মনসুর মুসা, ভাষাবিজ্ঞানী
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ১০:৪০ এএম
পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তির অঙ্গীকারে। ব্রিটিশ শাসনে সরকারি ভাষা ছিল ইংরেজি। যেহেতু ব্রিটিশ শাসনের মুক্তির পর স্বকীয় ভাষায় রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্নটি দেখা দেয়, কিন্তু মুক্তি পাওয়ার পর দেখা গেল তারা চলে গেলেও তাদের প্রশাসনিক ভাষা ইংরেজি পরিত্যাগ করা যাচ্ছে না। কারণ, প্রায় ২০০ বছরের শাসনের ভাষা হিসেবে শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রযুক্তি এবং অফিস-আদালতে ইংরেজি প্রচলিত ছিল। সেটি পরিত্যাগ করা এক দিনে সম্ভব নয়। অথচ রাষ্ট্রীয় চেতনা হচ্ছে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি পেয়ে স্বকীয় শাসনব্যবস্থা প্রচলন করা। কিন্তু শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভাষা কী হবে? সে প্রশ্ন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। দেখা গেল পাকিস্তান রাষ্ট্রের ৫৬% মানুষ বাংলায় কথা বলে। কিন্তু যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন তারা চেয়েছিলেন উর্দু রাষ্ট্রভাষা করতে। ফলে শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। এর পরিণতিতে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখে মর্মান্তিক ঘটনা সংঘটিত হয়। এর ফলে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চিন্তার উন্মেষ ঘটে। রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা অধিষ্ঠিত সরকারি ভাষা নিয়ে তাদের সঙ্গে বিভেদ দানা বাঁধে। যাকে আমরা ভাষা আন্দোলন বলি, সেই ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি বিস্তৃত হয়। প্রথমে ঢাকা শহর, পরে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বগুড়া, রংপুরসহ সারা পূর্ব বাংলায় ছড়িয়ে পড়ল আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ। সে আন্দোলন দমানোর জন্য সামরিক শাসন জারি করে জেনারেল আইয়ুব খান ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন।
১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। সে যুদ্ধের সময় দেখা যায় পূর্ব বাংলা অরক্ষিত। এ অবস্থায় বাঙালি নেতৃবৃন্দের মধ্যে বিশেষ করে মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকারের দাবি প্রবল হয়ে ওঠে। এক পর্যায়ে ছয় দফার ভিত্তিতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল তাতে বাঙালির প্রতিনিধিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধিকার পদদলিত করেন ইয়াহিয়া খান। বাংলাদেশের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন তিনি। এর ফলে নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। এবং তাতে বাংলার সাধারণ মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা হারায়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে। মোটা দাগে এটাই হলো বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের কাহিনী। এ মুক্তিযুদ্ধে অগণিত মানুষÑ বিশেষ করে নারী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, চিকিৎসক প্রাণ হারান।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে সংবিধান প্রণীত হয় তার তৃতীয় ধারায় স্পষ্ট করে লেখা হয়, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা।’ এর আগ পর্যন্ত বাংলা ভাষার কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছিল না। ১৯৭২ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষা তার স্বকীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়। এটা ছিল মর্যাদার স্বীকৃতি। ফলে বাংলা ভাষা সর্বস্তরে চালু হতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেয়েছে। ভাষা হচ্ছে পরিচর্যার কাজ। অনুশীলনের কাজ। ভাষা মুখে বলা এক আর সেটা বইপুস্তক, দলিল-দস্তাবেজে ব্যবহার ভিন্ন ব্যাপার। এজন্য দক্ষতা অত্যন্ত প্রয়োজন। তার জন্য অর্থায়ন প্রয়োজন। গবেষণা প্রয়োজন। উপযুক্ত লোকবল প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন। এক কথায় বলতে গেলে ১৯৭২ সালের সংবিধানে ভাষার অবস্থান, পরিকল্পনা সঠিকভাবে নির্ধারণ করেছিল কিন্তু অবয়বগত পরিকল্পনার কোনো উপযুক্ত কার্যক্রম ছিল না। যার ফলে বাংলা ভাষার ব্যবহার যতটা হওয়া প্রত্যাশিত ছিল ততটা হয়নি। তদুপরি রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা দায়িত্ব পেয়েছিলেন তাদেরও বাংলা ভাষার জটিল এবং কঠিন কাজকর্ম করার দক্ষতা ছিল না। ফলে অনেক সময় আমরা মনে করি বাংলা ভাষার ব্যবহার কখনও বৃদ্ধি পেয়েছে আবার কখনও স্তিমিত হয়ে গেছে।
বাংলা ভাষার সঙ্গে প্রযুক্তিগত একটি সমস্যা রয়েছে। টাইপরাইটার বলুন, ইন্টারনেট বলুন, ডিজিটালাইজেশন বলুন, সব জায়গাতেই ইংরেজির একটি প্রযুক্তিগত আধিপত্য আছে। সেজন্য ইংরেজি শেখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ইংরেজি ভাষা। এমন এক সময় ছিল যখন ইংরেজিকে মনে করা হতো সমাজের জন্য বোঝা। এখন তা সম্পদে পরিণত হয়েছে। ফলে ইংরেজির ব্যবহার অস্বীকার করার উপায় নেই। যারা ইংরেজি বাদ দিতে চেয়েছেন তাদের পরবর্তী প্রজন্ম ইংরেজির উপযোগিতা স্বীকার করে নিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে ইংরেজি শেখানোর বেলায়। ইংরেজির উপযুক্ত শিক্ষক, উপযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা অন্যান্য সুযোগসুবিধা অপ্রতুল। ফলে ইংরেজি একটি মহার্ঘ বস্তুতে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে ধর্মীয় কারণে এবং মধ্যপ্রাচ্যের আর্থিক অগ্রগতিতে আকৃষ্ট হয়ে মানুষ আরবির দিকেও ঝুঁকে পড়ছে। এখানে সমস্যা হচ্ছে আরবি ধর্মের ভাষা হিসেবে এক রকম আর যোগাযোগের ভাষা হিসেবে অন্য রকম। ফলে আমাদের আরবি শেখাও ইহলৌকিক কাজে সন্তোষজনক নয়। সুতরাং বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরবর্তীতে আমরা নতুন যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছি, তাতে ইংরিজসহ অন্যান্য ভাষা শেখার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এখন সময় এসেছে আমাদের নতুন বাংলাদেশের প্রয়োজনে বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষা শেখার অনুপুঙ্খ সমস্যার বিশ্লেষণ করে ভাষানীতি প্রণয়ন করে সেগুলোর প্রয়োগ করা।
তাহলে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব হবে। বলা বাহুল্য, আামদের একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের শ্রদ্ধা-ভক্তি-ভালোবাসা প্রকাশ করি। কিন্তু শুধু ভক্তি-প্রেম-ভালোবাসায় ভাষা উন্নত হয় না। ভাষা পরিচর্যা করতে হয়। নতুন বাংলাদেশের যারা নতুন প্রজন্ম তারা এ বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে দেখবেন।