্ন। কোটা সংস্কারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ, নিরস্ত্র আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর নজিরবিহীন দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে।
জালেম সরকারের নানামুখী চাপ সত্ত্বেও ১৮ জুলাই হেফাজতে ইসলাম গণমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালিয়ে ৬ শিক্ষার্থীকে হত্যার নিন্দা জানায়। এর মধ্যেই প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সমর্থনে রাজপথে সর্বাত্মক আন্দোলনে অংশ নেন অনেক আলেম এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থী। এমনকি আন্দোলন ও আন্দোলনকারীদের পক্ষে জুমার খুতবা দেওয়ায় চাকরি হারান ধানমন্ডি তাকওয়া মসজিদের খতিব মুফতি সাইফুল ইসলাম, ধানমন্ডি সায়েন্স ল্যাবরেটরি মসজিদের খতিব মুফতি শামসুদ্দোহা আশরাফি, মিরপুর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মসজিদের খতিব মুফতি আরিফ বিন হাবিবদের মতো খ্যাতিমান আলেম ও বক্তাসহ সারা দেশের অসংখ্য মসজিদের ইমাম ও খতিব। শারীরিকভাবেও নির্যাতন ও হেনস্থার শিকার হন অনেক ইমাম-খতিব। তবু তারা জুমার বয়ানে তুলে ধরেন ফেরাউনের জালেমের দাস্তান এবং সেনাবাহিনীসহ সাগরে ডুবে মৃত্যুবরণের করুণ পরিণতির শিক্ষা।
এছাড়া ১৯ জুলাই সারাদেশে কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকরা পুলিশি হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল করে। রাজশানীর যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারীসহ দেশের বড় বড় মাদ্রাসাগুলো প্রতিবাদ জানায়। এর রেশ ধরেই জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া মাদ্রাসা ও মসজিদের ভেতরে জুমার নামাজ চলাকালে পুলিশ টিয়ার সেল নিক্ষেপ করে। এতে অসুস্থ হয়ে পড়ে বৃদ্ধ ও শিশুরা। টিয়ারসেলের গ্যাস মাদ্রাসার প্রবীণ শিক্ষকদের অসুস্থ করে তোলে। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে সরকারবিরোধী মনোভাবে আরো বেড়ে যায়।
অন্যদিকে, শেখ হাসিনার করা মন্তব্য ঘিরে একটি ফতোয়া জারি করে যাত্রাবাড়ীর মাদ্রাসাটি। রাজাকারের নাতিপুতি চাকরি পাবে না- করা মন্তব্যের বিপরীতে ফতোয়া জারি করে বলা হয়Ñ কোনো অপরাধী বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির অপরাধের সাজা তার সন্তান বা নাতিপুতির ওপর বর্তায় না। অপরাধের দণ্ড একমাত্র অপরাধীই বহন করবে। এতে আলেমদের ওপর ক্ষিপ্ত হয় সরকার।
জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী দেলোয়ার হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘গত বছরের জুলাই মাসে পুলিশ যেভাবে সাধারণ মানুষকে হত্যা করেছে, সেটা দেখে নীরব থাকা সম্ভব ছিল না। তাই লাভ-লস দেখার সুযোগ ছিল না। দেশ ও জাতিকে মুক্ত করতে আমরা ছাত্র-জনতার পক্ষে আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার দিন পর্যন্ত আমরা সাধারণ মানুষের সঙ্গে ছিলাম। শহীদ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়েই আন্দোলনে অংশ নিয়েছি।’
মাদ্রাসা শিক্ষার্থী আজিজুল হক বলেন, ‘২৩ তারিখ থেকে শুরু করে প্রতিদিনই আন্দোলনে অংশ নিয়েছি। সকলকে নিয়ে আমরা যাত্রাবাড়ীর আন্দোলনে অংশ নেই। ১ আগস্ট থেকে আমরা আমাদের মাদ্রাসার সামনে সড়ক আটকে দিয়ে আন্দোলন শুরু করি। সরকার নানাভাবে মাদ্রাসার ওপর গোয়েন্দাগিরি চালানোর চেষ্টা করেছে। কারা কারা আন্দোলনে যায়, বিষয়টি নজরদারির চেষ্টা করত। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আন্দোলনে যেতাম আমরা।
জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা ইউসুফ আহমাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কোটা কওমি শিক্ষার্থীদের কোনো ফায়দা দেবে বা আমরা নেব- এর কোনো প্রাসঙ্গিকতা নেই। সরকার পতনের পর আমরা এই কোটার কোনো সুবিধা পাইনি বা আশাও করি না। ১৬ তারিখ আবু সাঈদের যেভাবে মৃত্যু হলো মানুষ হিসেবে সেটাকে মেনে নেওয়া ছিল অনেক কষ্টের। তার মৃত্যু দেখে আমরা আসলে কোনোকিছুই চিন্তা করিনি। সে আমাদের ভাই। তার মৃত্যু আমাদের নাড়া দিয়ে গেছে। আমরা মানবিক কারণে আন্দোলনে নেমেছি। আমাদের বিবেক বলছেÑ ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়ানো উচিত। আমরা দাঁড়িয়েছি। তিনি বলেন, আন্দোলনের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীরা টাকা তুলে সাধারণ ছাত্র-জনতাকে নানা শুকনা খাবার ও পানি কিনে দিত। এরপর আমরা যখন তাদের সঙ্গে আন্দোলনে নামি, তাদের অনেকে সরকারের ট্যাগিংয়ের কারণে আমাদের পোশাক নিয়ে আপত্তি তোলে। পরে আমরা ছদ্মবেশে পাঞ্জাবি ছাড়াই আন্দোলনে চলে যাই। সারা দেশে ৪২ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী নিহত হয় এই আন্দোলনে।