অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ৬ মাস
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:০৭ এএম
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ফাইল ফটো
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ ৬ মাস পূর্ণ হয়েছে। ক্ষমতাগ্রহণের পর প্রধান উপদেষ্টা অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করে প্রশাসনকে জনমুখী করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে সংস্কারের লক্ষ্যে গঠন করা হয় ছয়টি সংস্কার কমিশন। তারই একটি হচ্ছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। ইতোমধ্যে কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। বাকি কমিশনগুলো হচ্ছেÑ দুদক সংস্কার, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার, পুলিশ সংস্কার, সংবিধান সংস্কার ও বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন এরই মধ্যে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভিন্নমতের রাজনৈতিক ছাপ লাগিয়ে সাত শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত (পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন) কর্মকর্তাকে ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ এই কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এ ছাড়া প্রশাসনসহ অন্যান্য দপ্তর ও অধিপ্তরের বঞ্চিত কর্মকর্তাদের ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি দেওয়ার পাশাপাশি পদায়নও করা হয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই মেধার অগ্রভাবে থাকলেও রাজনৈতিক ছাপ লাগিয়ে তাদের বছরের পর বছর বঞ্চিত করা হয়। বিগত সময়ে অকালে অবসরে পাঠানো এ রকম কয়েকজন মেধাবী আমলাকে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, মুখ্য সচিব. সিনিয়র সচিব ও সংস্থার প্রধান হিসেবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনে ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্তদের নিয়ে দক্ষ, দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, গত ছয় মাসে প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরে আসেনি। পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে পক্ষপাতিত্বের নানা অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভ ও অস্থিরতাও রয়েছে। দাপ্তরিক কাজকর্মে ঢিলেঢালা মনোভাবও কাটেনি। ফলে সরকারের নির্দেশনার বাস্তবায়ন অনেকাংশে উপেক্ষিত হচ্ছে। যে কারণে প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব বা সচিব পর্যায়ে বদলি ও পদায়নের আদেশ জারির পরও তা টিকছে না। কিছু দিন পর কোনো কারণ ছাড়াই একের পর এক তা বাতিল হচ্ছে। পাশাপাশি পতিত সরকারের অনুগত কর্মকর্তারা এখনও কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপদে বহাল রয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অনেকের গুরত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে বদলির আদেশ হওয়ার কয়েক মাস পর কোনো কারণ ছাড়াই গুরুত্বহীন জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে। তারা সংক্ষুব্ধ হয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক ও জনপ্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেছেন। বদলির কারণও তারা জানতে পারছেন না।
অভিযোগ উঠেছে যেÑ একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের সমর্থক কর্মকর্তাদের একের পর এক গুরত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে পদায়ন করা হচ্ছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলা হয়েছে। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘হাসিনার দোসরদের উৎপাটন করে জনগণের পক্ষে যারা দাঁড়িয়েছিল, তাদের দিয়েই প্রশাসন চলার কথা ছিল। কিন্তু সেই দোসররাই পুনরায় সচিবালয়ে ভেতরে মিছিল করে, দাবি-দাওয়া পেশ করে। শুধু তাই নয়, প্রশাসনে দুর্নীতিও বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কবে হবে তা এখনও চূড়ান্ত নয়, অথচ এরই মধ্যে প্রশাসনে ঘুরেফিরে অস্থিরতা দেখা দিচ্ছে। একেক পক্ষ তাদের অনুসারী কর্মকর্তাদের পদায়নে অভ্যন্তরীণ লড়াই চালাচ্ছে। বিগত সরকারের সুবিধাভোগী আমলারাও ভিড়েছেন এই লড়াইয়ে। তারা বিভিন্ন স্তরে ঘাপটি মেরে শুধু বসেই নেই, কলকাঠিও নাড়ছেন। বিএনপিপন্থি বঞ্চিত কর্মকর্তারা পদোন্নতি পেলেও পদায়ন না পাওয়ায় তাদের মধ্যে হাতাশা বিরাজ করছে। তাদের মধ্যে দাপ্তরিক কার্যক্রমে শৈথিল্য দেখা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দীর্ঘ বঞ্চনার পর তারা পদোন্নতি পেয়ে অনেকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পদায়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু কিছু দিন না যেতেই তাদের গুরুত্বহীন বিভাগে বদলি করা হয়। এমনকি বদলি হওয়া ওই কর্মকর্তার মন্ত্রণালয়ের সচিব তার বদলি স্থগিত করার অনুরোধ করেও রক্ষা করতে পারেননি। এরই মধ্যে শূন্য জায়গায় অন্যদের পদায়ন করা হয়েছে। এই অবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার নানান উদ্যোগ নিলেও প্রশাসনে গতি ফিরে আসছে না। বিগত সরকারের দোসররা এখন বর্তমান সরকারের তাবেদারি শুরু করেছে। অতি উৎসাহী কিছু সরকারি কর্মকর্তা রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মতো আচরণ করছেন। এতে গত ১৫ বছর ধরে যারা বঞ্চিত ছিলেন তাদের ক্ষোভ আর হতাশা আগের মতোই রয়ে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গত ১৫ বছরে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো জনপ্রশাসনের জন্য সময়টি ছিল একটি কালো অধ্যায়। মূলত স্বজনপ্রীতি ও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন এবং সীমাহীন দুর্নীতির ফলে প্রশাসনের কাঠামো ভেঙে পড়েছে। এই বেহাল অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জনপ্রশাসনে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রয়োজন। সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতি দেওয়াই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মূলমন্ত্র হওয়া প্রয়োজন।
ওই কর্মকর্তার মতে, ৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনার সরকারের রেখে যাওয়া আমলাদের এখনও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে থাকাটা দুর্ভাগ্যজনক। দুয়েকটি ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগে তারা দায়িত্ব পালন করছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও অধিদপ্তরে মধ্য সারির কর্মকর্তাদের বদলির আদেশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হাসিনা সরকারের দোসর অদক্ষ ও দুর্নীতিবাজ এবং দলবাজ কর্মকর্তাদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পতিত সরকারের আমলে নির্যাতিত সৎ, দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের অন্যায়ভাবে বদলি করা হচ্ছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বর্তমান বিশৃঙ্খলাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে এখনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। যারা ঘটনা ঘটিয়ে বিভিন্ন জেলায় ডিসি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করা হয়নি।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘প্রশাসনে এখনও স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে কিছু ক্ষেত্রে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে সরকার। এতে অস্থিরতা সৃষ্টি হচ্ছে। এসবের লাগাম টেনে ধরতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে প্রশাসনের ওপর মানুষের আস্থা কমে যাবে। গণমানুষের কাছে প্রশাসন সম্পর্কে ভুল বার্তা যাবে। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে অবসরের বয়স কমপক্ষে এক বছর বাড়ানো উচিত ছিল।’