ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি
মেরিনা লাভলী, রংপুর
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৫১ এএম
গত বছরের জুলাই জুড়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন চলছিল রংপুরে। ১৬ জুলাই স্কুল, কলেজ, মেডিকেলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধ হয়। সেদিন মোড়ে মোড়ে ছিল পুলিশের বাধা। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য হয়ে শিক্ষার্থীরা রাজপথে এগিয়ে চলেছিল বীরদর্পে। যেন ১৬ জুলাইয়ের সূর্যটা উঠেছিল ইতিহাসের সাক্ষী হতে। রক্তিম সূর্যটা যখন মাথার ওপর তখনই সৃষ্টি হয় ইতিহাস। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ, রাবার বুলেট, টিয়ারসেল নিক্ষেপ চলে। এরই এক পর্যায়ে দু’হাত প্রসারিত করে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ দাঁড়িয়েছিল বন্দুকের নলের সামনে। কিন্তু পুলিশ একের পর এক গুলি ছুড়লে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন নিরস্ত্র আবু সাঈদ। তার আত্মত্যাগে ইতিহাস পেল নতুন জাগরণ। আবু সাঈদের রক্ত মিশে গেল মাটিতে, আর মাটির গন্ধ ছড়িয়ে দিল মুক্তির শপথ। গ্রাম থেকে শহর, গলি থেকে মহাসড়ক, প্রতিটি স্থানে জেগে উঠলে এক দফার জোয়ারে। আর সেই উত্তাল ঢেউ ভেঙে দেয় স্বৈরাচারের প্রাচীর। আবু সাঈদের আত্মত্যাগ হয়ে উঠে বিজয়ের শঙ্খধ্বনি।
আবু সাঈদের মৃত্যুর পর সারাদেশের ছাত্র-জনতা ক্রোধে ফেটে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ১৬ জুলাই রাতে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিন্ডিকেট সভা করে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা ও শিক্ষার্থীদের ১৭ জুলাই বেলা ১২টার মধ্যে হলত্যাগের নির্দেশ দেয়। আবু সাঈদকে হত্যার প্রতিবাদে ১৭ জুলাই দুপুরে শিক্ষকরা ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করে। ওইদিন দুপুরে শিক্ষার্থীরা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক নম্বর গেটকে শহীদ আবু সাঈদ গেট হিসেবে নামকরণ করে। ১৮ জুলাই রংপুর জিলা স্কুল মোড়ে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির ডাক দেয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও অভিভাকরা নগরীতে বিক্ষোভ মিছিল করে। আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ায় ক্ষোভে ছাত্র-জনতা বিকেল ৩টার দিকে নগরীর মর্ডাণ মোড়স্থ তাজহাট থানা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে নগরীর ঘাঘটপাড়ার অটোরিকশাচালক মানিক মিয়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। ওইদিন বিকেল ৫টার দিকে ছাত্র-জনতা নগরীর বেতপট্টিস্থ মহানগর ও জেলা আওয়ামী লীগ অফিস ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে।
আবু সাঈদের মৃত্যুর পর ১৯ জুলাই রংপুরে বড় আন্দোলন সংগঠিত হয়। এদিন বিকেলে বিএনপি দলীয় কার্যালয় থেকে কয়েক হাজার নেতাকর্মী বিক্ষোভ মিছিল বের করে। নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সহস্রাধিক ছাত্র-জনতা সেই মিছিলে যোগ দেয়। বিকেল ৫টার দিকে তারা সিটি বাজারের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। সেখানে পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশ প্রাণঘাতি বুলেট, রাবার বুলেট, টিয়ারসেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। পুলিশ এপিসি ব্যবহার করে ছাত্র-জনতাকে দমানোর চেষ্টা করে। এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নগরীর পূর্বশালবন এলাকার সবজি বিক্রেতা সাজ্জাদ হোসেন, পূর্ব গণেশপুরের স্বর্ণ শ্রমিক মোসলেম উদ্দিন, ফল ব্যবসায়ী নিউ জুম্মাপাড়ার মেরাজুল ইসলাম ও পূর্ব শালবনের বাসিন্দা ঢাকার বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব গ্লাস অ্যান্ড সিরামিকসের অষ্টম সেমিস্টারের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল তাহির শহীদ হন। গুলিবিদ্ধ হন শতাধিক ছাত্র-জনতা।
বিজয়ের আগের দিন ৪ আগস্ট রংপুরে আরেকটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা পিস্তল, দেশীয় অস্ত্র-লাঠিসোটা নিয়ে ছাত্র-জনতার কর্মসূতিতে হামলা চালায়। এতে আওয়ামী লীগ নেতা সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর হারাধন রায় হারাসহ আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের চারজন নিহত হন। নগরীর উত্তাপ উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়, এমপি, উপজেলা ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের বাড়ি ও অফিসে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে উল্লাসে ফেটে পড়ে রংপুরবাসী। শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীসহ সকল বয়সী ও শ্রেণি পেশার মানুষ বৃষ্টির মধ্যে রাজপথে নেমে এসে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে।
জুলাইযোদ্ধা সিয়াম আহসান আয়ান বলেন, আবু সাঈদ ভাইকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করবে না- এ বিশ্বাস ছিল। তিনি পুলিশের সামনে দু’হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্ত পুলিশ গুলি করে আবু সাঈদ ভাইকে হত্যা করে। আবু সাঈদ ভাই মারা গেছে- এই খবর শুনে কেউ ক্ষোভ ধরে রাখতে পারেনি।
জুলাইযোদ্ধা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন মহানগরের সাবেক মুখপাত্র নাহিদ হাসান খন্দকার বলেন, আবু সাঈদের আত্মত্যাগের কারণে সারাদেশের ছাত্র-জনতা এক হয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। এ কারণে আমরা ৫ আগস্ট বিজয় অর্জন করতে পারি। কিন্তু আবু সাঈদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন এ সরকার করেনি। আবু সাঈদের রংপুরে বাজেট বৈষম্য করা হচ্ছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সর্বক্ষেত্রে রংপুরকে বিগত সরকারের মত পিছিয়ে রাখা হয়েছে।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার সাক্ষী অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, সারাদেশে যখন গণজাগরণ তৈরি হচ্ছিলো, ঠিক সেই সময় আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে গুলি করা হলো। তখন মানুষ বুঝে গিয়েছিল যে, রাষ্ট্রের কাছে মানুষের জীবনের মূল্য নেই। তখন মানুষ প্রতিজ্ঞা নেয়- হয় বিজয় অর্জন করবো না হয় আবু সাঈদের মত শহীদ হবো। আবু সাঈদের জীবন দান এ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট ছিল এবং আন্দোলনকে সবচেয়ে বেশি ত্বরান্বিত করে বিজয়ের দিকে নিয়ে গেছে।