এমপি আনার হত্যা
সুনীল দাস চৌধুরী, খুলনা
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৪ ০৮:৫৪ এএম
আপডেট : ০৪ জুন ২০২৪ ১১:৪৫ এএম
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যার পর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দক্ষিণাঞ্চলসহ সারা দেশের জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে। এ হত্যার সঙ্গে চরমপন্থিদের সম্পৃক্ততা উদঘাটিত হওয়ার পর অনেকেই মনে করছেন, দেশে আবারও তাদের সংঘবদ্ধ অপতৎপরতা শুরু হতে পারে। আনার হত্যা এক্ষেত্রে একটি ‘টেস্ট কেস’- এমন আশঙ্কা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা এবং জনপ্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে সতর্কাবস্থায় চলাফেরা করতে শুরু করেছেন।
উল্লেখ্য, সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম হত্যার ঘটনায় শীর্ষ চরমপন্থি নেতা শিমুল ভূঁইয়া ওরফে সৈয়দ আমানুল্লাহকে গত মে মাসের দ্বিতীয়ার্ধে আটক করা হয়েছে। তথ্যানুসন্ধানে এ-ও উঠে এসেছে, শিমুল ভূঁইয়ার পরিবারের বিভিন্ন সদস্য আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত। তবে আনার হত্যার পর অনেকেই মনে করছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থিদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তা কাজে লাগিয়ে এদের অনেকে পুলিশের খাতা থেকে নাম কাটিয়ে নিলেও তাদের মধ্যে গোপন ও বিশেষ নেটওয়ার্ক রয়েছে। তারা যে বড় ধরনের নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছে, আনার হত্যা তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ নিয়ে বিশেষত দক্ষিণাঞ্চলের জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি হয়েছে।
ভূঁইয়া পরিবার বনাম সরদার পরিবার
খুলনাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থিদের ব্যাপক আধিপত্য থাকার সময় চরমপন্থি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন ফজল মোহাম্মদ শিমুল ভূঁইয়া। জাতীয় পার্টির শাসনামলে ১৯৮৬ সালে ছাত্রাবস্থায় তার রাজনীতি শুরু। বিভিন্ন সময় চরমপন্থি সংগঠন ‘জনযুদ্ধের’ প্রতিষ্ঠাতা তাত্ত্বিক নেতা মোফাখখারুল ইসলাম, বিভাগীয় সামরিক শাখার প্রধান এবং পরবর্তী পার্টিপ্রধান আব্দুর রশিদ মালিথা ওরফে দাদা তপন, আবির হাসান, অমিত হাসান, শোয়েব, সুমন, ইকবাল হোসেন সৈকত, পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) মো. আব্দুর রশিদ, নিউ বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান মৃণাল বিশ্বাস ওরফে দাদা মৃণাল, সহকমান্ডার শৈলেন মন্ডল, সুব্রত বাইনসহ অনেক চরমপন্থি নেতা-সংগঠক নানা ঘটনায় নিহত হলেও শিমুল ভূঁইয়া থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।
স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনার ফুলতলার সরদার পরিবারের পিতা-পুত্রসহ তিনজন চেয়ারম্যানকে খুন করার মধ্য দিয়ে এলাকায় শিমুল তার একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। ফুলতলায় আধিপত্য ও কর্তৃত্ব নিয়ে ভূঁইয়া পরিবারের সঙ্গে সরদার পরিবারের বিরোধ প্রায় তিন যুগেরও বেশি সময়ের। ১৯৯১ সালে একটি সশস্ত্র গ্রুপের নেতা এমরান গাজীকে গুলি করে হত্যা মামলায় ১৯৯৭ সালে জেল থেকে মুক্তি পান শিমুল ভূঁইয়া। এর পরপরই আধিপত্যের সংঘাতে ১৯৯৮ সালের ১৮ আগস্ট খুন হন উপজেলার দামোদর ইউপি চেয়ারম্যান জামায়াত নেতা সরদার আবুল কাশেম। ওইদিন দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কক্ষে বসে থাকা অবস্থায় শীর্ষ সন্ত্রাসী শিমুল ভূঁইয়া ও তার ক্যাডার বাহিনী আবুল কাশেমকে মাথায় গুলি করে হত্যা করে।
এ ঘটনার পর দামোদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন নিহত আবুল কাশেমের বড় ছেলে সরদার আবু সাঈদ বাদল। কিন্তু ২০১০ সালের ১৬ আগস্ট কর্মস্থলে যাওয়ার পথে গুলি ও বোমা হামলায় নিহত হন সরদার আবু সাঈদ বাদল। এ হত্যাকাণ্ডে শিমুল ভূঁইয়া ও তার ক্যাডার বাহিনীর জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
এই দুই হত্যা মামলার বাদী ছিলেন সরদার আবুল কাশেমের ছোট ছেলে জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সরদার আলাউদ্দিন মিঠু। তিনি ফুলতলা উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৭ সালের ২৬ মে রাতে সরদার আলাউদ্দিন মিঠুকে তার অফিসে গুলি করে হত্যা করা হয়। ডিবি পুলিশের পোশাক পরে হত্যাকারীরা কিলিং মিশনে অংশ নেয়। এ হত্যা মামলায় পুলিশি তদন্তে নেপথ্যের গডফাদার হিসেবে ফুলতলার বর্তমান নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান ফুলতলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আকরাম হোসেন এবং শিমুল ভূঁইয়ার ছোট ভাই দামোদর ইউপি চেয়ারম্যান শরিফ মো. শিপলু ভূঁইয়ার নাম উঠে আসে।
শিমুল ভূঁইয়া বাহিনীর হাতে নিহত ফুলতলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা সরদার আলাউদ্দিন মিঠুর ভাই মো. সেলিম সরদার জানান, তার পিতা ও দুই ভাইকে হত্যার সঙ্গে শিমুল ভূঁইয়া ও তার পরিবারের লোকজন জড়িত। শিমুল এলাকার বাইরে অবস্থান করলেও তার বাহিনীর সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন নামে ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরির ছদ্মবেশে এলাকায়ই অবস্থান করে। তারা শিমুল ভূঁইয়ার পক্ষে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজ করে থাকে। এ কারণে ফুলতলাসহ এলাকার মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। এমপি আনার হত্যার ঘটনায় যারা জড়িত, তাদের মধ্যে কসাই জিহাদসহ বেশ কয়েকজনই ওই বাহিনীর সদস্য। আবার তারা এলাকায় ফিরে হত্যাসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করতে পারে বলে তিনিও আশঙ্কা করছেন।
কলকাঠি নাড়েন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে
বিভিন্ন সূত্রমতে, শুধু অপরাধ জগৎকেই নয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচনগুলোতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (জনযুদ্ধ) খুলনা বিভাগীয় সম্পাদক শিমুল ভূঁইয়া। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে রয়েছে তার গভীর সম্পর্ক। ২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় খুলনা জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন শিমুলের স্ত্রী সাবিনা ইয়াসমিন মুক্তা। ওই বছর জেলা পরিষদের ১৫টি সদস্যের প্রতিটি পদে ৪-৫ জন প্রার্থী ছিলেন। ব্যতিক্রম ছিল শুধু ৫ নম্বর ওয়ার্ড। অন্য কোনো প্রার্থী না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন মুক্তা। নির্বাচনে আগ্রহী অন্য প্রার্থীরা জানান, মুক্তার বিপক্ষে স্থানীয় নারী নেত্রী কেয়া খাতুন প্রার্থী হলেও শিমুলের ভয়ে পরে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেন।
তবে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিমুলকে খুশি করতে তার স্ত্রীকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী করার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কয়েকজন নেতা মুখ্য ভূমিকা রাখেন। এদের মধ্যে স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আকরাম হোসেন, বিএনপি নেতা হাসনাত রিজভী মার্শাল ভূঁইয়া, দামোদর ইউপি চেয়ারম্যান ও শিমুলের ছোট ভাই শিপলু ভূঁইয়াসহ বেশ কয়েকজন উল্লেখযোগ্য।
প্রসঙ্গত, হত্যা মামলায় ৯ বছর কারাভোগের পর ২০১৪ সালের অক্টোবর জামিনে মুক্তি পান শিমুলের ছোট ভাই শিপলু ভূঁইয়া। নভেম্বর মাসে মৎস্য প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন তিনি। ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে শিপলু বিজয়ী হন। ২০২১ সালের ইউপি নির্বাচনে আবারও নৌকা নিয়ে বিজয়ী হন তিনি। দুবারই শিপলুকে নৌকা প্রতীক দেওয়া নিয়ে দলের ভেতর-বাইরে তীব্র সমালোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, শিমুলকে খুশি করার জন্য তার ভাইকে নৌকা প্রতীক দিতে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা।
স্থানীয়রা জানান, ফুলতলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কমিটি গঠন, নির্বাচনী প্রার্থী নির্ধারণসহ বড় যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে শিমুল ভূঁইয়ার পরামর্শ নেওয়া হয়। তার অমতে কেউই প্রার্থী বা শীর্ষ পদে আসতে পারেন না। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কোনো নেতাই এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সতর্ক ও আতঙ্কিত জনপ্রতিনিধিরা
উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও কলারোয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফিরোজ আহমেদ স্বপন জানান, এমপি হত্যার মতো এত বড় একটা ঘটনার পর আতঙ্কে থাকাই স্বাভাবিক। তারপরও জনপ্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। এজন্য সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করছেন তিনি।
যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এনামুল হক বাবুল বলেন, ‘জনপ্রতিনিধি হিসেবে প্রত্যন্ত এলাকায় মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। সবসময় তো ঝুঁকিহীন থাকা যায় না। তবে এ ঘটনার পর উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা বেড়েছে। কিছুটা আতঙ্কে আছি। আশা করি, হত্যাকারীরা আইনের আওতায় আসবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে মানুষের উদ্বেগ কিছুটা হলেও কমবে।’
জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান ও খুলনা জেলা জাপার সভাপতি এসএম শফিকুল ইসলাম মধু বলেন, ‘কলকাতায় আমাদের একজন সংসদ সদস্য হত্যার নেপথ্যের কাহিনী শুনে সবাই হতবাক হয়ে পড়েছে। আমরা চরমপন্থিদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার আলামত দেখছি। সরকারের দায়িত্ব এ হত্যাকাণ্ডের বিচার ত্বরান্বিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।’
খুলনা মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘এই সরকারের আমলে কেউই নিরাপদ নয়। আর বিরোধী দল হিসেবে আমাদের তো নিরাপত্তা নেই-ই বলা চলে। শুধু রাজনৈতিক নেতারা নয়Ñ জনপ্রতিনিধিসহ সাধারণ মানুষ কারও বর্তমানে নিরাপত্তা নেই।
খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমডিএ বাবুল রানা বলেন, ‘আমরা স্বচ্ছ রাজনীতি করি। কাজেই আতঙ্ক বোধ করছি না।’ তিনি বলেন, ‘তবে জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে অপরাধমূলক ঘটনা বাড়তে থাকলে এবং সেগুলোর যথাযথ বিচার ও অপরাধীদের শাস্তি না হলে দেশের রাজনীতিবিদদের জন্য খুবই কঠিন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।’
খুলনা পুলিশ সুপারের ভাষ্য
এদিকে খুলনার পুলিশ সুপার মো. সাইদুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘এমপি আনোয়ারুল আজিম আনার হত্যার সূত্র ধরে খুলনাঞ্চলে চরমপন্থি ও সন্ত্রাসীদের পুনরায় সক্রিয় হওয়া বা অপতৎপরতা চালানোর কোনো আশঙ্কা নেই। খুলনার ফুলতলাসহ একসময়ের চরমপন্থি অধ্যুষিত এলাকাগুলো এখন শান্ত। খুলনার পুলিশ বিভাগ চরমপন্থি বা কোনো সন্ত্রাসী গ্রুপ যেন আবারও মাথাচাড়া দিয়ে না উঠতে পারে, সে বিষয়ে সজাগ রয়েছে। বিভিন্ন সন্ত্রাসী মামলায় অভিযুক্তদের আটকে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত আছে। কেউ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করলে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।’
পুলিশ সুপার বলেন, ‘যদি কোনো জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক ব্যক্তির কোনো বিষয়ে আশঙ্কা থাকে, তবে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানিয়ে সহায়তা নিতে পারবেন।’ জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পুলিশ বিভাগ সবসময় সচেষ্ট রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তিন দশকে শতাধিক রাজনীতিক, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিক হত্যা
ভারতের নকশালবাড়ি আন্দোলনের ঢেউয়ে বিশেষত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চরমপন্থি রাজনীতির উত্থান ঘটে। বিশেষ করে খুলনা, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, মাগুরা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাটসহ খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় চরমপন্থিদের তৎপরতা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। চরমপন্থি দলের সন্ত্রাসীদের হাতে তিন দশকে খুলনাঞ্চলে অর্ধশতাধিক জনপ্রতিনিধিসহ শতাধিক রাজনৈতিক নেতা ও সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
১৯৯১ সালে ডুমুরিয়ার রুদাঘরা ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থী, একটি সশস্ত্র গ্রুপের নেতা ইমরান হোসেন গাজী ও ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তোজাম্মেল হোসেন সরদারকে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। ১৯৯২ সালের ৩১ জুলাই খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বামপন্থি রাজনীতিবিদ কমরেড রতন সেনকে হত্যা করা হয়। ১৯৯৫ সালের ২৫ এপ্রিল খুলনা মহানগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও প্রভাবশালী শেখ আবুল কাশেমকে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করা হয়। ২০০০ সালের ১১ আগস্ট দিনে-দুপুরে হত্যা করা হয় খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগে যোগদানকারী প্রভাবশালী নেতা এসএমএ রবকে। তিনি খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ছিলেন।
২০০৩ সালের ২৫ আগস্ট নিজ বাড়ির অনতিদূরে খুন হন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুরুল ইমাম। ২০০৯ সালে হত্যার শিকার হন যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও খুলনা মহানগরীর ২৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শহীদ ইকবাল বিথার। ২০১৬ সালে নিহত হন ফুলতলা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান সরদার আলাউদ্দিন মিঠু।
এছাড়া খুলনায় হুমায়ুন কবির বালু, মানিক চন্দ্র সাহা, বেলাল উদ্দিন ও আব্দুর রশিদ খোকন; যশোরে শামসুর রহমান কেবল ও সাইফুল ইসলামসহ ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা ও মাগুরায় বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও চরমপন্থি সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন।
হত্যার শিকার কয়েকজন উল্লেখযোগ্য জনপ্রতিনিধি
এছাড়াও তিন দশকে খুলনাঞ্চলে অসংখ্য জনপ্রতিনিধি হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জনপ্রতিনিধিরা হলেনÑ মেহেরপুরের গাংনী পৌর চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম এবং ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মুজিবনগর উপজেলার মহাজনপুরের বাগবুল ইসলাম বাবলু, গাংনী উপজেলার কাজীপুরের আব্দুল বাকী; চুয়াডাঙ্গা জেলার কালিদাসপুরের মেহের আলী, জেহালার মোহাম্মদ কচি, হারদীর মানু, আন্দুলবাড়িয়ার বাহারুল ইসলাম, জামিল ও আলী হোসেন, খাদিমপুরের আতিয়ার রহমান, সরোজগঞ্জের নূর আলী; কুষ্টিয়া জেলার ঝাউদিয়ার আব্দুল আজিজ, আলী আকবার, খয়বার হোসেন, কয়ার আমু হোসেন, কুমারখালীর হেরার উদ্দীন, হাট হরিশপুরের সাচ্চু; নড়াইল জেলার বিচালীর আব্দুল মান্নান, লোহাগড়া উপজেলার মল্লিকপুরের সিরাজুল ইসলাম; ঝিনাইদহের মহেশপুরের রফিকুল ইসলাম; এবং সাতক্ষীরার গহর আলী ও মিজানুর রহমান।
নিহত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে আরও রয়েছেন- খুলনার তেরখাদা উপজেলার সাটিয়াদহের চান মিয়া সিকদার, ডুমুরিয়া সদরের আব্দুল মজিদ ও কবিরুল ইসলাম, মাগুরখালীর অতুল সাহা, দামোদরের সরদার আবুল কাশেম, রুদাঘরার তোজাম্মেল হোসেন সরদার, আটরার শেখ সিরাজুল ইসলাম, শেখ আব্দুর রউফ, কয়লাঘাটের ইন্তাজ আলী, ফুলবাড়ির রুহুল আমীন, নৈহাটির গোলাম ফারুক ও আবুল হোসেন, সুরখালীর মোস্তফা জাহান আলী, দৌলতপুরের আবু গাজী, হাবিবুর রহমান, দিঘলিয়ার আব্দুল গফুর, ফুলবাড়িয়ার ইমরান গাজী, ভান্ডারকোটের ইউসুফ মোল্লা, দেলুটির রবীন্দ্রনাথ মন্ডল ও দামোদরের সরদার আবু সাঈদ বাদল।
আরও নিহত হয়েছেনÑ বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান কালীদাস বড়াল, ফকিরহাটের সদর ইউপি চেয়ারম্যান খান জাহিদ হাসান, মোংলার বুড়িডাঙ্গার চেয়ারম্যান পিন্টু, ডেমা ইউপির আক্তার হোসেন, কালুবাড়িয়ার আতিয়ার রহমান, রামচন্দ্রপুরের রশিদ খান, তেলিগাতির সাদু খাঁ, মানসা বাহিরদিয়ার আতর আলী, বাইনতলার হাবিবুর রহমান, যশোরের চৌগাছার সিংঝুলির আশরাফ হোসেন, রাইপুরের ওয়াজেদ হোসেন, কাওসার হোসেন, নারকেলবাড়িয়ার জামিল মাস্টার, বিদ্যানন্দকাঠির আনছার আলী, জামদিয়ার শেখ সফিউদ্দীন, বসুন্দিয়ার মাজেদ শেখ, গঙ্গানন্দপুরের আব্দুল জলিল, শার্শার পুটখালীর নূরুদ্দীন, বেনাপোলের আব্দুল করিমসহ অসংখ্য জনপ্রতিনিধি।
হত্যার শিকার রাজনৈতিক সংগঠক
অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মীও চরমপন্থিদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে রয়েছেনÑ যশোরের আওয়ামী লীগ নেতা প্রকাশ চন্দ্র, বিএনপি নেতা আনোয়ারুল ইসলাম, ছাত্রলীগ নেতা রিপন, তরুণ লীগ নেতা কামরুজ্জামান ওরফে বাঁশি রিপন ও বিএনপি নেতা নাজমুল ইসলাম। এছাড়া সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন মেহেরপুরের আওয়ামী লীগ নেতা শহিদুল ইসলাম ও বিএনপি নেতা সেন্টু মিয়া; খুলনা মহানগরীর ছাত্রদল নেতা রায়হানুল ইসলাম, খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার যুবলীগ নেতা বেলাল, শ্রমিক লীগ কর্মী দিপু, আওয়ামী লীগ নেতা ইউপি চেয়ারম্যান গাজী আব্দুল হালিম প্রমুখ।
সবশেষে সংসদ সদস্য আনার হত্যার পর এ অঞ্চলের সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং সবাই সতর্ক অবস্থায় চলাফেরা করছেন।