বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৪ ০৯:৩৬ এএম
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে লিপ্ত’ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে (সাবেক ছাত্র সংঘ) সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের মধ্যে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ চালানোর অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। একই সঙ্গে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী জামায়াত ও তাদের সকল অঙ্গসংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী সত্তা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো নিষিদ্ধ হলো। এর আগে ১৯৭২ সালে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহারের’ কারণে। পরে জিয়াউর রহমানের আমলে দলটি রাজনীতি করার অধিকার ফিরে পায়। তারও আগে পাকিস্তান আমলে দুবার নিষিদ্ধ হয় জামায়াত। আওয়ামী লীগ সরকার গত ১৫ বছরে বিভিন্ন সময়ে দশটি জঙ্গি দলকে নিষিদ্ধ করলেও ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন’ প্রয়োগ করে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হলো এবারই প্রথম।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করা সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি জানিয়ে আসছিল। চার দশক পর সেই দাবি পূরণ হলেও যুদ্ধাপরাধের জন্য জামায়াতের বিচারের দাবি এখনও অপূ্র্ণ রয়ে গেছে। যদিও আদালতের রায়ে নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় দলটি গত দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি।
সরকারের নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কয়েকটি মামলার রায়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (পূর্বনাম জামায়াত-ই- ইসলামী/জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ) এবং এর অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে (পূর্বনাম ইসলামী ছাত্র সংঘ) ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দায়ী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
পাশাপাশি হাইকোর্ট এক রিট মামলার রায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করে দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও তা বহাল রেখেছেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘যেহেতু, সরকারের নিকট যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রহিয়াছে যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং উহার অঙ্গসংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির সাম্প্রতিককালে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সরাসরি এবং উস্কানির মাধ্যমে জড়িত ছিল; এবং যেহেতু, সরকার বিশ্বাস করে যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ উহার সকল অঙ্গসংগঠন সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সহিত জড়িত রহিয়াছে; সেহেতু, সরকার, সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯ এর ধারা ১৮(১) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ উহার সকল অঙ্গসংগঠনকে রাজনৈতিক দল ও সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করিল এবং উক্ত আইনের তফসিল-২ এ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ উহার সকল অঙ্গসংগঠনকে নিষিদ্ধ সত্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করিল।’ সরকারের এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে বলেও প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রী যা বললেন : নিষিদ্ধ হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকে কোনো সহিংসতা হলে তা দমনের সক্ষমতা সরকারের রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। গতকাল সন্ধ্যায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যুদ্ধ করে এই দেশ স্বাধীন করেছি। ওদের বিরুদ্ধে আমরা সেই একাত্তর থেকে যুদ্ধ করছি। সুতরাং এগুলো দমনে আমাদের সক্ষমতা অনেক আছে।’
এদিকে নিষিদ্ধ জামায়াত-শিবিরকে মোকাবিলার প্রস্তুতি সরকারের রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক। গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যেতে পারে। আন্ডারগ্রাউন্ডে অনেক দল গেছে। অনেক দলের কী হয়েছে, সেটা আপনারা জানেন। তবে সেটাকে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি আমাদের আছে।’
এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনও আমরা সংশোধন করার ব্যবস্থা করেছি। নিষিদ্ধ করার পরেও তাকে শাস্তি দেওয়া যাবে না এমনটি নয়। হয়তো নিষিদ্ধ করার বিষয়টি আর সাজার মধ্যে আসবে না। দলটির সম্পদের বিষয়ে আনিসুল হক বলেন, সেগুলোরও ব্যবস্থা হবে। সেটা আইনে আছে।
দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এই দলের অধীনে তারা রাজনীতি করতে পারবে না। বাংলাদেশের কোনো আইনে তারা অপরাধ করলে সেটার বিচার হবে। আপনারা যদি বলেন, গণহারে যারা জামায়াতে ইসলামীর নতুন কর্মী রয়েছেন, ১৯৭১-এর পর যারা জন্ম নিয়েছেন, তাদের বিচার করা হবেÑ এরকম গণহারে বিচার করা হবে না।’
যেভাবে এলো নিষেধাজ্ঞা : যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সক্রিয় বিভিন্ন সংগঠন জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার দাবি দীর্ঘদিন ধরে করে এলেও বিষয়টি গতি পায় সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনে ব্যাপক সহিংসতার পর। ২০১৮ সালে সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিল করে জারি করা পরিপত্র জুনের শেষে হাইকোর্ট অবৈধ ঘোষণা করলে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে ছাত্ররা ফের মাঠে নামে। জুলাইয়ে তা সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে যায়। পরে শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের বিভিন্ন কর্মসূচিকে ঘিরে একপর্যায়ে তা সহিংসতায় গড়ায়। ঘটে প্রাণহানির ঘটনা। এর মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলা শুরু হয়। রামপুরায় বিটিভি ভবন, বনানীতে সেতু ভবন, মহাখালীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয় এক্সপ্রেসওয়ের মহাখালীর টোল প্লাজা এবং মেট্রোরেলের দুটি স্টেশনে। নরসিংদীতে কারাগার ভেঙে জঙ্গি মামলার দাগী আসামিসহ অন্যদের বের করে নিয়ে আসা হয়। এই আন্দোলনকে ঘিরে সংঘাতের মধ্যে এক সপ্তাহে ১৫০ মানুষের মৃত্যুর তথ্য নথিভুক্ত করেছে সরকার, যদিও সংবাদমাধ্যমের খবরে দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর এসেছে।
সরকারের শীর্ষপর্যায় থেকে বলা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে নাশকতা করেছে একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী দল জামায়াতে ইসলামী, আর তাতে মদদ দিয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গী বিএনপি।
এই প্রেক্ষাপটে গত সোমবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। এরপর মঙ্গলবার আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, সরকারের নির্বাহী আদেশে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হবে এবং কোন আইনি প্রক্রিয়ায় তা করা হবে, তা চূড়ান্ত করা হবে বুধবারের মধ্যে।
বুধবার সন্ধ্যায় সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানান, ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণার প্রক্রিয়া চলছে। তিনি বলেন, ‘এই সবকিছু (আন্দোলনে সহিংসতা) তো ছাত্ররা করেনি। ছাত্রদের পেছনে রেখে যারা করেছে, সেগুলো জামায়াত-শিবির-বিএনপি। অন্যান্য জঙ্গি সংগঠন এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছিল। এটাই আমাদের কাছে প্রতীয়মান হচ্ছে। সেজন্য অনেকদিনের যে চাহিদা ছিল জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করার, আজকে সেই প্রক্রিয়াটি চলছে।’
জামায়াত নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপন বুধবারই জারি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া সারতে এক দিন সময় লেগে যায়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বৃহস্পতিবারের মধ্যেই প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
যে আইনে নিষিদ্ধ : জামায়াত এবং এর সকল অঙ্গসংগঠনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮ (১) ধারার ক্ষমতাবলে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কার্যের সহিত জড়িত রহিয়াছে মর্মে যুক্তিসঙ্গত কারণের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উক্ত ব্যক্তিকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারিবে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারিবে।’
আইনে সন্ত্রাসী কাজের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি, সত্তা বা বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশের অখণ্ডতা, সংহতি, জননিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করার জন্য জনসাধারণ বা জনসাধারণের কোনো অংশের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার বা কোনো সত্তা বা কোনো ব্যক্তিকে কোনো কাজ করতে বা করা থেকে বিরত রাখতে বাধ্য করার জন্য অন্য কোনো ব্যক্তিকে হত্যা, গুরুতর আঘাত, আটক বা অপহরণ করে বা করার চেষ্টা করে, এ ধরনের কাজের জন্য অন্য কারও সঙ্গে ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত করে; অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি, সত্তা বা প্রজাতন্ত্রের কোনো সম্পত্তির ক্ষতি করে বা করার চেষ্টা করে; অথবা ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র বা সহায়তা বা প্ররোচিত করে; অথবা এ ধরনের উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো বিস্ফোরক দ্রব্য, দাহ্য পদার্থ ও আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে বা নিজ দখলে রাখে, কোনো সশস্ত্র সংঘাতময় দ্বন্দ্বের বৈরী পরিস্থিতিতে অংশ নেয়, তাহলে তা ‘সন্ত্রাসী কাজ’ বলে গণ্য হবে। এ আইনে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে দ্বিতীয়বার নিষিদ্ধ : মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে অস্ত্র ধরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর নিষিদ্ধ হওয়া জামায়াতে ইসলামী অর্ধশতক পর আবারও নিষিদ্ধ হলো।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের সংবিধানে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্মের অপব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। তাতে জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ডও নিষিদ্ধ হয়ে যায়। সে সময় জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল সংবিধানের ৩৮ ধারার ক্ষমতাবলে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের সময় ১৯৭৬ সালে সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদ বাতিল করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। তাতে ফের বৈধভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পায় জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনের মাধ্যমে ৩৮ অনুচ্ছেদ ফিরিয়ে আনা হয়।
জামায়াতকে নিষিদ্ধের দাবি সেই নব্বইয়ের দশকেই সামনে এসেছিল শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন থেকে। ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের সময় তা আরও জোরালো হয়। গত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন সময় একাত্তরের ভূমিকার জন্য সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার ও দলটি নিষিদ্ধের পক্ষে কথা বললেও বাস্তবে তা কার্যকর করা হয়নি।
একনজরে জামায়াতের কর্মকাণ্ড : জামায়াতে ইসলামীর সূচনা উপমহাদেশের বিতর্কিত ধর্মীয় রাজনীতিক আবুল আলা মওদুদীর নেতৃত্বে ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট, তখন এর নাম ছিল জামায়াতে ইসলামী হিন্দ। সেখানেও নিষিদ্ধ হয়েছিল এ দল।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উস্কানির অভিযোগে প্রথমবার পাকিস্তানে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয় ১৯৫৯ সালে। এরপর ১৯৬২ সালে আইয়ুব খান প্রণীত মুসলিম পরিবার আইনের বিরোধিতার কারণে ১৯৬৪ সালের ৪ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর কর্মকাণ্ড আবারও নিষিদ্ধ হয়। তবে পরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। পাকিস্তানের সামরিক আদালতের রায়ে মওদুদীর মৃত্যুদণ্ডও হয়েছিল। তবে তাকে শেষ পর্যন্ত ফাঁসিতে ঝুলতে হয়নি। দণ্ড মওকুফ করে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলন যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন ১১ দফাসহ বিভিন্ন দাবির বিরোধিতা করে জামায়াত। মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তানের মন্ত্রিসভায় ছিল জামায়াতের অংশগ্রহণ। দুজন মন্ত্রী ছিল তাদের। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে সহায়তা করতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামে বিভিন্ন দল গঠন করে জামায়াত ও এর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ। সে সময় তারা সারা দেশে ব্যাপক হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটের মতো যুদ্ধাপরাধ ঘটায়। আদালতে ঘোষিত যুদ্ধাপরাধ মামলার বিভিন্ন রায়ে বিষয়গুলো উঠে আসে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দলটির পাঁচ শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ব্যক্তির অপরাধের বিচার হলেও দল হিসেবে জামায়াতের বিচারের দাবি ২০১৩ সালেই গণজাগরণ মঞ্চ থেকে তোলা হয়েছিল। গোলাম আযমের মামলার রায়ে আদালত জামায়াতকে ‘ক্রিমিনাল দল’ আখ্যায়িত করার পর দাবিটি আরও জোরালো হয়ে ওঠে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ২০২২ সালের আগস্টে বলেছিলেন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের জন্য দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর বিচারে আইন সংশোধনের প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু পরে সে বিষয়টি আর সংসদ পর্যন্ত যায়নি।
তরীকত ফেডারেশনের নেতা রেজাউল হক চাঁদপুরীসহ কয়েকজনের রিট আবেদনে হাইকোর্ট ২০১৩ সালে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল ঘোষণা করে। সংবিধানের সঙ্গে জামায়াতের গঠনতন্ত্র ‘সাংঘর্ষিক’ হওয়ায় হাইকোর্ট ওই রায় দেন। তাতে দলীয়ভাবে জামায়াতের নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
নিবন্ধন বাতিলের পর জামায়াত দশম, একাদশ ও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার যোগ্য বিবেচিত হয়নি। তবে ২০১৯ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনে জোটসঙ্গী বিএনপির নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে ভোটে অংশ নিয়েছিলেন জামায়াতের কয়েকজন। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের কোনো নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নিতে না পারলেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জামায়াত নেতারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।
প্রতিক্রিয়া : ভোটের রাজনীতিতেও প্রাসঙ্গিকতা হারানো জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে কী ফল হবে- এ ব্যাপারে অভিমত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পরও ঝটিকা মিছিল বা জমায়েত হয়ে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকার সুযোগ পাচ্ছিল জামায়াত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাদের প্রচার চালানোর সুযোগ ছিল। নিষিদ্ধ ঘোষণা হলে সেসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। এমনকি জামায়াতকে কোনোভাবে সহযোগিতা বা অর্থায়ন করার পথও আইনিভাবে বন্ধ হয়ে যাবে।
আর সেক্ষেত্রে জামায়াত কর্মীরা জঙ্গি দলের মতো গোপন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করতে পারে বলে মনে করেন কেউ কেউ। সে কারণে এত বছর পর জামায়াত-শিবিরকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করার ‘অভিঘাত’ সম্পর্কে সরকারকে ভাবার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।