× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

‘লড়াইটা আদিবাসীদের একার নয়’

প্রবা প্রতিবেদক

প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২২ ১৬:০১ পিএম

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২২ ১৬:০১ পিএম

আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে শহীদ মিনার থেকে বেলুন উড়িয়ে দিচ্ছে উপস্থিতরা

আদিবাসী দিবসের অনুষ্ঠানে শহীদ মিনার থেকে বেলুন উড়িয়ে দিচ্ছে উপস্থিতরা

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর ও পার্বত্য শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরের পঁচিশ বছরের বেশি সময় কেটে গেলেও এখন বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘আদিবাসী’ স্বীকৃতি না দেওয়ায় ক্ষোভ এসেছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের আয়োজনে।

মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের আয়োজনে আদিবাসী দিবসের কেন্দ্রীয় আয়োজনে অংশ নিয়ে রাজনীতিবিদ, সংস্কৃতিকর্মী ও অধিকারকর্মীরা ‘আদিবাসী’ শব্দটি উচ্চারণে সরকারি বিধিনিষেধের কট্টর সমালোচনা করেন।

বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার (সন্তু লারমা) সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অনুষ্ঠানে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাধারণ সম্পাদক শিরিন আখতার, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির, পরিবেশ অধিকার কর্মী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিবাসী নারী নেত্রী বাসন্তী মুর্মূসহ আরও অনেকে বক্তব্য রাখেন।

মঙ্গলবার সকালে বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ। বক্তব্যের পাশাপাশি মাদলসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাংস্কৃতিক পরিবেশনার পর শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শেষ হয় দিবসের কর্মসূচি।

অনুষ্ঠানে মায়ের সাথে এসেছে আদিবাসী মেয়ে শিশু 

এ বছর আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য হল ‘ঐতিহ্যগত জ্ঞান সংরক্ষণ ও বিকাশে আদিবাসী নারীদের ভূমিকা’।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধক বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ বলেন, ৩৬৫ দিন ঘুরে আবার আদিবাসী দিবস এসেছে। আমরা গত বছর যে কথাগুলো বলেছিলাম, আজকে আবার সেই কথাগুলোই বলতে হচ্ছে। এই শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে কথা বলে লাভ হবে না। আমাদের কথা বলতে হবে সংসদে, ঘেরাও করতে হবে স্পর্শকাতর নানা জায়গা। অনিরাপদ পথেই হাঁটতে হবে আমাদের।

আদিবাসীদের ওপর অত্যাচার-নিপীড়ন ও দেশব্যাপী সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়নের নানা চিত্র একই সুতোয় গাঁথা বলে মনে করেন অভিনেতা মামুনুর রশীদ।

তিনি বলেন, দুটোই হল লুণ্ঠন প্রক্রিয়া। দুটোকেই আমি দেখি, দুর্বলের ওপর সবলের অত্যাচার হিসেবে। পঁচাত্তরের পনের অগাস্টের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হয়ে পাহাড় যেন চির অস্থিতিশীল হয় তার সব বন্দোবস্ত করে গেছেন। আজকে বলা হচ্ছে, পাহাড়ের মানুষ কেন অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। দিনের পর দিন সেখানে খুন, গুম হচ্ছে। একের পর এক হত্যাযজ্ঞের বিচার না পেয়ে তারা তো ক্ষুব্ধ হবেই।

অনুষ্ঠানে সন্তু লারমা বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান রচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের আদিবাসীদের পরিচয় হরণ করা হয়। সেই সংবিধানে বলা হয়, বাংলাদেশের অধিবাসীদের বাঙালি নামে পরিচয় দেওয়া হবে। এরপর থেকেই বিগত ৫০ বছর যাবত আদিবাসীদের বিলুপ্ত করার জন্য বিভিন্ন চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। ভূমি হারানোর যন্ত্রণা যিনি ভূমি হারিয়েছেন, তিনি ছাড়া আর কেউ বোঝেন না। আজকে বাংলাদেশে এমন কোনো আদিবাসী পরিবার নেই, যেই পরিবার নানাভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি, নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ার পাশাপাশি সন্তু লারমা বলেন, “সরকার অনেক গালভরা কথা বলে। পার্বত্য অঞ্চলে উন্নয়নের নামে রাস্তাঘাট, পর্যটন ব্যবস্থা চালু করে সামরিক বাহিনীর স্বার্থ হাসিল করা হচ্ছে। আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে তাদের ভূমিহীন করে দেওয়া হচ্ছে। সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সংরক্ষণে সরকারের তেমন কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখতে পাই না।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন বলেন, অধিকারের লড়াই কেবল আদিবাসীদের একার নয়, লড়াইটা সবার। আমি সেদিনের অপেক্ষায় যেদিন এ দেশে আদিবাসী শব্দটি রাষ্ট্রীয়ভাবে গৃহীত হবে।

বাংলাদেশ বসবাসরত বিভিন্ন জাতিসত্তা সরকারি তালিকাভুক্ত হলেও তাতে ‘আদিবাসী’ নাগরিকদের কেবল আংশিক স্বীকৃতি এসেছে বলে মন্তব্য করেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কমিটির সভাপতি ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু।

তিনি বলেন, যারা মনে করছে চাকমা, মারমাদের আদিবাসী বললে সংবিধান লঙ্ঘিত হবে, তারা দেশও বুঝে না, জাতিও বুঝে না। আশা করব, তারা এই মূর্খতা থেকে বেরিয়ে আসবে। আদিবাসীদের পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতির পাশাপাশি দেশে তাদের সুরক্ষার জন্য আলাদা আইন করা দরকার। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনকে কার্যকর করার পাশাপাশি সমতলের আদিবাসীদের জন্য আলাদা ভূমি কমিশন গঠন করা প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে নৃত্য পরিবেশন করেন শিল্পীরা

জাসদের সাধারণ সম্পাদক ও সংসদ সদস্য শিরীন আখতার বলেন, আদিবাসীদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র একটা দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু আমরা যারা সংখ্যাগরিষ্চঠ মানুষ, যারা তাদের হয়ে কথা বলি, তাদের অধিকারের বিষয়ে কজন ঠিকমত কথা বলি?

মানবাধিকারকর্মী ও নিজেরা করি’র সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, যারা আজকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রয়েছেন তারা আদিবাসী কী ও কাদের বলা হয়, সেটা জানেন না। জানলে তারা আদিবাসী দিবসের আগে প্রজ্ঞাপন দিয়ে বলত না আদিবাসী শব্দটি বলা যাবে না। তাদের আসলে আদিবাসীর সংজ্ঞা শেখানো দরকার।

সিপিবির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ভোটের রাজনীতিতে জিতে সবচেয়ে বড় দল এখন আওয়ামী লীগ। তারা যখন বিরোধী দল ছিল, তখন তারা আমাদের সাথে এই শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে আদিবাসী নাগরিকদের অধিকারের বিষয়ে কথা বলেছে। আজ তারা ক্ষমতায় গিয়ে সব ভুলে গেছে। আমি মনে করি, আদিবাসীদের রাজনৈতিক সমস্যাগুলো আমরা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে পারিনি। এটা আমাদের ব্যর্থতা।

পরিবেশবিষয়ক আইনজীবী ও বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সরকার বলছে, আদিবাসীদের জন্য অনেক আইন হয়েছে, অনেক সংস্থা হয়েছে। কিন্তু সেগুলো আদৌ কার্যকর হয়েছে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। আজকে আদিবাসী দিবসে বলা হচ্ছে, নারীদের অধিকারের কথা। সেই আদিবাসী নারীর প্রতি কারা সহিংসা করে, তাদের কিন্তু আমরা চিনি। কিন্তু আমাদের সংঘবদ্ধ শক্তির চেয়ে তাদের একক শক্তি অনেক বেশি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আদিবাসী নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গেলে তাদের কোনোভাবেই দায়মুক্তি দেওয়া যাবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক মো. মেজবাহ কামাল বলেন, ১৯৯১ সালে দেশে সাঁওতাল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল আড়াই লাখ। এখন তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৫ হাজারে। এবার সরকারের কাছে আমাদের দাবি হবে, আদিবাসীদের জন্য বিশেষ সেনসাস করতে হবে যেন আদিবাসীরা কে কোন জাতিসত্তার তা সহজে চিহ্নিত করা যায়। একইসঙ্গে তাদের আর্থসামাজিক অবস্থারও কথাও ওই সেনসাসে বলতে হবে।

আদিবাসী মেয়েরা

আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাসের আহ্বায়ক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, যারা আদিবাসীদের বর্তমান সংখ্যার হিসাব দিয়েছেন, তারা আদৌ বাংলাদেশের সকল আদিবাসী গোষ্ঠী সম্পর্কে জানেন কি না, এনিয়ে আমার সন্দেহ আছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠীদের নিয়ে আলাদাভাবে জনশুমারি করা হোক।

জাতীয় সংসদে নিজেদের জন্য দুটি সংরক্ষিত আসনের দাবি জানিয়ে আদিবাসী নারী পরিষদের সভাপতি বাসন্তী মুর্মু বলেন, পাহাড় এবং সমতল থেকে একটি করে জাতীয় সংসদে মোট দুটি সংরক্ষিত আসন দাবি করছি। বাংলাদেশে আদিবাসী নারীরা প্রতিনিয়ত নানা অত্যাচার- নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। জাতীয় সংসদে আমাদের কথাগুলো বলার কেউ নেই।

অনুষ্ঠানে আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জিব দ্রং, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, জোবাইদা নাসরীন কনা, সমাজকর্মী আন্না মিনজ, নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশি কবীরসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের পক্ষ থেকে ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়। সাংবিধানিক অধিকার দাবির পাশাপাশি এতে রয়েছে- রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও ভূমির অধিকার নিশ্চিত, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, ভূমি কমিশন আইন অবিলম্বে কার্যকর, স্বাধীন পূর্বসম্মতি ছাড়া ইকোপার্ক, সামাজিক বনায়ন, টুরিজম, ইপিজেড বা অন্য কোনো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন না করা, রাষ্ট্রীয়ভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন ইত্যাদি।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা