ফিরে দেখা, ৩ আগস্ট ২০২৪
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৫ ০৮:৫২ এএম
ফাইল ফটো
গত বছরের ৩ আগস্ট রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে এক দফা ঘোষণা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংলাপের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়কারী নাহিদ ইসলাম বিকাল ৫টার দিকে সর্বস্তরের হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে এই ঘোষণা দেন।
এর আগে এদিন সকালে, শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবন গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, ‘গণভবনের দরজা খোলা। আমি আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে বসতে চাই এবং তাদের কথা শুনতে চাই। আমি কোনো সংঘাত চাই না।’
তবে বিকালের সমাবেশে শেখ হাসিনার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে নাহিদ বলেন, তারা শুধু শেখ হাসিনার নয়, সম্পূর্ণ মন্ত্রিসভার পদত্যাগ দাবি করছেন। তারা সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বয়ে একটি জাতীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করবেন। সবাইকে ৪ আগস্ট থেকে তাদের পূর্বঘোষিত সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশটি সন্ধ্যা ৬টার দিকে শেষ হয়। বিক্ষোভকারীরা টিএসসি এলাকায় জড়ো হয়ে রাজু ভাস্কর্যের চোখ লাল কাপড় দিয়ে বেঁধে দেয়। পরে বিক্ষোভকারীরা সন্ধ্যা ৭টার দিকে শাহবাগ মোড় অবরোধ করে।
এদিন আন্দোলনের আরেক প্রধান সমন্বয়কারী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অসহযোগ আন্দোলন সফল করতে জনগণের জন্য ১৫ দফা ঘোষণা দেন। দফাগুলো ছিলÑ কেউ কর দেবে না, কেউ কোনো ইউটিলিটি বিল পরিশোধ করবে না, সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, অফিস, আদালত, কলকারখানা বন্ধ থাকবে, মানুষ অফিসে যাবে না। তবে মাস শেষে বেতন সংগ্রহ করবে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে, প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাবে না, জনগণ সব ধরনের সরকারি সভা, সেমিনার ও অনুষ্ঠান বয়কট করবে, বন্দরের শ্রমিকরা কোনো ধরনের পণ্য খালাস করবে না বা কাজ করবে না, দেশের সকল কলকারখানা বন্ধ থাকবে, তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকরা কাজে যাবে না, গণপরিবহন চলবে না, শ্রমিকরা কাজে যাবে না, ব্যাংক শুধু রোববার জরুরি লেনদেনের জন্য খোলা থাকবে, পুলিশ সদস্যরা শুধু থানায় নিয়মিত দায়িত্ব পালন করবে, কোনো প্রটোকল, বিক্ষোভ দমনে দায়িত্ব পালন করবে না, এক টাকাও পাচার হবে না এবং কোনো অফশোর লেনদেন হবে না, বিজিবি ও নৌবাহিনী ব্যতীত অন্য বাহিনী ব্যারাকের বাইরে কোনো দায়িত্ব পালন করবে না, বিজিবি ও নৌবাহিনী ব্যারাক ও উপকূলীয় এলাকায় থাকবে, আমলারা সচিবালয়ে যাবেন না, জেলা প্রশাসক বা উপজেলা কর্মকর্তারা অফিসে যাবেন না, বিলাসবহুল পণ্যের দোকান, শো-রুম, দোকানপাট, হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকবে।
এর আগে, সকাল থেকেই বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানুষ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দিকে আসতে শুরু করে, তারা জাতীয় পতাকা, ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন। এই এলাকাগুলো ‘দফা এক, দাবি এক, শেখ হাসিনার পদত্যাগ’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে।
ছাত্ররা বিকালে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় এবং মিরপুর রোড অবরোধ করেন। এ সময় মিরপুর-১০ গোলচত্বরে হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ করেন। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যরাও মিরপুরের ডিওএইচএস এলাকায় এক সমাবেশ করে আন্দোলন চলাকালে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন। এদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা শহরজুড়ে অবস্থান নিলেও তারা বিক্ষোভকারীদের খুব একটা বাধা সৃষ্টি করেনি।
তবে সেদিন সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজধানীর সেনা সদর দপ্তরে অবস্থিত হেলমেট অডিটোরিয়ামে নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে সেনা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেন এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে জনগণের জীবন, সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
সেদিনই বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মিছিল করে এবং কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সারা দেশে চারজন সাংবাদিক নিহত হওয়ার ঘটনায় সরকারের পদত্যাগ দাবি করে।
এ ছাড়াও রাজধানীর বাইরে শিক্ষার্থীরা ৩ আগস্টও তাদের আন্দোলন চালিয়ে যায় এবং দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক অবরোধ করে রাজধানীর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।