× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

স্মৃতিচারণ

রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে নারীরাই ছিলেন চালিকাশক্তি

উমামা ফাতেমা

প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ১০:২৩ এএম

উমামা ফাতেমা

উমামা ফাতেমা

কোটা সংস্কার আন্দোলনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ৫ জুন। হাইকোর্টের একটি রায়ের বিরুদ্ধে সেদিন বিকেলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্ররা সেন্ট্রাল লাইব্রেরি থেকে প্রতিবাদী মিছিল বের করে। আমি, তখন ছাত্র ফেডারেশন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব হিসেবে এই আন্দোলনে যুক্ত হই।

প্রথম থেকেই আমরা সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে মুভমেন্টে সক্রিয় হই। ৯ জুন রাজু ভাস্কর্যে আয়োজিত কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের বিপুল উপস্থিতি ছিল। মেয়েদের অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো। আমরা তখন সিদ্ধান্ত নিই মেয়েদের অর্গানাইজ করব। পহেলা জুলাই থেকে আন্দোলন যখন নতুন গতি পায়, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের মেয়েদের সঙ্গে সমন্বয় শুরু করি।

প্রথমদিকে আমি ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি হিসেবে থাকলেও পরে পরিচয় গৌণ হয়ে যায়। সুফিয়া কামাল হলের কথাই ধরুন—২০১৮ সালের আন্দোলনে ছাত্রলীগ নেত্রী এশা মেয়েদের দমিয়ে রাখতে চাইলেও মেয়েরাই তাকে জুতার মালা দিয়ে হলছাড়া করেছিল। দ্বিতীয় আন্দোলনে ছাত্রলীগ ছেলেদের হল আটকে দিলে, আমরা মেয়েরা হল থেকে মিছিল নিয়ে গিয়ে ভাইদের বের করে আনি। আমাদের দিকে ছোড়া হয়েছিল লাঠি, পাথর, জুতা।

১৪ জুলাই, শেখ হাসিনার ‘রাজাকারের নাতি-পুতি’ বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে মেয়েরাই রাতে প্রতিবাদী মিছিলে নামে। ১৫ জুলাই রাজু ভাস্কর্যে সমাবেশ চলাকালে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আমাদের উপর হামলা করে। মেয়েদেরকেই প্রধান টার্গেট করা হয়। এরপর সিদ্ধান্ত নেই—আমরা হল ছাড়ব না।

১৬ জুলাই ছাত্রলীগ–বিরোধী আন্দোলন হল দখলে নেয়। রোকেয়া হল থেকে বের করে দেওয়া হয় ছাত্রলীগ সভাপতি আতিকাকে। অন্য হলেও ছাত্রলীগ নেতারা হলছাড়া হয়। পরদিন, ১৭ জুলাই, গায়েবানা জানাজায় পুলিশের বাধা ও লাঠিচার্জের মধ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রথমবার ক্যাম্পাসে সরাসরি আক্রমণ চালায়। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করে হল ত্যাগের নির্দেশ দেয়। মেয়েরাই ছিল সর্বশেষ বের হওয়া ছাত্র, আমাদের কবি সুফিয়া কামাল হলে তখনও দেড়শ’ ছাত্রী ছিল।

ইন্টারনেট শাটডাউনের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আমি যোগাযোগ রাখতাম। পত্রিকায় বলতাম—‘আমরা আছি, আন্দোলন চলছে।’ ২০ জুলাই নাহিদকে তুলে নেওয়ার পর আন্দোলনে শোক ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আমার ফোন তখনও খোলা ছিল, যেন কেউ কেন্দ্রীয় কর্মসূচির খবর জানতে পারে। ছাত্রদের সমন্বয় করতে আমি নিজের সোর্স দিয়ে দেশব্যাপী বার্তা ছড়িয়ে দিই। এসময় ডিবি, এনএসআই ও একজন এমপি আমাকে ফোনে ভয় দেখায়, আন্দোলন থেকে সরে যেতে বলে। মানসিক চাপ ছিল ভয়ংকর। তারপরও, মনে হতো—আমি তো এতদিন এটাই চাইছিলাম। এখন থামলে চলবে না।

তবে সে সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সবাই বলছিল যে আর নয় দফা নয়, এখন দাবি এক দফা। এর অর্থ হল সরকার পতনের এই এক দফা মূলত জনগণেরই দাবি ছিল। নয় দফা এক দফায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আমি মনে করি প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটা বিশাল অবদান ছিল। এত এত মানুষ খুন করার পর তখন বিষয়টি একটি বাইনারিতে গিয়ে দাঁড়ায়, হয় শেখ হাসিনা থাকবে অথবা আমরা থাকব। এইসব কারণেই মূলত এই কোটা আন্দোলন সর্বশেষ সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়।

৪ আগস্ট রাস্তায় আমি শাহরিয়ার নাফিসসহ অনেকের লাশ দেখি। গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় পাশের একজন। ওইদিন আমি শুধু আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে গেলে কী হবে—এই ভাবনায় আতঙ্কিত ছিলাম।  এরপর দিন ৫ আগস্ট সকাল থেকেই শুনতে পাচ্ছিলাম রাস্তায় কেউ নেই। পুলিশের বাধা দেওয়ার কারণে লোকজন রাস্তায় বের হতে পারছিল না। সেদিন সকালে, আমি আমাদের ডিওএইচএসের বাড়িতে ছিলাম এবং রাস্তার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে ফোন স্ক্রোল করছিলাম। দুপুরে টিভির পর্দায় শিরোনাম দেখতে পেলাম যে সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। তখন আমি বুঝতে পারলাম যে কিছু একটা ঘটেছে এবং রাস্তায় নেমে পড়লাম। ততক্ষণে রাস্তায় মানুষের ঢল। আমি রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম এবং সেই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম যে মানুষ আমাকে চেনে, কারণ মানুষ আমার দিকে হাত নাড়িয়ে আমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিল। এটি এমন এক মুহূর্ত যা ছিল স্বপ্নের মতো। 

এরআগে ২ আগস্ট জুমার নামাজের পর যেভাবে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নামে, তাতে বোঝা যায়—আন্দোলন ছাত্রদের সীমা ছাড়িয়ে এক গণজাগরণে পরিণত হয়েছিল। এছাড়াও দ্রোহযাত্রা ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। সাংস্কৃতিক কর্মী ও অভিনেতাদের কর্মসূচিও সরকার পতনকে জোরদার ও ঘনীভূত করেছিল।

এই আন্দোলনে মেয়েরা পিছিয়ে ছিল না—বরং সামনের সারিতে থেকেই লড়েছে। মেয়েরাই প্রথম ছাত্রলীগ নেতাদের হল থেকে বের করে দিয়েছে। মেয়েরাই ভাইদের মুক্ত করে রাস্তায় এনেছে। এখানে আমি কোনো তুলনার কথা বলছি না—শুধু বলছি নারীরা কী করেছে, কী সাহস দেখিয়েছে। এই বিদ্রোহী নারীরাই আন্দোলনকে একটা সফল বিপ্লবে পরিণত করেছে। তাদের সাহসিকতা, নেতৃত্ব, এবং আত্মত্যাগের মধ্যেই আমরা ভবিষ্যতের লড়াইয়ের পথ খুঁজে পাই। তুলনা নয়, ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আমি বলি—এই বিপ্লবে নারীরাই ছিল পরিবর্তনের চালিকাশক্তি।

  • সাবেক মুখপাত্র, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন 
শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা