রেদওয়ানুল হক
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২৪ ০৯:৪৩ এএম
গ্রাফিক্স : প্রবা
সবার জন্য পেনশনÑ এই নীতির আলোকেই প্রবর্তিত হয়েছে সর্বজনীন পেনশন স্কিম। শুরুতে সবার প্রশংসা কুড়ালেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকৃত অর্থে সরকারের এই উদ্যোগ এখনও সর্বজনীন হয়ে উঠতে পারেনি। কাঙ্ক্ষিত সাড়া মিলছে না এই স্কিমে। শুরুতে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও বর্তমান চিত্র ভিন্ন। বাড়ছে আস্থার সংকট, দিন দিন কমছে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা। এই স্কিমের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় রয়েছেন নিবন্ধনকারী অনেক গ্রাহক। এ অবস্থায় দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সর্বজনীন পেনশন স্কিমকে আকর্ষণীয় করে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এর অংশ হিসেবে সম্প্রতি জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ (এনপিএ) পরিচালনা পর্ষদের প্রথম সভায় গ্রাহকের মধ্যে আস্থা বাড়াতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আকর্ষণীয় প্যাকেজ ও ফিচার যুক্ত করে স্কিমটিকে জনপ্রিয় করে তুলতে কাজ করে যাচ্ছেন নীতিনির্ধারকরা। এরই মধ্যে বার্ষিক মুনাফা দেওয়াসহ বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। প্রচারে জোর দেওয়ার পাশাপাশি আকর্ষণীয় ফিচার যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এর মধ্য দিয়ে এই স্কিমের প্রতি জনগণের আস্থা ও মনোযোগ বাড়ানো সম্ভব হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের যে কয়টি উদ্যোগ সর্বমহলে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল, তার মধ্যে ‘সর্বজনীন পেনশন স্কিম’ অন্যতম। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেছে, যথাযথ প্রচার ও আকর্ষণীয় প্যাকেজ দিতে ব্যর্থতার কারণে এতে আশানুরূপ সাড়া মিলছে না। কিছু কিছু সমস্যার সমাধান না করে বরং উল্টো বাধ্যবাধকতা আরোপের পথ বেছে নেয় বিগত সরকার। যার অংশ হিসেবে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বাধ্যতামূলক পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’ চালু করা হয়। ব্যাপক সমালোচনা এবং আন্দোলনের পরও স্কিমটি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছিল ক্ষমতাচ্যুত বিগত সরকার। এটা হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। যদিও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল সময়ে সরকারি কর্মকর্তাদের খুশি করতে শেষ পর্যন্ত স্কিমটি বাতিল ঘোষণা করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ‘বাধ্য’ করার নীতি থেকে সরে এসে পেনশন স্কিমটিকে যথার্থই সর্বজনীন করে তুলতে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে গিয়ে অনেকটা তাড়াহুড়া করেই ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতাÑ এ চারটি স্কিম নিয়ে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু করে তৎকালীন সরকার। এটি চালুর পর শুরুর দিকে ব্যাপক সাড়া মিললেও বর্তমানে গ্রাহকদের সেই আগ্রহে যথেষ্ট ভাটা পড়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কর্মসূচিটি চালু থাকবে এবং সাময়িক যে স্থবিরতা তা কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে। নতুনভাবে এই ব্যবস্থায় আরও কিছু বিশেষ সুবিধা যুক্ত করা হবে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়াতে বর্তমানে নতুন করে প্রচারণার পরিকল্পনা করা হয়েছে। দেশব্যাপী জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে পোস্টার বিতরণসহ সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যে পেনশন স্কিমে বার্ষিক মুনাফা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি বছর অক্টোবরের মধ্যে গ্রাহককে জমানো অর্থের ওপর কমপক্ষে ৮ শতাংশ মুনাফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের (এনপিএ) সদস্য গোলাম মোস্তফা জানান, প্রচারণার অভাবে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমেছে। তাই প্রচারণা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বার্ষিক মুনাফা গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। স্কিমকে গতিশীল করতে নতুন ফিচার যুক্ত হলে গতি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ৪ নভেম্বর পর্যন্ত প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা স্কিমে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৪৮৭ জন গ্রাহক তালিকাভুক্ত হয়েছে। জমা হয়েছে প্রায় ১৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনপ্রিয়তায় শীর্ষে রয়েছে সমতা স্কিম। মোট গ্রাহকের ৭৮ শতাংশেই এই স্কিমে নিবন্ধিত। মাসিক কিস্তি ১ হাজার টাকা, যার মধ্যে ৫০০ টাকা গ্রাহক ও ৫০০ টাকা সরকার দেয়। এই স্কিমে মোট নিবন্ধিত গ্রাহকের সংখ্যা ২ লাখ ৮৫ হাজার ৮৮৪ এবং জমা হয়েছে ৪১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য রয়েছে প্রগতি স্কিম। এতে ২২ হাজার ৪১০ জন গ্রাহক যুক্ত হয়েছে এবং ৪৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে। প্রবাস স্কিম বিদেশে কর্মরতদের জন্য। নিবন্ধন করা ও চাঁদা দেওয়ার দিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে প্রবাসীরা। এই স্কিমে ৯১০ জন নিবন্ধিত হয়েছে এবং চাঁদা জমা পড়েছে ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
সুরক্ষা স্কিম স্বকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য, যেখানে ৬৩ হাজার ১৭৪ জনের চাঁদা হিসাবে জমা হয়েছে ৩৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। স্বকর্মে নিয়োজিত ব্যক্তি, যেমন কৃষক, রিকশাচালক, শ্রমিক, কামার, কুমার, জেলে, তাঁতি ইত্যাদি পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন যারা। তবে এর বাইরে ‘প্রত্যয়’ ও ‘সেবক’ নামে দুটি কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, যা শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ‘সুখে ভরবে আগামী দিন, পেনশন এখন সর্বজনীন’Ñ এই স্লোগান নিয়ে প্রৌঢ়ত্বে ও বার্ধক্যে সর্বস্তরের মানুষকে আর্থিকভাবে স্বস্তির সুযোগ করে দিতে সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচি চালু করেছিল বিগত সরকার।
যেভাবে বিতর্কিত হয়ে ওঠে পেনশন স্কিম
গত ১৩ মার্চ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত, স্বশাসিত ও বিধিবদ্ধ সংস্থায় নতুন যোগ দেওয়া চাকরিজীবীদের জন্য প্রত্যয় স্কিম চালু করে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। বলা হয়, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে যারা এসব সংস্থায় নতুন যোগ দেবেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রত্যয় প্রযোজ্য হবে। এরপরই এই স্কিম থেকে নিজেদের বাদ দিতে ধারাবাহিক আন্দোলন করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। গত ১ জুলাই থেকে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস, পরীক্ষা বর্জনসহ সব ধরনের কর্মবিরতি পালন করছিলেন তারা। এভাবেই বাধ্যতামূলক করার মধ্য দিয়ে বিতর্কিত হয়ে পড়ে উদ্যোগটি। কার্যত বিগত সরকারের ভ্রান্ত নীতির কারণেই নন্দিত একটি প্রকল্প ব্যাপক প্রশ্নের সম্মুখীন হয়।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পেনশন ব্যবস্থাটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে বাধ্য করার নীতি পুরো ব্যবস্থাটিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছিল। প্রথম থেকেই এতে মানুষের আগ্রহ কম দেখা যাচ্ছিল। এর প্রধান কারণ হলো, স্কিমগুলো তেমন আকর্ষণীয় নয়। তা ছাড়া কর্মসূচিটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানারও ঘাটতি আছে। আরও রয়েছে আস্থার সংকট। তাই সময় নিয়ে মানুষকে বোঝানো এবং স্কিমগুলোকে কীভাবে আরও আকর্ষণীয় করা যায়, এখন সেদিকে নজর দেওয়া দরকার।
আকর্ষণীয় করতে যেসব উদ্যোগ
নতুন নতুন ফিচার যুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছে পেনশন কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে কিছু সুবিধা চালু হয়েছে। কিছু বিষয় নিয়ে পরিকল্পনা চলছে। কীভাবে আরও আকর্ষণীয় নতুন প্যাকেজ চালু করা যায় তা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামতও নেওয়া হচ্ছে।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সদস্য গোলাম মোস্তফা বলেন, শুরুর বছরের আমানতের ওপর ভিত্তি করে মুনাফা ধরা হয়েছে সর্বনিম্ন ৮ শতাংশ। এরই মধ্যে প্রত্যেক হিসাবধারী নিজ নিজ অ্যাকাউন্টে তার মুনাফার পরিমাণ দেখতে পাচ্ছেন। এখন থেকে প্রতিবছর জুনের মধ্যে এই হিসাব করা হবে এবং অক্টোবরের মধ্যে মুনাফা গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে জমা হবে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পেনশন কর্তৃপক্ষ পেনশন স্কিমগুলোকে আরও আকর্ষণীয় করতে স্বাস্থ্য বীমা এবং এককালীন গ্র্যাচুইটি চালুর বিষয়টি বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে। এ ছাড়া ট্রেজারি বন্ড ছাড়াও বিনিয়োগের জন্য আরও লাভজনক ও কম ঝুঁকিপূর্ণ খাত খোঁজার পরামর্শ এসেছে।
গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য প্যাকেজ চালুর ঘোষণা
রপ্তানিমুখী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিপুল জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তার জন্য নতুন স্কিম চালুর ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সম্প্রতি পোশাকশ্রমিকদের মধ্যে ন্যায্যমূল্যে টিসিবির পণ্য বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধনের সময় জনপ্রশাসন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, ‘গার্মেন্টস শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য পেনশন স্কিম ব্যবস্থা শুরু করে দিয়ে যাব। যাতে ভবিষ্যতে তাদেরকে দুর্বিষহ জীবনযাপন করতে না হয়।’