বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৪ ১০:৪০ এএম
রেলওয়ের ই-টিকিট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সহজ ডটকম অভিযোগমুক্ত হতে পারছে না। গত বৃহস্পতিবার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন র্যাব-৩-এর আভিযানিক দল ট্রেনের টিকিট কালোবাজারির একটি চক্রের ১২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। শুক্রবার (১৫ জুন) এ বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা রেলওয়ের টিকিট বুকিংয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে এ অপকর্ম করে আসছিল।
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে র্যাব-৩-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফয়জুল ইসলাম জানান, এই চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম হচ্ছে সহজ ডটকম।
গত মার্চে ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশব্যাপী ট্রেনযাত্রার অন্তত তিন হাজার টিকিট হাতিয়ে নিয়ে কালোবাজারে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল একটি চক্রের। সে সময় রেলওয়ের অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সহজ ডটকমের কর্মীসহ চক্রের ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-৩।
রেলওয়ের সঙ্গে শর্ত পূরণ না করায় সহজ ডটকমকে গত ২৬ মে রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আর্থিক জরিমানাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে।
এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম এমপি গতকাল শুক্রবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ওই সুপারিশ কাগজে-কলমে এখনও আমরা হাতে পাইনি। পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সহজ ডটকমের সেবা সম্পর্কে অনেক অভিযোগ রয়েছে। রেলপথমন্ত্রী হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে আপনার নিজের পর্যবেক্ষণ কীÑ এ প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘এ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গোয়েন্দা রিপোর্ট রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লোকজনের বিরুদ্ধে টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ রয়েছে।’
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক সরদার সাহাদাত হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, সহজ ডটকমের সঙ্গে ই-টিকিট সেবায় আমাদের চুক্তির মেয়াদ রয়েছে এখনও দুই বছর। প্রতিষ্ঠানটি চুক্তির শর্ত পূরণ না করার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের পরিচালক বিস্তারিত বলতে পারবেন।
শর্ত পূরণ না করার কারণে সহজ ডটকমের সঙ্গে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই কি চুক্তি বাতিল সম্ভবÑ এ প্রশ্নে রেলপথমন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম এমপি বলেন, চুক্তিবদ্ধ কোনো প্রতিষ্ঠান আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট করলে প্রমাণের ভিত্তিতে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে চুক্তি বহাল থাকে না।
সংসদীয় কমিটিতে যে অভিযোগ
গত ২৬ মে সংসদীয় কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা যায়, আগের বৈঠকে সহজ ডটকম নিয়ে আলোচনা হয়। সে বৈঠকে সহজ ডটকমের কী পরিমাণ যন্ত্রাংশ স্থাপন করার কথা ছিল এবং কী পরিমাণ স্থাপন করেছে তা কমিটিকে জানাতে বলা হয়। একই সঙ্গে আগামী দুই মাসের মধ্যে যন্ত্রাংশ স্থাপনে ব্যর্থ হলে চুক্তি বাতিলের সুপারিশ করা হয়।
সে অনুযায়ী ২৬ মের বৈঠকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে সাতটি চুক্তির মধ্যে সহজ ডটকম মাত্র দুটি চুক্তি শেষ করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। বাকি পাঁচটির মধ্যে একটি চুক্তিতে ১৫০ স্টেশনে কম্পিউটারাইজড করার কথা থাকলেও তা ৩০টিতে করা হয়েছে। বাকি চারটি এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ হয়নি।
সহজ ডটকম যেসব যন্ত্রাংশ এখনও সরবরাহ করতে পারেনি তা হলোÑ টিকিট ভেন্ডিং মেশিন, জায়ান্ট স্ক্রিন ডিসপ্লে, সার্ভিস কি কিয়োস্ক এবং জিপিএস ট্রেন ট্র্যাকার।
ওই দিন কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর সভাপতিত্বে বৈঠকে অংশ নেন কমিটির সদস্য ও মন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম, নুরুল ইসলাম সুজন, শফিকুল ইসলাম শিমুল, শামীম ওসমান, গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স, ইফতিকার উদ্দিন তালুকদার পিন্টু, মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, শফিকুর রহমান ও নুরুন নাহার বেগম।
সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিয়ে টিকিট কালোবাজারি
গতকাল র্যাব-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফিরোজ কবীর রাজধানীর কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত বৃহস্পতিবার টিকিটে কালোবাজারির জন্য দুটি চক্রের ১২ জন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে অনলাইনে বিভিন্ন নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল সিম ব্যবহার করে টিকিট কেটে রাখে চক্র দুটি। তারপর সেই টিকিট সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে দ্বিগুণ তিনগুণ বেশি দামে সাধারণ যাত্রীদের কাছে বিক্রি করে। গত বৃহস্পতিবার র্যাব-৩-এর আভিযানিক দল দুটি চক্রের ১২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। রাজধানীর মৌচাক ও কমলাপুর থেকে ১০ জন এবং ঠাকুরগাঁও থেকে ২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে বিপুলসংখ্যক রেলের টিকিট জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া কালোবাজারির বিভিন্ন আলামতও পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে কমলাপুর রেলস্টেশনের বেসরকারি ট্রেনের বুকিং সহকারী প্রতিনিধিও আছেন। এসব কালোবাজারি আগামী ১০ দিনের প্রায় ৫০০ টিকিট অনলাইন থেকে কেটে রেখেছে। গ্রেপ্তার ১২ জনের মধ্যে রয়েছেনÑ সোহেল রানা, মাহবুবুর রহমান, বকুল হোসেন, শিপন আহমেদ, আরিফ, শাহাদাত হোসেন, মনির, শিপন চন্দ্র দাস, মনির আহমেদ, রাজা মোল্লা, আনিস ও রায়হান। র্যাব জানায়, এরা দীর্ঘদিন রেলওয়ের প্রায় সকল ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি করে আসছিলেন। তারা রেলওয়ের টিকিট বুকিংয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে টিকিট কালোবাজারি করে আসছিলেন।
গত ২১ মার্চ সহজ ডটকমের কর্মীসহ ৯ জন গ্রেপ্তার
এর আগে গত ২১ মার্চ র্যাব-৩ সহজ ডটকমের কর্মীসহ চক্রের ৯ জনকে গ্রেপ্তার করে। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশব্যাপী ট্রেনযাত্রার অন্তত তিন হাজার টিকিট হাতিয়ে নিয়ে কালোবাজারে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল ওই চক্রটির।
দেশব্যাপী ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি ঢালী সিন্ডিকেটের মূলহোতা মিজানের নেতৃত্বে চক্রটি সংঘবদ্ধভাবে দীর্ঘদিন রেলওয়ের প্রায় সব ধরনের ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি করে আসছিল। গ্রেপ্তার মিজান দীর্ঘদিন রেলওয়ের টিকিট বুকিংয়ের জন্য চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। সর্বশেষ ২০২০ সালে রেলওয়ে টিকিটের চুক্তি সহজ ডটকমকে দেওয়া হলে সেখানেও মিজানের চাকরি বহাল থাকে। তিনি বিভিন্ন স্টেশনে থাকা সহজ ডটকমের সদস্য, টিকিট কাউন্টারম্যান ও অন্যান্য কালোবাজারি চক্রের সদস্যদের সমন্বয়ে বিভিন্ন কারসাজির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ টিকিট বিক্রি করতেন। এ ছাড়া সহজ ডটকমের কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের সার্ভার রুমের সার্ভার অপারেটর গ্রেপ্তার নিউটন বিশ্বাস, স্টেশন রিপ্রেজেন্টেটিভ সবুর হাওলাদার এবং পলাতক আব্দুল মোত্তালিব ও আশিকুর রহমানসহ আরও কয়েকজন এই টিকিট কালোবাজারির সঙ্গে জড়িত।