প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ০৮:৩১ এএম
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৫ ০৯:৫১ এএম
ফাইল ফটো
খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জি মতে, আজ ৫ আগস্ট। আর ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনকারীদের ভাষায় ঐতিহাসিক ৩৬ জুলাই। ২০২৪ সালের এদিন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন দুর্দান্ত প্রতাপে সাড়ে ১৫ বছর দেশ শাসন করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রবল জনস্রোতের মুখে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে গণভবনের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে হেলিকপ্টারযোগে দেশ ছাড়েন তিনি। তার আগে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে চরম শক্তি প্রয়োগ করেন শেখ হাসিনা। ব্যবহার করেন মারণাস্ত্র। তার নির্দেশে পুলিশ, র্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও ছোড়া হয় গুলি। তারপরও শেষ রক্ষা হয়নি। ক্ষমতার মসনদ ছেড়ে দেশ ছাড়তে হয় তাকে।
আন্দোলনের সূত্রপাত
সরকারি চাকরিতে অতিরিক্ত (৫৬ শতাংশ) কোটা ঘিরে আন্দোলনের সূত্রপাত। তার আগে ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার করতে ছাত্ররা রাজপথে নামেন। তারা দীর্ঘ কয়েক মাস আন্দোলন করেন। তখন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সংস্কার না করে বরং কোটা ব্যবস্থা তুলে দেন। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা আপিল করলে গত বছরের ৫ জুন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর সরকারের জারি করা পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণা করেন। এতে চাকরিতে আবারও কোটা পদ্ধতি ফিরে আসে।
সেদিনই ফের আন্দোলনে নামেন ছাত্ররা। প্রথমে মানববন্ধন, বিক্ষোভসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আন্দোলন চালিয়ে যান তারা। কোটা সংস্কারের দাবিতে গঠন করেন ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ প্লাটফর্ম। আন্দোলন সফল করতে ৮ জুলাই সংগঠনটি ৬৫ সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি ঘোষণা করে, যার মধ্যে ছিলেন ২৩ জন সমন্বয়ক ও ৪২ জন সহ-সমন্বয়ক। পরবর্তীতে ১৪ জুলাই ছাত্রদের রাজাকারের নাতি-পুতি আখ্যায়িত করেন শেখ হাসিনা। এর প্রতিবাদে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যরাতে রাজপথে নেমে আসেন শিক্ষার্থীরা। সেই আন্দোলনে পরদিন শিক্ষার্থীদের ওপর হামলে পড়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগ। তারা ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের রক্তাক্ত করে। এ সময় অনেক নারী শিক্ষার্থী নিগৃহীত হন। এর প্রতিবাদে ১৬ জুলাই সারা দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেদিন রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ নামে এক শিক্ষার্থীসহ সারা দেশে ৬ জনের মৃত্যু হয়। আবু সাঈদের মৃত্যুর দৃশ্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। এতে সোচ্চার হয়ে ওঠে দেশবাসী, প্রবাসীরাও সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। বন্ধ করে দেয় বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানো। প্রবাসী শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেন। আন্দোলনে বল প্রয়োগের বিষয়ে মুখ খোলে জাতিসংঘও।
আওয়ামী দুঃশাসন
২০০৯ সালে বিপুল সংখ্যক জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। সরকার গঠন করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়। এটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো চরম প্রতিবাদ করলেও তা কানে তোলেননি শেখ হাসিনা। এতে করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথ খুলে যায়। যদিও ইতঃপূর্বে সব দল মিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করেছিল। সেই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলে সংবিধানে আনা হয় সংশোধনী। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে অস্বীকৃতি জানায় রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে ২০১৪ সালে নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি-জামায়াত জোট। এ সময় জাতীয় পার্টি ও কয়েকটি বামপন্থি রাজনৈতিক দল নিয়ে নির্বাচন করে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন শেখ হাসিনা। তার এই শাসনামলে বাড়তে থাকে বিরোধী দলগুলোর প্রতি হামলা-মামলা, গুম-খুন। সেই সঙ্গে চলতে থাকে অর্থ ও দেশের সম্পদ পাচার। এসবের ধারাবাহিকতা ক্ষমতাচ্যুতির শেষদিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এর মধ্যে ২০১৫ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর প্রথমে ১০ ও পরবর্তীতে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট বসানো হয়। এর প্রতিবাদে ছাত্ররা নেমে আসেন রাস্তায়। বাধ্য হয়ে তুলে নেওয়া হয় ভ্যাট।
২০১৮ সালে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে নির্বাচনে আসে বিএনপি। কিন্তু সেই নির্বাচনে দিনের ভোট আগের দিন রাতেই করা হয়ে যায়। আবার ৫ বছরের জন্য ক্ষমতায় বসেন শেখ হাসিনা। সরকারের এই মেয়াদে রাষ্ট্রীয় মদদে বাড়তে থাকে গুম-খুন, অত্যাচার-নির্যাতন। এমপি-মন্ত্রীরা দেশের সম্পদ পাচারের প্রতিযোগিতায় নামেন। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর বেড়ে যায় অত্যাচার, হামলা-মামলা। এ সময় ঘটে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তীতে নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। ২০২৪ সালে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার জাতীয় পার্টিকে নিয়ে ডামি নির্বাচন করে আবার ক্ষমতায় বসে ৫ বছরের জন্য। জানুয়ারিতে গঠন করা হয় মন্ত্রিপরিষদ। বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বর্জন করে।
আবার ফিরে আসে কোটা
২০২৪ সালের জুনে আদালতের নির্দেশে আবার ফিরে আসে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি। ছাত্ররা এটি সংস্কারের জন্য নেমে আসেন রাজপথে। ছাত্রদের নিরস্ত্র আন্দোলনে শক্তিপ্রয়োগ শুরু করে সরকার। গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে তুলে নেওয়া হয় কয়েকজন সমন্বয়ককে। এতে ছাত্রদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। ১৬ আগস্ট রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে প্রকাশ্যে পুলিশ গুলি করে হত্যা করা হয়। এদিন ঢাকায় দুজন, চট্টগ্রামে ৩ জনসহ মোট ৬ জনের প্রাণ কেড়ে নেয় পুলিশের গুলি। সঙ্গে যুক্ত ছিল ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলা।
এ অবস্থায় ছাত্রদের আন্দোলনে যুক্ত হয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। শ্রমিক, কৃষক, গার্মেন্টস কর্মীসহ সমাজের সব স্তরের জনতাও নেমে যায় রাজপথে। কেননা তারাও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতিতে ছিল দিশেহারা। সবার প্রত্যাশা ছিলÑ সরকার পাল্টালে বদলাবে তাদের ভাগ্য। এদিকে আন্দোলন যত বেগবান হতে থাকে ততই বাড়তে থাকে সরকারের বলপ্রয়োগ। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের সমর্থক ক্যাডারদের মাঠে নামিয়ে দেয় সরকার, যার ফলে এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
আন্দোলন যখন সহিংস হয়ে ওঠে, সমন্বয়করা তখন সারা দেশে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায় স্বীকার করে শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্য ক্ষমা চাওয়াসহ বেশ কয়েকটি দাবি জানান। কিন্তু সরকার তা না করে আন্দোলন দমনে কৌশল অবলম্বন করে। তারা আন্দোলনের ছয়জন সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, নুসরাত তাবাসসুম এবং আবু বাকের মজুমদারকে তুলে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ে আটকে রাখে। বাইরে থাকা কয়েকজন সমন্বয়ক তখন ৯ দফা ঘোষণা করে আন্দোলন চালিয়ে যান।
পরে ছয় সমন্বয়ক মুক্তি পাওয়ার পর ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এক জনসভায় শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবি তুলে এক দফা ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম। শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণার পর আন্দোলনকারীদের ওপর দমনপীড়ন আরও বেড়ে যায়। এরপর আন্দোলনকারীরা ৫ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এদিনটিকে তারা ‘৩৬ জুলাই’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তাদের মতে, শেখ হাসিনার পতন না হওয়া পর্যন্ত জুলাই মাস শেষ হবে না।
অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক দিন ৫ আগস্ট। ভোর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও শহরতলি থেকে লাখ লাখ মানুষ রাজধানীর শাহবাগ অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। ঢাকার বাইরে থেকেও হাজার হাজার মানুষ পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে রাজধানীতে আসার চেষ্টা করে। পরিস্থিতি তখন ছিল চরম উত্তেজনাপূর্ণ ও অস্থির। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে হাজার হাজার মানুষ জীবন দেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল। কোনো কিছুই তাদের থামাতে পারেনি। তারা যেকোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পদদলিত করে শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা উপলব্ধি করেনÑ এটাই তার বাংলাদেশের মাটিতে শেষ মুহূর্ত। তাকে বিদায় নিতে হবে।
এরপর শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে ভারতের উদ্দেশে দেশত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে তার দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।
জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে এবং হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে। এদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর গুলিতে হতাহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১২-১৩ শতাংশ ছিল শিশু।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর ৮ আগস্ট ২০২৪ সালে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। এতে স্থান পায় আন্দোলনে নেতৃত্ব নেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ও অপর সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, তারপর যুক্ত হন মাহফুজ আলম। পরে অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকার থেকে পদত্যাগ করে নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন নাহিদ ইসলাম।
ছাত-জনতার অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা পৃথক পৃথক বাণী দিয়েছেন। তা ছাড়া অভ্যুত্থান দিসবটি উপলক্ষে আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের রুহের মাগফিরাত এবং আহতদের সুস্থতা কামনায় মসজিদ, মন্দিরসহ বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে দোয়া ও প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছে। এদিকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জুলাই ঘোষণাপত্রের খসড়া চূড়ান্ত করেছে। আজ মঙ্গলবার বিকাল ৫টায় জুলাই ঘোষণাপত্র জাতির সামনে উপস্থাপন করবেন প্রধান উপদেষ্টা।