কাজী হাফিজ
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪ ১০:৪৭ এএম
ফাইল ফটো
বহুল আলোচিত আউয়াল কমিশনের বিদায়ের পর নির্বাচন কমিশনে (ইসি) যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে তা কবে নাগাদ পূরণ হবে সেটা অনিশ্চিত। অতীতেও এ ধরনের শূন্যতার নজির রয়েছে। তবে তা বেশি দিনের ছিল না। কিন্তু নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এবার এ শূন্যতা দীর্ঘ হতে পারে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এক দিনেই ১২টি সিটি মেয়রসহ ১ হাজার ৮৭৬ জনপ্রতিনিধিকে অপসারণ করা হয়েছে। বিদ্যমান আইন অনুসারে এসব শূন্যপদে নির্বাচনের প্রয়োজন থাকলেও জন-আকাঙ্ক্ষা ভিন্ন। দেশের সচেতন নাগরিকরা বলছেন, জনতার অভ্যুত্থান যে ম্যান্ডেট অন্তর্বর্তী সরকারকে দিয়েছে, সেই অনুসারে রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের লক্ষ্য অর্জন সাপেক্ষে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। সংবিধান ও নির্বাচনী ব্যবস্থায় পরিবর্তন হওয়া দরকার। ব্ষিয়টি সময়সাপেক্ষ। তাই সংস্কারের আগে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের প্রয়োজন নেই বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রি. জে. (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন গতকাল শুক্রবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, এখন নির্বাচন কমিশন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজন নেই। ছয় মাস কিংবা এক বছর নির্বাচন কমিশন না থাকলেও কোনো সমস্যা হবে না। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আছে, প্রাত্যহিক এবং প্রশাসনিক কাজগুলো সচিবালয়ই করবে। নির্বাচন অনুষ্ঠান ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের আগে সংস্কার প্রয়োজন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের আইনটাও পরিবর্তন দরকার। এসব পদে নিয়োগ দিতে বাছাই প্রক্রিয়াটি দুই থেকে তিন ধাপে হওয়ার দরকার।
স্থানীয় সরকার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন হয় নির্বাচনের জন্য। যেহেতু এখন নির্বাচনের কথা ভাবা হচ্ছে না, কবে নাগাদ নির্বাচন হবে সে বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট, সে ক্ষেত্রে এখন নির্বাচন কমিশনের শূন্যতা কোনো সমস্যা তৈরি করবে বলে আমি মনে করি না। সংবিধানে নির্বাচনে কমিশনের মেয়াদের কথা বলা আছে। শূন্য থাকতে পারবে না তা বলা নেই।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশন এর আগেও শূন্য ছিল। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন আছে। সে আইন অনুসারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও কমিশন সচিবকে প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া আছে। এখন প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ শূন্য থাকলে সচিব সে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজে সমস্যা হলে সচিব অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে তার সমাধান চাইতে পারেন। তা ছাড়া রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনসহ নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারে যেসব দাবি উঠেছে তা পূরণ করতে গেলে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন যে বিলম্বিত হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
নির্বাচনের আগে যে ধরনের সংস্কারের দাবি উঠেছে
গত ২৮ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে কর্তৃত্ববাদী সরকার পতনের ফলশ্রুতিতে নতুন কর্তৃত্ববাদ ও দলীয় প্রভাবে পরিচালিত শাসনের উত্থানের ঝুঁকি প্রতিহত করতে দুর্নীতি প্রতিরোধ, গণতন্ত্র, সুশাসন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্রকাঠামোতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের লক্ষ্যে বিভিন্ন সুপারিশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দলনিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করা। জাতীয় সংসদে জনরায়ের বাস্তব প্রতিফলন নিশ্চিত করতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সংসদীয় ব্যবস্থা প্রবর্তন করা। নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ তরুণ প্রতিনিধি থাকতে হবে। পাশাপাশি নির্বাচিত সংসদ সদস্যসহ জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে গণ-অনাস্থা প্রকাশের মাধ্যমে অপসারণের বিধান থাকতে হবে। এ ছাড়া নিরপেক্ষ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্তভাবে সংসদ ও নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য একই ব্যক্তি একই সঙ্গে সরকারপ্রধান (প্রধানমন্ত্রী), দলীয় প্রধান ও সংসদ নেতা থাকতে পারবেন না এবং দুই মেয়াদের বেশি একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন নাÑ এমন বিধান সৃষ্টি করতে হবে।
গত ২৯ আগস্ট সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ‘সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন’ যেসব প্রস্তাব করে তার মধ্যে রয়েছেÑ আইনি কাঠামো নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইনি সংস্কারসহ অস্পষ্টতা দূর করা, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচন পদ্ধতি প্রবর্তনের কথা ভাবা, নারীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ এবং আসনসমূহে প্রত্যক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া। এ ছাড়া বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে নির্বাচনকালীন সরকার সম্পর্কে একটি রাজনৈতিক সমঝোতায় উপনীত হওয়ার এবং প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দলীয়করণমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাবও দেয় সুজন।
গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদকদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব রাখা হয়, যাতে নির্বাচন কমিশন রিফর্ম করে সত্যিকার অর্থে গণমুখী সংস্থা এবং বিশেষত নির্বাচন কমিশন যেন ভবিষ্যতে সমস্ত নির্বাচন সত্যিকার অর্থে জাতির ও ভোটারদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটায় এ রকম একটা সংস্থা গড়ে তোলা হয়।
শূন্যতার ইতিবৃত্ত
২০০৭ সালে বিচারপতি এম এ আজিজ কমিশনের সময়ে সর্বোচ্চ ছয় সদস্যের কমিশন ছিল। ওই বছর ২২ জানুয়ারি পদত্যাগ করেন বিচারপতি আজিজ। জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মাহফুজুর রহমান ভারপ্রাপ্ত সিইসি হন। পরে ওই কমিশনের পাঁচ সদস্যই ৩১ জানুয়ারি একযোগে পদ ছাড়েন। এমন পরিস্থিতিতে পাঁচ দিন পর, ৫ ফেব্রুয়ারি এটিএম শামসুল হুদা নেতৃত্বাধীন কমিশন নিয়োগ পায়।
সদ্য বিদায় নেওয়া হাবিবুল আউয়াল কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার আগেও ১২ দিন শূন্য ছিল নির্বাচন কমিশন। কে এম নূরুল হুদা কমিশনের মেয়াদ শেষ হয় ২০২২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি। আর হাবিবুল আউয়াল কমিশন দায়িত্ব পায় ২৭ ফেব্রুয়ারি।