ফারহানা বহ্নি
প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০২৪ ০৯:০৬ এএম
ছোট ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট হাসপাতালে দুই দিন আগে ভর্তি হয়েছেন মেহেরপুরের বাসিন্দা গঞ্জেনুর খাতুন। কিছুটা বিরক্ত এই নারী তার অসুখ ও চিকিৎসা নিয়ে। সত্তর বছর বয়সি এই নারীর কাছে সমস্যা জানতে চাইলে কানে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বললেন ‘জরায়ুমুখ দিয়ে রক্ত যাচ্ছে।’ এক মাস আগে ক্যানসার ধরা পড়ে তার।
১৫ দিন ধরে জরায়ুমুখ দিয়ে রক্ত গেলেও ছেলেদের জানাতে কিছুটা লজ্জাবোধও করেন তিনি। গঞ্জেনুর বলেন, ‘কোনো আলামত নাই খালি রক্ত যায়। ছেলেরারে কী কমু? ভাবছি ঠিক হইয়া যাব। মেহেরপুরে গাইনি দেখাইলাম, কয় লক্ষণ আছে। এখানে আইলাম কয় ক্যানসার হইছে। এখনও কোনো চিকিৎসা হয় নাই, কিন্তু টাকা তো সব যাইতাছে গা।’
তিনি জানান, দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন, তিন ছেলেও বিয়ে করেছে। হাত পেতে চিকিৎসার টাকা চাইতে লজ্জা হয় সন্তানদের কাছ থেকে। তাদেরও টানাপড়েনের সংসার। তার সঙ্গে কথা হয় হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ডে।
শুধু গঞ্জেনুর নন, ক্যানসার হাসপাতালের রোগীদের সঙ্গে কথা বলে দেখা যায় নানা কারণে স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যানসারের চিকিৎসায় দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টি। জড়তা, লজ্জা ও অবহেলা থেকে বেরিয়ে ডাক্তারের কাছে এলেও শনাক্তেই লেগে যায় অনেকটা সময়। একই সঙ্গে পড়তে হয় আর্থিক সংকটে। চিকিৎসায় বিলম্ব এবং অত্যধিক ব্যয় বাড়াচ্ছে মৃত্যুঝুঁকি।
নরসিংদীর বাসিন্দা সবিতা সূত্রধর। জরায়ুমুখ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর আগে ২০২১ সালে এক বছর চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। গতবার ঢাকা মেডিকেল থেকে তিনটা কেমোথেরাপিতে ২৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। পরে প্রত্যেকটা ৪ হাজার করে আরও তিনটা থেরাপি নেন ক্যানসার হাসপাতাল থেকে। ঢাকায় থাকা-খাওয়া ও হাসপাতালের খরচসহ ২ লাখ টাকার মতো লেগেছিল, যার বেশিরভাগই ধারদেনা করে নেওয়া।
সবিতা বলেন, সাত দিন ধরে প্রচুর স্রাব যাচ্ছিলÑ ভেঙে ভেঙে পানির মতো। তারপর ডাক্তার বললেন আবার ভর্তি হতে। পরীক্ষা করার পর আবার ক্যানসার ধরা পড়ল। আত্মীয়-স্বজন দিচ্ছেন টাকা-পয়সা। ধার শোধ করতে না করতেই আবারও ক্যানসার। এখন পর্যন্ত ১৬ দিনে ২০ হাজার টাকা ওষুধ বাদে খরচ হয়েছে। আবার কেমোথেরাপি দিতে হবে। প্রত্যেকটা ১১ হাজার টাকা করে।
শনাক্তে সময় চলে যায়, নষ্ট রেডিওথেরাপি মেশিন
জরায়ুমুখ দিয়ে রক্ত আসার মাসখানেক পর ডাক্তারের কাছে আসেন পুরান ঢাকার লালবাগের রাশেদা বেগম। ষাটোর্ধ্ব এই নারী জানান, অনেক টেস্ট করানো হলেও তার রোগ প্রথমে শনাক্ত করা যায়নি। তিনি বলেন, ‘রক্তপাত হওয়ার এক মাস দেরি করেছি ডাক্তার দেখাইতে। আজিমপুরে একটা মেডিকেলে গেছিলাম, বলছে আমার মাসিকের সমস্যা। অথচ আমার মাসিক বন্ধ ১৮ বছর। পরে আমার বইনে বলল মিটফোর্ডে যাইতে। সব বাদ দিয়ে ঢাকা মেডিকেলে গেলে বলল জরায়ুতে সমস্যা। ওখান থেকে গেলাম পপুলারে। সেখান থেকে এক সপ্তাহ পর ক্যানসারের রিপোর্ট পাইছি।’
ক্যানসার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রাশেদা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘সাথে থাকার কেউ নাই। হতে টাকা-পয়সাও নাই। ওষুধ লাগে মাসে সাত থেকে আট হাজার টাকার। এখন রেডিওথেরাপি নিতে হচ্ছে। এখানেও টাকা যায় পানির মতো। এর মধ্যে আবার মেশিন নষ্ট থাকে। তিন দিন ধরে বেডভাড়া দিচ্ছি, ৩৬৩ টাকা দৈনিক। এই নিয়ে দুবার মেশিন নষ্ট। এর আগের চার দিন বসে ছিলাম মেশিন নষ্ট হওয়ার কারণে। আমার আরও ৯টা থেরাপি দিতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওরা কয় কি যান গা। বাইরে চিকিৎসা করান। বাইরে যদি থেরাপি দিতে পারতাম, তাইলে এখানে পইরা থাকি। আমার শরীলের অবস্থা বেশি খারাপ। তারপরও টাকার অভাবে এখানে পইরা আছি।’
টাকার অঙ্কটা বড় হলেও তুলনামূলক কমে চিকিৎসা পাওয়া যায় বলে এই হাসপাতালেই ভিড় করেন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীরা। কিন্তু মেশিন নষ্ট হওয়ায় বিড়ম্বনায় বারবারই পড়তে হচ্ছে তাদের। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত টাঙ্গাইলের বাসিন্দা ফাহমিদা আক্তার। জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে এসেছেন রেডিওথেরাপি দিতে। কিন্তু এ হাসপাতাল থেকে বলা হয়, তাকে চার মাস অপেক্ষা করতে হবে। হাসপাতালের রেডিওথেরাপির কক্ষের সামনে কথা হয় ফাহমিদার সঙ্গে। তিনি বলেন, টাকা খরচ করে কাউকে ধরে সিরিয়াল নিতে হবে। হাসপাতাল থেকে বলে, মেশিন নষ্ট থাকায় আপাতত সিরিয়াল নেই। কিন্তু তাকে যত দ্রুত সম্ভব থেরাপি নিতে হবে। বাধ্য হয়ে দালালকে টাকা দিয়ে সিরিয়াল নিতে হচ্ছে।
জানা গেছে, ক্যানসার হাসপাতালের রেডিওথেরাপির ছয়টি মেশিনের মধ্যে চারটি পুরোপুরি বিকল। বাকি দুটিও কখনও কখনও বিকল হয়ে পড়ে। সেগুলো মেরামত করে করেই কাজ চালানো হচ্ছে। ফলে রোগীরা বাধ্য হচ্ছেন সেরকারি হাসপাতালে যেতে।
ওয়ার্ল্ড ক্যানসার সোসাইটি বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ হুমায়ূন কবীর বলেন, ‘ক্যানসার শনাক্তের পরও যখন চিকিৎসক পাওয়া যায় না, থেরাপির সময় থেরাপি নেওয়া যায় না, তখন অনেক রোগীর ক্যানসার প্রাথমিক অবস্থা থেকে পুরো শরীরে ছড়িয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু হলে অনেকেই সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।’
উচ্চবিত্তরা হয়তো বেসরকারি কিংবা বাইরে থেকে চিকিৎসা নিতে পারেন, কিন্তু মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের অবস্থা ভয়াবহ বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ স্তন ক্যানসার সচেতনতা ফোরামের প্রধান সমন্বয়কারী ও প্রকল্প সমন্বয়কারী অধ্যাপক ডা. হাবিবুল্লাহ তালুকদার রাসকিন। তিনি বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালের রোগীগুলোও যখন বেসরকারিতে যেতে শুরু করে, তখন তারা দ্বিগুণ তিনগুণ চিকিৎসা খরচ নিচ্ছে। আমি মনে করি, দেশের দরিদ্রদের সঙ্গে এটা অন্যায় হচ্ছে। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি নিতে এখন সরকারিতে মাস নয়, বছরও অপেক্ষা করতে হয় এমন অবস্থা। প্রতিটা জেলায় ক্যানসার হাসপাতাল স্থাপন হয়নি এখনও। খুব সহজ সরল পরীক্ষার বিষয়টিও মানুষের ঘরের কাছে হচ্ছে না। ফলে শনাক্তেই সময় চলে যায় অনেক।’
তিনি বলেন, ‘বিনামূল্যে ক্যানসারের জন্য স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে সেটাও পুরোনো মডেল। মূলত এখন করা হয় এইচ পিভি ডিএনএ টেস্ট। আমাদের দেশে পিসিআর মেশিন নেইÑ এমন তো না। মেশিনগুলো অকেজো হয়ে আছে।’
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে গড়ে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি রোগী রেডিওথেরাপি নিতে আসেন। কিন্তু দুটি মেশিন দিয়ে মাত্র ২০০ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ক্যানসার বোগীর প্রায় ৫০ শতাংশের ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি চিকিৎসার দরকার হয়, বিশেষ করে স্তন ও জরায়ু ক্যানসারের ক্ষেত্রে।