ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি
অমিত রঞ্জন দে
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৫৮ এএম
অমিত রঞ্জন দে
গণঅভ্যুত্থান শব্দটা উচ্চারণের সাথে সাথে আমাদের চিত্তভ‚মিতে জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত, ব্যাপক ও সিদ্ধান্তমূলক (এসপার- কি ওসপার) আন্দোলনের চিত্র ভেসে ওঠে। আমাদের এ ভূখণ্ডের মানুষ অজস্র গণআন্দোলনের ও সংগ্রামের মধ্যদিয়েই আজকের এ পর্যায়ে এসে উপনীত হয়েছে। তাকে সামন্ত প্রভ‚দের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে, লড়তে হয়েছে জমিদার-জোতদার, ব্রিটিশ রাজত্ববাদের বিরুদ্ধে। লড়াই করতে হয়েছে ভাষার জন্য, বাংলা নামের দেশটি প্রতিষ্ঠার জন্য, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য লড়তে হয়েছে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে, লড়তে হয়েছে বা হচ্ছে বৈষম্য থেকে মুক্তির জন্য। এই লড়াই বা আন্দোলনসমূহ কখনো কখনো রূপ নিয়েছে কম বেশি ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানে।
জনগণের অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে গণঅভ্যুত্থান অবশ্যই শক্তিশালী একটি মাধ্যম। নোয়াম চমস্কির ভাষায়, ‘যখন একটি সরকার জনগণের মৌলিক অধিকার ও চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয় তখন গণঅভ্যুত্থান অপরিহার্য হয়ে ওঠে।’ গণঅভ্যুত্থানের প্রক্রিয়া ও ফলাফল সব সময় একইরকম নাও হতে পারে। এর মধ্যদিয়ে জনগণ তার ইচ্ছাশক্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটায় এবং ঐক্যবদ্ধভাবে একটি পরিবর্তন আনার সংগ্রামে মিলিত হয়। তবে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য জনগণের সমর্থনের পাশাপাশি সঠিক নেতৃত্ব অপরিহার্য। অন্যথায় তা প্রায়শই বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতায় পর্যবসিত হয়। জনসমর্থন হচ্ছে এর শক্তির দিক, দিশাহীনতা বা বেঠিক নেতৃত্ব হচ্ছে দুর্বলতার দিক। অনেক সময় নেতৃত্ব বেহাত হয়ে গণঅভ্যুত্থানের মালিকানা বেহাত হয়েও যেতে পারে।
বাংলাদেশের অভ্যুদয় এবং তৎপরবর্তী পর্যায়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সরকারসমূহকে সোজাপথে হাঁটায় বাধ্য করতে এদেশের জনগণকে মুখোমুখি হতে হয়েছে বেশ কয়েকটি গণঅভ্যুত্থানের। সেইসব গণঅভ্যুত্থানে আমাদের প্রত্যাশা কি ছিল এবং প্রাপ্তি কি মিলেছে আজকের আলোচনা সে সমস্ত বিষয় ঘিরে আবর্তিত হবে। আমরা প্রথমেই বাহান্নের ভাষা আন্দোলনের প্রতি কিছুটা দৃকপাত করতে চাই। কারণ বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনই বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রথম সোপান। তারপর তাতে পালক পরিয়েছে ঊনসত্তর। জন্ম নিয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ। এরপর আমরা পর্যবেক্ষণ করেছি নব্বই-এর দেশকাঁপানো গণঅভ্যুত্থান। সর্বশেষ আমরা পর্যবেক্ষণ করলাম ২০২৪ সালে সংগঠিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। আজকের আলোচনা এরইমধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার চেষ্টা করবো।
১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে জন্ম নেয় পাকিস্তান রাষ্ট্র। জিন্না সাহেব আমজনতাকে স্বচ্ছল জীবনের স্বপ্ন দেখান। অন্যদিকে ব্রিটিশ সা¤্রাজ্যবাদ আপোস আলোচনার মাধ্যমে দেশ বিভক্ত করে ফেলে। জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্র। দেশ ভাগ হতে না হতেই পূর্ব পাকিস্তানে জারি করা হয় সামরিক স্বৈরাচারী শাসন। পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক জীবনে নেমে আসে বঞ্চনা। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী একের পর এক লুট করতে থাকে ধন-সম্পত্তি। নিপীড়ন-নির্যাতনে স্তব্ধ হয়ে পড়তে থাকে জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা এবং তারা প্রথমেই আঘাত হানে এ ভ‚খÐের অধিকাংশ মানুষের সংস্কৃতির ভিত্তিমূল ভাষার ওপর। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে করাচিতে অনুষ্ঠিত সাংবিধানিক পরিষদের সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে গণপরিষদের স্বীকৃত ভাষা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সেই প্রস্তাব গ্রহণ না করে ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা দিলেন, ‘পাকিস্তানের একটিই রাষ্ট্রভাষা হবে এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।’ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের পিঠে চাবুক পড়ে। প্রতিবাদে গর্জে ওঠে ছাত্ররা এবং তারাই ভাষা সংগ্রামের ¯্রষ্টা হিসেবে আবির্ভূত হয়।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন তীব্র রূপ লাভ করে। কারণ ১৯৫২ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন ঢাকায় এসে আবার এক বক্তৃতায় জানান দেন, ‘উর্দুই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে যাচ্ছে।’ তখন শুকনো পাতায় আগুন লেগে যায়। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে পূর্ব পাকিস্তানে দেখা দেয় গণবিদ্রোহ। ১৪৪ ধারা অমান্য করে নূরুল আমীনের বাসভবন ‘বর্ধমান হাউস’ এর সামনে দিয়ে এগিয়ে চলে মিছিলÑ যা একসময় ছাত্র-জনতার মিছিলে রূপ নেয়।
সেদিনের সেই ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি চালিয়ে ছাত্র হত্যার ঘটনা এক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগ্রামের জন্ম দেয়। সূত্রপাত ঘটে বাঙালি জাতির প্রধান মুক্তি আন্দোলনের। বাঙালি জাতি জানিয়ে দেয়, আমরা এক ভিন্ন সত্ত¡াÑআমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি আলাদা, আমাদের শিক্ষা ও রুচি আলাদা। ২১ শে ফেব্রæয়ারি হয়ে দাঁড়ায় আমাদের স্বাতন্ত্র্য ঘোষণার দিন। ভাষা আন্দোলন বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংকট থেকে মুক্ত করে আপন পরিচয়ে মহিমান্বিত করেছে। সেদিনের সেই ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে শ্লোগান, গান আর কবিতার অগ্নিস্ফুলিঙ্গে ছাত্র-জনতা, রিক্সাওয়ালা, মুটে-মজুর সমস্বরে বলে ওঠে, ‘ছাত্র হত্যার বিচার চাই, খুনি নূরুল আমীন নিপাত যাক।’ ‘বিশ^াসঘাতক খাজা নাজিমউদ্দিনের পদত্যাগ চাই।’ ধারাবাহিক সংগ্রামের কারণে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৪ সালের ৭ মে গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করে। এর দু’বছর পর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলাকে উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।
সেখানেই শেষ নয়, ভাষার সংগ্রাম ক্রমান্বয়ে বাঙালির মুক্তির সংগ্রামে রূপায়িত হয়। বেজে ওঠে মুসলিম লীগের পতনের ঘণ্টাধ্বনি। একুশ শুধু রাজনৈতিক জীবনে আমাদের শিক্ষা দেয়নি বা এগিয়ে নিয়ে যায়নি, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতিতে যা কিছু হয়েছে বা সাহিত্য-সংস্কৃতিকে গণমুখি করে তোলার জন্য যা হয়েছে, একুশ তার সূচনা করে দিয়েছে।
ভাষা আন্দোলনের পরেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত হয় এবং তা ক্রমান্বয়ে দানা বাঁধতে থাকে। এরপর একে একে চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, চৌষট্টির দাঙ্গা পেরিয়ে জাতি মুখোমুখি হয় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৮ সালে তার শাসনের এক দশক পূর্তিতে উন্নয়ন দশক পালন করেন। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে উক্ত দশকের শোষণ নীতি ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। স্বল্পকালের মধ্যে এ প্রতিবাদ এক গণআন্দোলনের রূপ পরিগ্রহ করে, জন্ম নেয় ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান।
১৯৬৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিগণ ঢাকায় মিলিত হয়ে ‘গণতান্ত্রিক সংগ্রাম পরিষদ’ (উবসড়পৎধঃরপ অপঃরড়হ ঈড়সসরঃঃবব) গঠন করেন। ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া ও মেননের গ্রæপ) ও ডাকসুর যৌথ উদ্যোগে ‘সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন করা হয়। ছাত্ররা তাদের অধিকার আদায়ের জন্যে ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ১১ দফা মধ্যে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা অন্তুর্ভুক্ত ছিল। ১১ দফা কর্মসূচি সব শ্রেণির মানুষের সমর্থন পায়। ডাকসু ও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যৌথ উদ্যোগে পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার আদায়ে আন্দোলন আরও বড় আকার ধারণ করে। ১৪ জানুয়ারি ডাকসু এর আহবানে সারাদেশে হরতাল পালিত হয়।
১৯৬৮-৬৯ সাল জুড়ে পূর্ণগণতন্ত্র, পূর্বপাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসন এবং রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতে এক গণবিপ্লবী অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়। পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতা, নারী সমাজ সেই গণতান্ত্রিক বিপ্লবে শামিল হয়, জনগণ কারফিউ ভঙ্গ করে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঘোষণা করে ঐতিহাসিক এগারো দফা। ছাত্রদের ১১ দফার ভিত্তিতে আন্দোলন শুরু হলে ২০ জানুয়ারি ১৯৬৯ পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান শহীদ হন। ২৪ জানুয়ারি শহীদ হয় নবকুমার স্কুলের ছাত্র মতিউর এবং রুস্তম নামের এক শ্রমিক। এরপর পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ১৫ ফেব্রæয়ারি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে হত্যা করা হয়। ১৮ ফেব্রæয়ারি পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিনা কারণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহাকে হত্যা করে। ফলে আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সান্ধ্য আইন জারি ও নির্বিচারে গণহত্যা করেও আন্দোলন দমন করা যায়নি। দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি উপলব্ধি করে আইয়ুব খান বিরোধী দলীয় নেতাদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক আহবান করেন। বিরোধী নেতৃবৃন্দ তা প্রত্যাখান করেন। আইয়ুব খান বুঝতে পারলেন যে, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার না করলে আন্দোলন থামানো যাবে না। তাই ২১ ফেব্রæয়ারি এক বেতার ভাষণে বলেন যে, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও রাজবন্দিদের মুক্তি দিবেন এবং তিনি আর প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হবেন না। ২২ ফেব্রæয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান, মনি সিংহ, মতিয়া চৌধুরীসহ সবাই মুক্তি পান। ২৩ ফেব্রæয়ারি রেসকোর্স ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এক গণসংবর্ধনায় পরিষদের সভাপতি তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে শেখ মুজিবুর রহমানকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দেওয়া হয়।
১৯৬৯ সালের ১০ মার্চ আইয়ুব খান রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠক আহবান করেন। বঙ্গবন্ধু স্বায়ত্ত¡শাসনের দাবি পুনরায় ব্যক্ত করেন। দাবি প্রত্যাখ্যাত হলে তিনি বৈঠক বর্জন করেন। ফলে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। জনগণের আন্দোলনের চাপ সামলাতে না পেরে আইয়ুব খান দিশেহারা হয়ে পড়েন। তিনি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে স্বাধিকার চেতনায় জাগ্রত করে তোলে। এ কারণে পূর্ব পাকিস্তানের ঘোলাটে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে অবনতি হতে থাকে। এমতাবস্থায়, রাজনৈতিক ব্যবস্থার উন্নতিকল্পে সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালে নির্বাচনের ঘোষণা দেন। নির্বাচনে আওয়ামীলীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করলেও ইয়াহিয়া-ভ‚ট্টোর চক্রান্ত চলতে থাকে। তারা মেতে ওঠে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার চক্রান্তে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের ফলে জনগণের মধ্যে যে স্বৈরাচারবিরোধী মানসিকতা তৈরি হয় তা তাকে বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য সর্বস্ব ত্যাগের পথে পরিচালিত করে। জাতি ঝাঁপিয়ে পড়ে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে এবং লাখো শহীদের আত্মদানের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে ছাড়ে। এদেশের মানুষ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।
‘স্বাধীন হইলাম মুক্তি পাইলাম না’। এই ভ‚খÐের মানুষ বারবার লড়াই করেছেÑব্রিটিশ বেনিয়াদের হাত থেকে মুক্ত হতে, পাকিস্তানি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই করে দেশ স্বাধীন করতে। কিন্তু দেশের জনগণের জীবনে মুক্তি আসেনি। মুক্তির দরজা বারে বারে বন্ধ হয়ে গেছে। আর মুক্তিও বারে বারে উঁকি দিয়ে চলে গেছে। স্বাধীনতার তিনবছরের মাথায় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে জেলহাজতে জাতীয় চার নেতা হত্যার পর আবার সামরিক শাসন ফিরে আসে। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ১৯৮২ সালে স্বাধীন দেশে দ্বিতীয় দফা সামরিক শাসন চালু হয়। এ সময় রাজকারদের পুনর্বাসন এবং রাজনীতিবিদদের হাত থেকে রাজনীতিকে নির্বাসনে পাঠানো শুরু হয়।
১৯৮২ সালের ২০ মার্চ বন্দুকের জোরে জেনারেল এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। অবৈধ সরকার সংবিধান স্থগিত করে সামরিক শাসন জারি করে। বিগত সরকারের দুঃশাসন ও মন্ত্রীর বাড়িতে খুনি ইমদুর উপস্থিতি সে সময় জনমনে যে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, সে ক্ষোভ নতুন সামরিক সরকারকে প্রাথমিক অবস্থায় নিঃশব্দে গ্রহণ করতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু এগারো মাসের মাথায় সরকার সমর্থিত মজিদ খানের শিক্ষানীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে ছাত্রআন্দোলন। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রæয়ারি দীপালী, কাঞ্চন, মোজ্জাম্মেলের আত্মবিসর্জনের রক্তাক্ত পথ ধরে গড়ে ওঠে স্বৈরাচার বিরোধী গণআন্দোলন। ১৯৮৪ সালের ২২ ডিসেম্বর ছাত্রনেতা শাজাহান সিরাজ ও শ্রমজীবী আজিজ একসঙ্গে জীবন উৎসর্গ করে গণআন্দোলনকে নতুন মাত্রায় উত্তীর্ণ করে। দেখা যায় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে ছাত্র, শ্রমিক সংস্কৃতিকর্মী, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ডাক্তারসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের ঐকতানে মুখর হয়ে প্রবল আকার ধারণ করে।
এমতাবস্থায় স্বৈরাচারী এরশাদ কখনো নির্বাচনী প্রলোভন, কখনো শ্রমিক কমরেডকে হত্যা করে, ছাত্রনেতা সেলিম-দেলোয়ারের ওপর ট্রাক চালিয়ে দিয়ে বা শুক্রবারকে সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণা করে অথবা রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করে জনঅসন্তোষ থেকে পরিত্রাণ খুঁজেছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ধর্মানুভ‚তিকে জাগ্রত করে এবং প্রবল বন্যায় কোমর পানিতে নেমে জনসমর্থন সন্ধান করেছেন। নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করে রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার নিষ্ফল প্রয়াস পেয়েছিল স্বৈরাচার। যেখানে দলছুট, পতিত রাজনৈতিক এবং বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা পুনর্বাসিত হয়েছিল। স্বৈরশাসক এরশাদ ক্ষমতায় টিকে থাকার সবধরেনের কৌশল অবলম্বন করে।
কিন্তু ছাত্র, শিল্পশ্রমিক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী ও নাগরিক মধ্যবিত্তদের একটি বৃহৎ অংশের সম্মিলিত স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন লড়াকু নূর হোসেন, টিটো, ডাক্তার মিলনের রক্তদানের ভিতর দিয়ে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। গণআন্দোলনের মুখে সারাদেশের রেলপথ, রাজপথ ও নৌপথ অচল হয়ে পড়ে। এরশাদের মন্ত্রীরা বিভিন্ন জেলায় গিয়ে লাঞ্ছিত হয়ে ঢাকায় ফিরে আসে। দিশেহারা সরকার তখন এই আন্দোলনকে ভিন্নখাতে পরিচালিত করার অপপ্রয়াস চালায়। সারাদেশে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধিয়ে দেয়। ফলে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা তাকে বাঁচাতে পারেনি। ৩ নভেম্বর ১৯৯০ ছাত্রজনতা ঐক্যবদ্ধভাবে দাঙ্গাবিরোধী শান্তি মিছিল বের করে এবং তারা শপথ গ্রহণ করে Ñএরশাদকে না হটিয়ে ক্ষান্ত হবে না।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচারী এরশাদ গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন এবং ৯০ এর গণঅভ্যুত্থান এক চ‚ড়ান্ত গন্তব্যে উপনীত হয়। স্বৈরশাসক এরশাদের পতন হলেও শোষণ-নিপীড়ন, জুলুম-নির্যাতন বন্ধ হয় না। পিছু ছাড়ে না সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ। অথচ এই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে মানুষের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন ও পরিবর্তনের পাশাপাশি শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা, সামাজিক ন্যায় বিচার, দুর্নীতি নির্মূল, মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধ ও অবাধ ক্ষমতা প্রবণতার অবসান ইত্যাদি। গণঅভ্যুত্থানের সফল পরিণতির পর প্রণীত হয়েছিল তিনজোটের রূপরেখা ও রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে আচরণবিধি। কিন্তু সেটাও সফলভাবে বাস্তবায়িত হয় নি।
আজ ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের সাড়ে তিন দশক পর যখন মূল্যায়ন করা হয় তখন সুস্পষ্টরূপে প্রতিভাত হয় যে সে গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশার তিলার্ধ পরিমাণ প্রাপ্তি জনসাধারণের হয়নি। লাভ-লোভে মোহবিষ্ট রাজনৈতিক দলসমূহ এবং তাদের নেতা-কর্মীদের সীমাহীন অন্যায়ে ¤øান হয়ে গেছে গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা। শ্রমজীবী মেহনতী মানুষের লড়াই-স্বপ্নের এবং জনসাধারণের আত্মত্যাগের অপমৃত্যুর মাধ্যমে বেঁচে আছে ৯০ এর গণঅভ্যুত্থানের গৌরবগাঁথা। প্রতারিত জনগণের গল্পকথায় শুধু অস্তিত্ব আছে সে গণঅভুত্থানের নানাধরনের গৌরবময় “মেলানকলিক স্মৃতি”। আর ক্রমশ তা ইতিহাসের ধূলিমলিন পাতায় স্থান করে নিচ্ছে।
এদেশের মানুষ তার সংগ্রামী ঐতিহ্যের স্বাক্ষর রেখেছে বারবার। তা সে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সবক্ষেত্রে। কিন্তু তা মাঝপথে চোরাবালিতে হারিয়ে গেছে। যে অর্থনৈতিক নীতির ওপর ভিত্তি করে দেশ পরিচালিত হচ্ছে, তাতে সেটাই স্বাভাবিক। কারণ সেখানে অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত রীতিনীতি, নিয়মকানুন অনুসৃত হচ্ছে না। যেকারণে চুরি-দুর্নীতির ব্যাপক প্রসারতা লক্ষ করা যায়, যা জাতিকে এক অর্থনৈতিক চরম সংকটের মুখোমুখি করছে। অর্থনৈতিক সংকট যত ঘনীভ‚ত হচ্ছে, দ্রব্যমূল্য ততই অস্থিতিশীল হচ্ছে এবং জীবিকা যতই অনিশ্চিত হচ্ছে ততই মানুষ মরিয়া হয়ে চুরি-দুর্নীতিকেই অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরছে। জীবনের এই অর্থনৈতিক ভিত্তি ও চিন্তার প্রবণতা আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনকে গভীরভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, ষড়যন্ত্র, বিপর্যয়, মোহগ্রস্ততা, সংগ্রাম, বিজয়, সংস্কৃতি, অর্থনীতির বিকাশÑকোনো কিছুরই ধারাবাহিকতা এখনো দাঁড়ায়নি। এটি বারবার হোঁচট খাচ্ছে। ফলে জাতিকে আবার মুখোমুখি হতে হয়েছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের।
বাংলাদেশের ইতিহাসে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার সম্মিলিত সে অভ্যুত্থানে পতন হয়েছে দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারি শাসনের। কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া আন্দোলন, সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সরকারি সংগঠন এবং প্রশাসনের দমন-পীড়নের কারণে এক পর্যায়ে রূপ নেয় সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনেÑযার পটভ‚মি আওয়ামী সরকার নিজেই তৈরি করে রেখেছিল। অনেকেই ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানকে জুলাই মাসের মধ্যে ব্রাকেট বন্দী করতে চান। কিন্তু এটি একদিনের, একমাসের বা ৩৬ দিনের বিষয় না। এটি দীর্ঘসময় ধরে আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনেরই অংশ। ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের আন্দোলন, কোটা বিরোধী আন্দোলন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ও অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা বিলের মত কালো আইনের বিরুদ্ধে মানুষের যে সংগ্রাম তারই ধারাবাহিকতায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। তবে ১৫ জুলাই ২০২৪ ছাত্রলীগ যখন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা চালায় তখন মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভ‚ত ক্ষোভ গণসংগ্রামে রূপায়িত হয়।
২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত বিশ^াসযোগ্য একটি নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামীলীগ সরকার গঠন করে। সুযোগ ছিল দেশকে মুক্তিযুদ্ধের প্রগতিশীল ধারায় ফিরিয়ে আনার। কিন্তু তারা তা না করে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা থেকে সরে গিয়ে একধরনের ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যবসায়’ লিপ্ত হয় এবং তা নিয়ে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের খেলা শুরু হয়। দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পরিচালিত করার জন্য যে ধরনের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন আনা দরকার ছিল তার কোনো কিছুই না করে পূর্ববর্তী শাসকদের অনুসৃত লুটেরা পুঁজিবাদী ধারাতে দেশ পরিচালনার পথ বেছে নেয়। তারা দেশব্যাপী সহিংসতা ও নৈরাজ্য পরিস্থিতি উস্কে দেয়। কুখ্যাত রাজাকার কাদের মোল্লার রায় নিয়ে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হলে ২০১৩ সালে রাজাকারদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে জনগণ ফুঁসে ওঠে, সারা বাংলায় তৈরি হয় গণজাগরণ মঞ্চ। এই গণআন্দোলন শেখ হাসিনার ভিত কাঁপিয়ে দেয়। ২০১৪ সাল থেকেই শেখ হাসিনার সরকার একটি মেয়াদোত্তীর্ণ সরকারে পরিণত হয়। ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় জয়ী ঘোষণার মাধ্যমে তা আরো প্রহসনে পরিণত করে। ২০১৮ সালে আগের রাতেই ভোটের বাক্স ভরে রাখার নির্বাচনী প্রহসনও আমরা লক্ষ্য করেছি। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কোনো রকমের সমঝোতা ছাড়াই একটা ডামি নির্বাচন সংগঠিত করার মাধ্যমে জনগণের সব অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। কেউ কথা বললেই তাকে ‘বিএনপি-জামায়াত-রাজাকার’ তকমা দিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে।
এই সময়ে সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা ও স্বৈরাচারী আচরণ অতিতের সকল রেকর্ড ছাপিয়ে যায়। একদিকে চলতে থাকা সীমাহীন দুর্নীতি, প্রশাসনের সর্বত্র দলীয়করণ-আত্মীকরণ, সাধারণ জনগণের উপর দলীয় কর্মীদের খবরদারীত্ব, লুটপাট, অর্থপাচার, ঋণখেলাপী, ব্যাংকজালিয়াতি, দলীয় লেজুড়বৃত্তি, সর্বত্র তোষামোদী-চাটুকারিতা, টেন্ডারবাজি যেভাবে অতিসাধারণ-স্বাভাবিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিয়মের বিষয় হয়ে উঠেছিল তাতে দেশের মানুষের মধ্যে অসন্তোষ-হতাশা এবং ক্ষোভ ধীরে ধীরে জমাট বাঁধছিল। আর অন্যদিকে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি জনজীবনকে দুর্বিসহ করে তোলে। এরই মধ্যে ২০১৮ সালে একবার কোটা সংস্কার আন্দোলন সংগঠিত হয়। তখন সরকার গোটা কোটা ব্যবস্থায় বাতিল করে দেয়। পরবর্তী সময়ে আবার আদালতের রায়ের মাধ্যমে কোটা ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার কৌশল নেয়। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে কোর্টের মাধ্যমে কোটা ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার রায় প্রকাশিত হলে ছাত্র সমাজ আবার ফুঁসে ওঠে। তারা আওয়াজ তোলে ‘কোটা না মেধাÑমেধা মেধা।’ এরসাথে যুক্ত হয় বৈষম্য নিরসনের কথা।
সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার বিরুদ্ধে ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নেমে যে সংগ্রাম শুরু করেছিল সেই সংগ্রামই বৈষম্য বিরোধী এবং চ‚ড়ান্ত পর্যায়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়। মাত্র দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে এই সংগ্রামই দাবানলের মত জ¦লে ওঠে। দীর্ঘদিনের অন্যায়, অবিচার, দম্ভ, মানুষের প্রতি অবজ্ঞাসহ নানা কারণে পুূঞ্জিভ‚ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে। এই বিক্ষোভ দ্রæতই গণবিক্ষোভে পরিণত হয়। অবশেষে ৫ আগস্ট সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয় এবং শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়।
এই গণঅভ্যুত্থান ঊনসত্তর বা নব্বই এর গণঅভ্যুত্থানের মত সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে রাজনৈতিক মৈত্রী, জোট বা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ দ্বারা পরিচালিত হয়নি। এই আন্দোলনের চালকের আসনে থাকা সমন্বয়কারীরাও ছিলেন বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী। তবে অংশগ্রহণকারী ছাত্র নেতৃত্ব ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের নানামুূখী সৃজনশীলতা এই আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। ছাত্রদের আন্দোলনে যুক্ত হয়ে একে একে রাজপথে নামেন গার্মেন্টস শ্রমিক, রিকশাচালক, দিনমজুর, বেসরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী থেকে শুরু করে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে ধীরে ধীরে যুক্ত হতে থাকে আরো অন্যান্য দাবি। নানা প্রত্যাশা ও লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন সাধারণ মানুষ। ফলে তা গণআন্দোলনে রূপ লাভ করে এবং গণআন্দোলনের শুরুতে রাজনৈতিক কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকলেও এবং খুব সাধারণ লক্ষ্যে তা পরিচালিত হলেও দেয়ালে দেয়ালে চিত্রিত গ্রাফিতি এবং জনসমাবেশ থেকে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা ব্যক্ত হয়েছে সেটাই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের অন্তর্নিহিত মূল আকাক্সক্ষায় পরিণত হয়েছে।
যদিও এ ধরনের মিশ্র চরিত্রের শক্তির সমন্বয়ে সংগঠিত গণঅভ্যুত্থানের গতিপথ ও ভবিষ্যৎ পরিণতি নির্ভর করে আন্দোলনের ক্রমবিকাশমান শক্তিভারসাম্য ও নেতৃত্বের চরিত্রের ওপর। আন্দোলনের নেতৃত্ব দানকারী, অংশগ্রহণকারী ও আন্দোলনের সুবিধাভোগীদের মধ্যে নানামাত্রিক দ্ব›দ্ব ছিলো এবং এখনো আছে। এই আন্দোলনে প্রগতিশীল শক্তি যেমন ছিলো তেমনি সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ ও সা¤্রাজ্যবাদের প্রভাবও ছিলো। আন্দোলন শেষে সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ এবং সা¤্রাজ্যবাদের প্রভাব বলয় সম্প্রসারিত হচ্ছে। এদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে অসহিষ্ণু বা নিপীড়ক একেকটা পক্ষ আবির্ভূত হচ্ছে। তারাও ক্ষমতাচ‚্যত সরকারের ন্যায় মানুষের মতপ্রকাশে বাধা তৈরি করছে, সহিংসতা সৃষ্টি করছে, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস চালাচ্ছে, নারীর প্রতি ভীষণ অসহিষ্ণু আচরণ, ধর্ষণ ভয়ানক মাত্রা নিয়েছে।
এদের দাপটে এবং দেশের ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, নাজুক প্রশাসনিক অবস্থার সুযোগে সামাজিক ফ্যাসিবাদী প্রবণতা ও গণতন্ত্র পরিপন্থী শক্তির উল্লম্ফন ঘটেছে। আজ দেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ভিন্নমতাবলম্বী মানুষ, জাতীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, এমনকি মহান মুক্তিযুদ্ধকেও পদদলিত করার অপচেষ্টা ক্রমান্বয়ে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে। তারা জাতীয় সংগীত ও সংবিধানকে নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। আজকে ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের মানুষ ভয়াবহ বিপদের মুখে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের মাধ্যমে মব তৈরি করে প্রকাশ্যে মাজার ভাঙা হচ্ছে, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। নানা ধরনের প্র্রোপাগাÐা চালিয়ে দেশের মধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।
সেই অস্থিরতার সুযোগ করিডোর-বন্দর ইত্যাদি বিদেশীদের কাছে বন্ধক দিয়ে দেয়া হচ্ছে। দুর্নীতি আর লুটপাট আগের মতোই মহাসমারোহে চলছে, কিছু ক্ষেত্রে এর মাত্রা বরং কয়েকগুণ বেড়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাও নিশ্চিত হয়নি, এখনও সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কুখ্যাত আইনে গ্রেপ্তার-হয়রানি চলছে। কমেনি সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাও। বিগত কয়েকটি সরকারের মতো ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একই কৌশলে হিন্দু সম্প্রদায়সহ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা, ভাংচুর, লুটপাটের ঘটনা ঘটেই চলেছে। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা আরও অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। এর সাথে নতুন করে যোগ হয়েছে মব সন্ত্রাস, অর্থাৎ যাকে তাকে যেকোনভাবে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছে। এই ভয়াবহ মব সন্ত্রাস প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়া তো দূরের কথা, উল্টো সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে এদেরকে ‘প্রেসার গ্রæপ’ আখ্যা দিয়ে প্রকারান্তরে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে।
ফলে প্রত্যাশার উচ্চস্থান থেকে হতাশার চোরাবালিতে পতিত হওয়ার চিত্রই ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আজকে শুধু গণঅভ্যুত্থানের মালিকানা নয়Ñ দেশের মালিকানাও একটি ক্ষুদ্র সুবিধাভোগী শ্রেণীর হাতে কুক্ষিগত হয়ে পড়ছে। যেসব ন্যায্য দাবি ও প্রত্যাশা নিয়ে সর্বস্তরের জনগণ ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে নেমেছিল, নিজের প্রাণ বিসর্জন দিতেও পিছপা হয়নি, সেগুলোর প্রায় কোনটিই পূরণ হয়নি। নিশ্চিত হয়নি জুলাই অভ্যুত্থানে হত্যা-নির্যাতন-নিপীড়নের ঘটনার ন্যায়বিচারও। বরং, অভ্যুত্থানে সক্রিয় একটি গোষ্ঠী অভ্যুত্থানের নাম ভাঙিয়ে নিজেদের আখের গোছানোর ষড়যন্ত্রের নেমেছে। তবে একটা বিষয় মনে রাখা দরকারÑতা হলো, প্রজন্ম ও প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি কোনো স্থির বিষয় নয়; যুগে-যুগে প্রজন্মের রুচি-রূপ এবং দৃৃষ্টিভঙ্গি পাল্টায়। কিন্তু ইতিহাস তার জায়গায় ঠিকই থেকে যায়, থেকে যায় মুক্তির আকাক্সক্ষা। তাই ক্ষমতার পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন। যার মধ্যদিয়ে আমরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অর্থে বৈষম্য নিরসন করে সাম্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।