অন্তর্বর্তী সরকারের ৬ মাস
আকরাম হোসেন
প্রকাশ : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৯:৩০ এএম
গ্রাফিক্স : প্রবা
জাতির ইতিহাসে চরম ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ একসময়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কঠিন দায়িত্ব নিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ৬ মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ শনিবার। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। ওইদিন প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। এর তিন দিন পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। রাষ্ট্র সংস্কারের সংকল্পে যাত্রা শুরু হয় নতুন দিনের নতুন সরকারের।
জুলাই আন্দোলনের জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের ৬ মাসের যে পথপরিক্রমা তার কোনো একটি মুহূর্তও স্বস্তির ছিল না। চলার পথে বাঁকে বাঁকে অতিক্রম করতে হয়েছে পতিত সরকারের পেতে রাখা নানা ফাঁদ। গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘ ১৫ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনের অবসান ঘটলেও নতুন দিনের সরকারকে তাদের দোসরদের নানা ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করেই এগোতে হচ্ছে। বলতে গেলে, অন্তর্বর্তী সরকারের ছয়টি মাস কেটেছে নানা আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নানামুখী চ্যালেঞ্জে পড়ে সরকার। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা ও নিহতদের পরিবারের পুনর্বাসন কর্মকাণ্ডে গতিহীনতা, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র, প্রশাসনে অস্থিরতা, দাবিদাওয়া নিয়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের লাগাতার আন্দোলন, শিক্ষাঙ্গনে একের পর এক অস্থিরতা, নির্বাচনের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্রমাগত চাপ ও সর্বোপরি আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি সামাল দিয়ে চলতে হচ্ছে সরকারকে। এতে একদিক যেমন অনেক কাজের জন্য সরকার সমাদৃত হচ্ছে, তেমনি সমালোচনাও পিছু ছাড়েনি তাদের।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এই সরকার কিছু কাজ ভালো করেছে। তার একটি হচ্ছে, সংস্কার কর্মসূচিতে হাত দেওয়া। এটা একটা ভালো পদক্ষেপ। পররাষ্ট্রনীতিতেও সরকার মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে কথা বলছে, যা আগের ১৫-১৬ বছর আমরা দেখিনি। সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা বা ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাড়াবাড়ির প্রতিবাদে বিজিবির সঙ্গে সাধারণ মানুষও ঐক্যবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। লাঠি হাতে মাঠে নেমে যাচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ। জাতীয়তাবাদের চেতনা সুসংহত হয়েছে।
সরকারের নানা কাজের সমালোচনাও করেন এই বিএনপি নেতা। তিনি বলেন, ছয় মাস হয়ে গেলেও সরকার এখনও বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও স্বাভাবিক হয়নি। প্রশাসনে এখনও আগের সরকারের দোসররা রয়ে গেছে। তারা কুকর্ম করার জন্য হঠাৎ হঠাৎ কর্মসূচি দিচ্ছে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ যখন-তখন রাস্তায় নেমে আসছে। অল্প কয়েকজন মানুষ বহু মানুষের জীবনযাত্রার বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। কিন্তু স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতা যে এক নয়Ñ এটা তাদের বোঝানো হচ্ছে না। এসব আন্দোলন মীমাংসা করতে আবার বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতাদের পাঠানো হচ্ছে। এতে সরকারের মধ্যে আরেকটা সরকার তৈরি হচ্ছে।
গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা, দৈনন্দিন জীবনের সংকট উত্তরণে প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ হয়নি। জনগণের অনেক প্রত্যাশা ছিল। ন্যায়বিচারের প্রশ্নে অগ্রগতি কম। দাবিদাওয়া নিয়ে অনেকগুলো আন্দোলন হয়েছে। এগুলোর যৌক্তিকতা বিবেচনা করে পূরণ করেনি সরকার। শহীদ পরিবারের পুনর্বাসন প্রক্রিয়াও দুঃখজনক। তবে রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে সরকার সঠিক পথেই রয়েছে। নির্বাচন ও সংস্কারের প্রশ্নেও ঠিক পথে আছে।
রাষ্ট্র সংস্কারের যত উদ্যোগ
ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ছয়টি কমিশন গঠনের কথা জানান প্রধান উপদেষ্টা। কমিশনগুলো হলোÑ নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার, পুলিশ প্রশাসন সংস্কার, বিচার বিভাগ সংস্কার, দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ও সংবিধান সংস্কার কমিশন। এসব কমিশনের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা চূড়ান্ত করার ঘোষণা দেন তিনি। পরে আরও ৫টি কমিশন গঠন করা হয়। এর মধ্যে প্রথম ছয়টি কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আজ ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। গত ৫ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেন, সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও সুপারিশমালা রাজনৈতিক দল এবং গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তির কাছে পাঠানো হবে। এর পর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রথম বৈঠক হবে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সব রাজনৈতিক দল ও জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে যত দ্রুত সম্ভব সংস্কারের ক্ষেত্রে করণীয় কী হবে, সেটি ঠিক করা হবে। রাজনৈতিক দলগুলো রাজি থাকলে রোজার মধ্যেও সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ও সুপারিশগুলো নিয়ে আলোচনা চলবে।
প্রসঙ্গত, গত ১৫ জানুয়ারি চারটি সংস্কার কমিশন সুপারিশ জমা দেয়। এগুলো হলোÑ সংবিধান সংস্কার, নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার, দুদক সংস্কার ও পুলিশ সংস্কার কমিশন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জনপ্রশাসন সংস্কার এবং বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন।
সংবিধান সংস্কার : এ বিষয়ক সংস্কার কমিশন রাষ্ট্রীয় মূলনীতি, দেশের সাংবিধানিক নাম এবং সংসদীয় কাঠামোয় পরিবর্তনের সুপারিশ করেছে। এ ছাড়া দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার সুপারিশ করে বলা হয়েছে, এর মধ্যে একটি হবে নিম্নকক্ষ জাতীয় সংসদ (ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি) ও আরেকটি উচ্চকক্ষ (সিনেট)। উভয় কক্ষের মেয়াদ হবে চার বছর। সুপারিশে আরও বলা হয়েছেÑ এক ব্যক্তি দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং সংসদ নেতা হতে পারবেন না। পাশাপাশি সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ বছর করার সুপারিশও করা হয়েছে। সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়। নতুন মূলনীতি হিসেবে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক সুবিচার, বহুত্ববাদ এবং গণতন্ত্র’র কথা সুপারিশ করা হয়েছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার : রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিক কোনো সংগঠন না রাখার সুপারিশ করেছে নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন। বলা হয়েছেÑ রাজনৈতিক দলের ছাত্র, শিক্ষক ও শ্রমিক সংগঠন, ভ্রাতৃপ্রতিম বা যেকোনো নামেই হোক না কেন, সেসব না থাকার বিধান করা যেতে পারে। এ ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো আসনে ৪০ শতাংশ ভোট না পড়লে সেই আসনে পুনর্নির্বাচনের সুপারিশ করা হয়েছে।
জনপ্রশাসন : মন্ত্রণালয় সংখ্যা ৪৩ থেকে নামিয়ে ২৫টিকে আনার সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া রাজধানী মহানগর সরকারের নতুন দুই বিভাগ গঠন, পুরোনো চার বিভাগভুক্ত এলাকা নিয়ে চারটি প্রদেশ গঠন, উপজেলা পর্যায়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট পুনঃস্থাপনের সুপারিশ করেছে এই কমিশন।
বিচার বিভাগ : প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতা থেকে প্রধান বিচারপতি এবং অন্যান্য বিচারক নিয়োগের বিষয়কে পৃথক করার সুপারিশ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিতে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস, স্বতন্ত্র তদন্ত সংস্থা, বিভাগীয় শহরে হাইকোর্ট ডিভিশনের স্থায়ী বেঞ্চ, জেলা আদালতকে উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারণ করার সুপারিশ করেছে বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন।
দুদক সংস্কার : সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ লেনদেনকে অবৈধ ঘোষণা এবং কালো টাকা সাদা করার বৈধতা স্থায়ীভাবে বন্ধ করাসহ ৪৭ দফা সুপারিশ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার কমিশন।
পুলিশ সংস্কার : বেআইনি সমাবেশ ও শোভাযাত্রা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের শক্তি প্রয়োগের সীমা নির্ধারণ, পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার ও আসামিকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষেত্রে কিছু নির্দেশনা চেয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে পুলিশ সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া বাহিনী সংস্কারের জন্য ২২টি আইনের সংশোধন ও পরিমার্জন চেয়েছে এই কমিশন। প্রতিবেদনে একটি নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত পুলিশ কমিশন গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
আন্দোলনে অরাজক অবস্থা
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে একের পর এক আন্দোলনে অরাজক অবস্থা দেখা দেয় রাজপথে। সচিব থেকে শুরু করে রিকশাচালক পর্যন্ত সবাই কোনো না কোনো দাবি নিয়ে আন্দোলন করেছেন। এসব যৌক্তিক-অযৌক্তিক আন্দোলনের কারণে জনগণকে দিনের পর দিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সরকারের স্বাভাবিক কাজকর্মও বিঘ্নিত হচ্ছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, রাজধানীতে ৫ আগস্ট থেকে ২৯ জানুয়ারি বুধবার পর্যন্ত ১৭৭ দিনে ১৩৬টি আন্দোলন হয়েছে। আন্দোলন হয়েছে ঢাকার বাইরেও। গত ১৯ জানুয়ারি উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এক ফেসবুক পোস্টে জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৫০টির বেশি আন্দোলন মোকাবিলা করেছে।
গত বছর ২০ আগস্ট সচিবালয়ে ঢুকে পড়ে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। গণঅভ্যুত্থানের সময় স্থগিত এইচএসসি পরীক্ষাগুলো না দিয়ে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ে ফল প্রকাশের দাবিতে এ আন্দোলন হয়। এর বিপরীতে পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতেও আন্দোলন হয়। পরে সাবজেক্ট ম্যাপিংয়েই ফল প্রকাশ হয়। তাতে যারা পাস করেননি তারাও নামেন আন্দোলনে, ঘেরাও করেন শিক্ষা বোর্ড। চাকরি জাতীয়করণের দাবিতে সচিবালয় ঘেরাও করেন আনসার সদস্যরা। পুলিশের কর্মবিরতি, রেলওয়ের শ্রমিক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বনাম সাত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিতে তিতুমীরের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থানে আহতদের সুচিকিৎসার দাবিতে আন্দোলন হয়েছে। আন্দোলনের এমন ঢল আগে কখনও দেখা যায়নি। এ বিষয়টি নিয়ে সরকারকে প্রায়ই সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি
ক্ষমতা গ্রহণের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে অন্তর্বর্তী সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই পুলিশের অনুপস্থিতিতে ও পরিবর্তিত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরাধপ্রবণতা ব্যাপকহারে বেড়ে যায়। ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঢাকাসহ সারা দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পর ১১ আগস্ট থানায় ফেরা শুরু করেন পুলিশ সদস্যরা। তবে পুলিশের তৎপরতা ছিল তুলনামূলকভাবে কম। আইনশৃঙ্খলার উন্নতির জন্য সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে মাঠে নামানো হয় গত সেপ্টেম্বরে। সেনা সদস্যদের নামিয়েও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বন্ধ হয়নি অনিয়ম-দুর্নীতি-চাঁদাবাজি। গত ৩ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে এসে পেয়েছে, এখন সেখান থেকে উন্নতি হয়েছে। পরিস্থিতি আরও ভালো করার জন্য সরকার চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।
নির্বাচন দেওয়ার চাপ
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দ্রুত নির্বাচনের দাবি করে আসছে রাজনৈতিক দলগুলো। দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি শুরু থেকেই নির্বাচনের একটি রোডম্যাপ ঘোষণার জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে। নির্বাচন নিয়ে একটি সম্ভাব্য সময় জানান প্রধান উপদেষ্টা।
১৬ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, ভোট কবে হবে তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে কতটা সংস্কার করে নির্বাচনে যাওয়া হবে, তার ওপর। মোটা দাগে এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে হতে পারে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন। তিনি আরও বলেন, যদি অল্প কিছু সংস্কার করে ভোটার তালিকা নির্ভুলভাবে তৈরি করার ভিত্তিতে নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয় তাহলে ২০২৫ সালের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়তো সম্ভব হবে। আর যদি এর সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে এবং জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রত্যাশিত মাত্রার সংস্কার যোগ করি তাহলে অন্তত আরও ছয় মাস অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।
প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক মাস পর ৫ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করে কাজী হাবিবুল আউয়ালের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন। ২১ নভেম্বর অবসরপ্রাপ্ত সচিব এ এম এম নাসির উদ্দীনের নেতৃত্বে গঠিত হয় পাঁচ সদস্যের নতুন নির্বাচন কমিশন, যারা আগামী জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক দল নিয়ে সিদ্ধান্ত
পতনের ৪ দিন আগে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করে আওয়ামী লীগ। ২৮ আগস্ট জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরকে নিষিদ্ধ করে জারি করা প্রজ্ঞাপন বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার। অন্যদিকে গত ২৩ অক্টোবর বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ও সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। ইতোমধ্যে ৫টি নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন পেয়েছে। এগুলো হলোÑ আমার বাংলাদেশ পার্টি, প্রতীক ঈগল; গণঅধিকার পরিষদ, প্রতীক ট্রাক; নাগরিক ঐক্য, প্রতীক কেটলি; গণসংহতি আন্দোলন, প্রতীক মাথাল; বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি, প্রতীক ফুলকপি।
রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৫২ হাজার মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করে দলটি। এসব মামলায় ৬২ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছিল। বিএনপি ছাড়াও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এসব রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে হওয়া হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে দুটি কমিটি গঠন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। এর মধ্যে একটি জেলা পর্যায়ের কমিটি, অন্যটি মন্ত্রণালয় পর্যায়ের কমিটি। শেখ হাসিনার পতনের পরে মামলা থেকে মুক্তি পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরের হিসাব অনুয়ায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিএনপির ৫ হাজার ৭৫৬ জন নেতাকর্মী মুক্তি পেয়েছেন। ১৭ বছর কারাবাসের পর থেকে মুক্তি পেয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। মুক্তি পেয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। গুরুত্বপূর্ণ মামলা থেকে জামিন পেয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। ২০ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তির জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে আবেদন করা হয়েছে। জেলা পর্যায় থেকে আরও কয়েক হাজার মামলা নিষ্পত্তির জন্য আবেদন করা হবে।