আলাউদ্দিন আরিফ
প্রকাশ : ৩০ জুন ২০২৪ ১০:৫০ এএম
মতিউর রহমান। ফাইল ফটো
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) বহুল আলোচিত সদ্যবিদায়ি সদস্য মতিউর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের আয়কর নথি থেকে বিপুল সম্পদের তথ্য পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তথ্য চেয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক, এনবিআরসহ বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দেওয়ার কাজ চলছে। কমিশন মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যদের যেসব সম্পদের তথ্য পেয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে এ সপ্তাহেই সকল স্থাবর সম্পদ জব্দ (ক্রোক) ও অস্থাবর সম্পদ ফ্রিজের (অবরুদ্ধ) নির্দেশনা চেয়ে আদালতে আবেদন করবে।
এদিকে ছাগলকাণ্ডে নাম আসার পর দুদকের অনুসন্ধান কমিটির পাশাপাশি মতিউরের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। তারাও মতিউরের বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। অপরদিকে মতিউরকে বাঁচাতে মাঠে নেমেছে প্রভাবশালী একটি গ্রুপ। তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন মহলে দেনদরবারও শুরু করেছে। চক্রটিতে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংক ও একাধিক মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী ও মতিউরের সুবিধাভোগী অংশীজন।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সিআইসি মতিউরের আয়কর ফাইলে দেখানো আয়-ব্যয় ও সম্পদের অনুসন্ধান করছে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা আন-অফিসিয়ালি তার ট্যাক্স ফাইলে উল্লিখিত সম্পদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছি। তার পরিবারের সদস্যদের বিষয়েও তদন্ত করব। তবে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেন মতিউর। আমরা এ বিষয়ে কোনো তাড়াহুড়া করতে বা তাকে একবিন্দু ছাড় দিতে রাজি নই।’
দুদক সূত্রে জানা গেছে, মতিউরের আয়কর নথি গত সপ্তাহেই এনবিআরের কাছে তলব করা হয়েছে। আয়কর নথি অনুযায়ী, মতিউর কমবেশি ২০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মালিক। এর মধ্যে নগদই রয়েছে ১৩ কোটি টাকা। আয়কর নথিতে মতিউর পুঁজিবাজারে ৮২ লাখ টাকা বিনিয়োগের তথ্য উল্লেখ করেছেন। হাতে নগদ আছে ১২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এছাড়া ৫০ লাখ টাকার এফডিআর, ৩ কোটি টাকার অকৃষি সম্পত্তি এবং একটি মৎস্য খামারকে ৫০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করেছেন তিনি। আয়কর নথিতে তার আর কোনো সম্পত্তির উল্লেখ নেই। মতিউরের বিরুদ্ধে এর আগে চারবার অনুসন্ধান করে দায়মুক্তি দেয় দুদক। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘ধূর্ত মতিউর আগে থেকেই সম্পদ নিজের নামে না করে পরিবারের সদস্যদের নামে করেছেন।’
১০ কোটি টাকার সম্পদ লায়লা কানিজ লাকীর
এদিকে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যাওয়া মতিউরের প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকীর নামে-বেনামে প্রচুর সম্পদ থাকার তথ্য রয়েছে আয়কর নথিতে। ২০২৩-২৪ করবর্ষের আয়কর বিবরণীতে মতিউর রহমানের স্ত্রী লায়লা কানিজ মোট সম্পদ দেখিয়েছেন ১০ কোটি ৩০ লাখ ৫১ হাজার টাকা। হাতে এবং ব্যাংকে নগদ ৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা আছে বলে উল্লেখ করেছেন। পুঁজিবাজারের শেয়ার বিক্রি থেকে ১ কোটি ৬৮ লাখ ৯৩ হাজার টাকা মুনাফার কথাও উল্লেখ করেছেন তিনি। স্থাবর সম্পদের মধ্যে তার প্রায় ২৮ বিঘা জমি ও ৫টি ফ্ল্যাট রয়েছে; এর মধ্যে ঢাকার মিরপুরে একটি ভবনেই রয়েছে চারটি ফ্ল্যাট।
আয়কর ও নির্বাচনী হলফনামার নথি অনুযায়ী, বাড়ি-অ্যাপার্টমেন্ট-দোকান ও অন্যান্য ভাড়া থেকে বছরে লায়লা কানিজ লাকীর আয় ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা। কৃষি খাত থেকে আয় ১৮ লাখ টাকা। শেয়ার-সঞ্চয়পত্র-ব্যাংক আমানতের লভ্যাংশ থেকে আসে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫০০ টাকা। উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে সম্মানী ভাতা পান ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৭৫ টাকা। এছাড়া ব্যাংক থেকে লভ্যাংশ হিসেবে আয় করেন ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৩৯ টাকা। বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার জমা রয়েছে ৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা।
লায়লা কানিজের কৃষিজমির পরিমাণ ১৫৪ শতাংশ। অকৃষি জমির মধ্যে রয়েছে রাজউকে পাঁচ কাঠার প্লট, সাভারে সাড়ে ৮ কাঠা, গাজীপুরে ৫ কাঠা, পুবাইলে ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ ও ২ দশমিক ৯০ শতাংশ, পুবাইল থানার খিলগাঁও মৌজায় ৫ শতাংশ ও ৩৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ, গাজীপুরের বাহাদুরপুরে ২৭ শতাংশ, গাজীপুরের মেঘদুবীতে ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ, গাজীপুরের ধোপাপাড়ায় ১৭ শতাংশ, নরসিংদীর রায়পুরায় ৩৫ শতাংশ, ৩৫ শতাংশ ও ৩৩ শতাংশ, রায়পুরার মরজালে ১৩৩ শতাংশ, সোয়া ৫ শতাংশ, ৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ, ২৬ দশমিক ২৫ শতাংশ ও ৪৫ শতাংশ, শিবপুরে ২৭ শতাংশ ও ১৬ দশমিক ১৮ শতাংশ, শিবপুরের যোশরে সাড়ে ৪৪ শতাংশ ও নাটোরের সিংড়ায় ১ একর ৬৬ শতাংশ জমি। কলেজশিক্ষক লায়লা কানিজ বর্তমানে নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং জেলা আওয়ামী লীগের ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক।
ছাগলকাণ্ডে নাম আসার পর প্রায় দুই সপ্তাহ অন্তরালে ছিলেন লায়লা কানিজ। গত বৃহস্পতিবার তিনি প্রকাশ্যে আসেন এবং একপর্যায়ে মন্তব্য করেন, ‘আমাদের কিছুই হবে না, অনেক বড় বড় সাংবাদিক কিনে এসেছি।’ মতিউরের দ্বিতীয় স্ত্রী ও ছেলে ইফাত মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন বলে জানা গেছে।
কানাডাপ্রবাসী কন্যার যত সম্পদ
মতিউর ও লায়লা কানিজ দম্পতির কানাডাপ্রবাসী কন্যা ফারজানা রহমান ইপ্সিতারও রয়েছে শতকোটি টাকার সম্পদ। ২০২৩-২৪ করবর্ষে ইপ্সিতার আয়কর ফাইলে ৪২ কোটি টাকার সম্পদ দেখানো হয়েছে। সোনালী সিকিউরিটিজে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, সিনাজি ট্রেডিং লিমিটেডে ৫ লাখ টাকা, গ্লোবাল সুজ কোম্পানিতে ৪ কোটি ৯৪ লাখ ৫৫ হাজার, ওয়ান্ডার পার্কে ১০ লাখ ও মামুন অ্যাগ্রো প্রোডাক্টস কোম্পানিতে ৪৫ লাখ ৪৫ হাজার ৬৯০ টাকা বিনিয়োগ রয়েছে তার। আয়কর নথি থেকে আরও জানা গেছে, বিভিন্ন স্থানে ঋণ ও ধার বাবদ ইপ্সিতার সম্পদ আছে ২২ কোটি টাকার। নরসিংদীতে হেবামূলে দেড় একর জমি আছে তার। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বিলাসবহুল এলাকায় সাততলা বাড়ি মালিক তিনি। আয়কর নথিতে এর মূল্য ৫ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ডি-ব্লকের ৮ নম্বর রোডে ৫ কাঠা জায়গার ওপর অত্যাধুনিক বাড়ি বানিয়েছেন মতিউর। এখানে বসবাসও করেন প্রথম স্ত্রীকে নিয়ে।
দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মীর যত সম্পদ
মতিউরের দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিবলী এবং তার সন্তানদের নামেও রয়েছে বিপুল সম্পদ। দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে ধানমন্ডিতে একটি, লালমাটিয়ায় একটি, কাকরাইলে দুটিসহ আরও বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট কিনেছেন মতিউর। তার নামে পুঁজিবাজারে প্লেসমেন্ট শেয়ার কিনে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। পেশায় গৃহিণী স্ত্রী শাম্মীর দৃশ্যমান কোনো আয়ের উৎস নেই। পুরান ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে এসকে থ্রেড নামে সুতা তৈরির কারখানা আর টঙ্গীতে এসকে ট্রিম ইন্ডাস্ট্রি লিমিটেড নামের গার্মেন্ট সরঞ্জাম তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন মতিউর। টঙ্গীতে ৪০ হাজার বর্গফুটের এসকে ট্রিমস নামের ব্যাগ ম্যানুফ্যাকচারিং ও অ্যাকসেসরিজ কারখানা রয়েছে তার। যদিও কাগজে-কলমে কারখানার মালিক তার ভাই এমএ কাইয়ুম হাওলাদার। ময়মনসিংহের ভালুকায় ৩০০ বিঘা জমিতে রয়েছে গ্লোবাল সুজ নামে জুতা তৈরির কারখানা। নরসিংদীর রায়পুরায় রয়েছে ওয়ান্ডার পার্ক অ্যান্ড ইকো রিসোর্ট। এসব রিসোর্টের মালিকানায় রয়েছেন তার ছেলে ও মেয়ে। এছাড়া গাজীপুরের পুবাইলের খিলগাঁও মৌজায় আপন ভুবন পিকনিক অ্যান্ড শুটিং স্পটের মালিকও মতিউরের পরিবার। ঘনিষ্ঠদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে মতিউর করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার কাছ থেকে ৩০০ কোটি টাকার চেক লিখে নিয়েছিল শাম্মী ও তার পরিবারের সদস্যরা।
যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে
দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মতিউর ও তার পরিবারের ৭ সদস্যের ব্যাংক হিসাব জব্দের আদেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-বিএফআইইউ। একই সঙ্গে তাদের বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করেছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। বিএফআইইউ থেকে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও এমএফএস কোম্পানিতে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের চিঠি দেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ড. মো. মতিউর রহমান, তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ লাকী, দ্বিতীয় স্ত্রী শাম্মী আখতার শিবলী, সন্তান ইফতিমা রহমান মাধুবী, মুশফিকুর রহমান ইফাত, ফারজানা রহমান (ইপ্সিতা), আহাম্মেদ তৌফিকুর রহমান অর্ণব ও ইরফানুর রহমান ইরফান বা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নামে কোনো অ্যাকাউন্ট থাকলে ৩০ দিনের জন্য স্থগিত করতে হবে। চিঠিতে মতিউর ও তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাবের লেনদেন বিবরণী, হিসাব খোলার ফরম, কেওয়াইসিসহ যাবতীয় তথ্য ৫ কর্মদিবসের মধ্যে বিএফআইইতে পাঠাতে বলা হয়েছে। এছাড়া ইলেকট্রনিক শেয়ার সংরক্ষণকারী কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান সিডিবিএলকে মতিউর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। মতিউরের ভাই, ভাতিজা, শ্যালকসহ নিকটাত্মীয়দের ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা উত্তোলনের বিষয়ে মৌখিক স্থগিতাদেশও দেওয়া রয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধান দলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা গতকাল শনিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা আয়কর নথিসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাথমিকভাবে মতিউর ও তার পরিবারের সদস্যদের যেসব সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছি, সেগুলোর তালিকা করা হয়েছে। এসব স্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অস্থাবর সম্পদ ফ্রিজ করার নির্দেশনা চেয়ে কমিশনে আবেদন করা হবে। কমিশনের অনুমোদন পেলে চলতি সপ্তাহেই সকল সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজ করার নির্দেশনা চেয়ে আদালতে আবেদন করা হবে।’
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সাদিক অ্যাগ্রো থেকে মতিউর রহমানের পুত্র মুশফিকুর রহমান ইফাতের ১৫ লাখ টাকায় একটি ছাগল কেনার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এছাড়া তিনি ঢাকার বিভিন্ন খামার থেকে ৭০ লাখ টাকায় গরু কেনেন বলে খবর প্রকাশ হয়। ছাগলকাণ্ডের পর মতিউর রহমানকে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট আপিলাত ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরানো হয়েছে সোনালী ব্যাংকের পরিচালকের পদ থেকেও। মতিউর, তার প্রথম স্ত্রী লায়লা কানিজ ও ছেলে আহমদ তৌফিকুর রহমানের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আদালত। মতিউরসহ পরিবারের ৮ জনের ব্যাংক ও বিও হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে।