সিপিডির গবেষণা
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০২৫ ১৫:৪৪ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
৮০ শতাংশ শ্রমিকই মাসের শুরুতে মজুরি পান না। এ ছাড়া, কম বেতন ও সময়মতো পদোন্নতি না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব কারণেই শ্রমিকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিচ্ছে বলে দাবি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি)। তা ছাড়া দেশের ৮৫ শতাংশ বা প্রায় ছয় কোটি শ্রমিকের কোনো আইনি সুরক্ষা ও মজুরির মানদণ্ড নেই। তাই শ্রম খাতের জন্য একটি অভিন্ন মজুরি কাঠামো প্রণয়নের সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। গতকাল রবিবার ‘শ্রমিকের জীবনমান, কর্মপরিবেশ ও অধিকার সংক্রান্ত সংস্কার উদ্যোগ : অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য প্রস্তাবনা’ বিষয়ক আলোচনা সভায় এ সুপারিশ করা হয়।
ঢাকার ধানমন্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী তামিম আহমেদ। সভায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট শ্রম সংস্কার কমিশনের জন্য বেশ কিছু প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। সভায় উপস্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ অন্য প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশে অভিন্ন একটি শ্রম আইন প্রণয়ন।
বর্তমান শ্রম আইনে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) অন্তর্ভুক্ত নয়। ইপিজেড আইন নামে সেখানে ভিন্ন আইন রয়েছে। যেখানে শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার সুযোগ নেই। এ ছাড়া শ্রম আইনে ট্রেড ইউনিয়ন চর্চা অবারিত করতে শ্রমিক সংগঠনের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে শ্রমিকদের স্বাক্ষর থাকার শর্ত প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়।
ট্রেড ইউনিয়ন হিসেবে নিবন্ধনের জন্য বর্তমানে কারখানার শ্রমিক সংখ্যার বিবেচনায় ২০ শতাংশ শ্রমিকের স্বাক্ষর থাকার শর্ত রয়েছে। আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি যে ৮৫ ভাগ শ্রমিক রয়েছে ইনফরমাল। ৮৫ ভাগ মানে হচ্ছে প্রায় ৬ কোটি শ্রমিক। তাদের কোনোই সুরক্ষা নেই। তাদের আইনের সুরক্ষা, মজুরির মানদণ্ড ও সামাজিক স্বীকৃতিও নেই। আমরা আইন নিয়ে যত আলোচনা করছি, তার মধ্যে রয়েছে মাত্র ৫ ভাগ। গৃহশ্রমিক থেকে শুরু করে সচিবালয় শ্রমিকদের বিবেচনা করেন, তাহলে দেখবেন বৈষম্য কতটা বেড়েছে। নির্মাণকাজে সরাসরি শ্রমিক দেখবেন না। যত শ্রমিক সব নিয়োগ দেয় ঠিকাদার, যাদের সরাসরি দেখতে পাবেন না। তাহলে তাদের অধিকার নিয়ে কীভাবে কাজ করবেন? আমাদের সংস্কার করতে হবে, সে কারণে সবাইকে নিয়ে সুপারিশ তৈরি করতে চাই।’

শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য শ্রমিক নেতা তাসলিমা আক্তার লিমা বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে শ্রমশক্তির গুরুত্ব ও শ্রমশক্তির মর্যাদা সেটাকে সামনে রেখে কাজ করতে হবে। শ্রমিকদের কাজকে সাধারণত ছোট কাজ মনে করেন। আমরা সমাজের মধ্যে আমাদের ঘরে-বাইরে প্রতিটা ক্ষেত্রে আমরা দেখি শ্রমিকদের ‘তুই’ সম্বোধন করি। যেটা অপমানকর। আইন-আদালতের ভাষা বাংলা না হওয়ায় শ্রমিকদের তা বোধগম্য হয় না বলেও জানান তিনি।’
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারে হাত দিয়েছে। শ্রম সংস্কারে গঠিত কমিশনে সৈয়দ সুলতানের নেতৃত্বে রয়েছে ১০ জন। এই কমিশনের আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুপারিশ দেওয়ার কথা রয়েছে। সুপারিশ দেওয়ার পরও শ্রম সংস্কার কমিশনকে সক্রিয় থাকার অনুরোধ জানিয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘যাতে তারা সুপারিশ বাস্তবায়নে নজরদারি রাখতে পারে। বাস্তবায়ন পর্যায়েও কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকে, সে বিষয়ে আশা করি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পদক্ষেপ নেবে। কারণ কমিশনের সুপারিশগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকগুলো গ্রুপের চাপ রয়েছে। যারা কমিশনের রিপোর্ট এড়িয়ে যেতে চাইবে কিংবা কম গুরুত্ব দেবে। অন্তর্বর্তী রিফর্ম সেল গঠনে আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার যদি আগামী এক বছর শ্রম কল্যাণ বছর হিসেবে ঘোষণা করে এবং সেই আলোকে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম সেভাবে বিন্যস্ত করে, তাহলে অন্তর্বর্তীকালীন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন সহজতর হবে। সেই আলোকে আমাদের সাজেশন থাকবে শ্রমিক সংক্রান্ত যতগুলো মন্ত্রণালয় ও বিভাগ রয়েছে, সেখানে অন্তর্বর্তী রিফর্ম সেল গঠন করা যায় কি না সেই রিফর্ম সেল কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মনিটরিং কাজগুলো করবে। রিফর্ম সেল গঠন করলে আমরা মনে করি কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে ইতিবাচক কাজ করবে। একই সঙ্গে আমরা মনে করি না যে, আমাদের উদ্যোক্তারা সব সুপারিশ বাস্তবায়নে এখনই প্রস্তুত রয়েছে। ফরমাল সেক্টরগুলোতে যারা রয়েছেন, তারা হয়তো প্রস্তুত থাকতে পারে কিন্তু ইনফরমাল সেক্টরে যারা আছেন তারা প্রস্তুত নয়।’