শহিদুল ইসলাম রাজী
প্রকাশ : ০২ জুন ২০২৪ ০৮:৫২ এএম
ঢাকার দোহার উপজেলার বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম জমি বন্ধক রেখে এবং ধার করে মালয়েশিয়া যাওয়ার টাকা জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত দেশে যাওয়া হলো না তার। স্বপ্নের দেশে কখনও যেতে পারবেন কি না সেটাও জানা নেই। হাজারো অনিশ্চয়তা নিয়ে গতকাল শুক্রবার মধ্যরাতে বাড়িতে ফিরেছেন তিনি। এখন ঋণ শোধ করবেন কীভাবে, সেই চিন্তায় অস্থির সময় পার করছে পরিবার।
নয়াপল্টনের একটি রিক্রুটিং এজেন্সিকে তিন দফায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা দিয়েছেন জয়পুরহাটের দোয়ানীঘাটের বাসিন্দা ফেরদৌস। ঢাকায় এসে কয়েকদিন ধরেই মালয়েশিয়ার ফ্লাইটের টিকিটের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু এজেন্সিটি তার এবং আরও ১৫ জনের টিকিটের ব্যবস্থা করতে পারেনি। শুক্রবার রাত ১২টার পরই মালয়েশিয়ায় প্রবাসী শ্রমিকদের জন্য সেখানকার দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত ফেরদৌসকে বাড়িতে ফিরে যেতে হয়েছে।
নিজের শেষ সম্বলটুকু বিক্রি করে ৬ লাখ টাকা জোগাড় করেছিলেন নোয়াখালীর ইউসুফ। প্রায় পাঁচ মাস আগে রিক্রুটিং এজেন্সিকে পুরো টাকা শোধ করলেও শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি মালয়েশিয়ায়। গত দুই দিন ধরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অপেক্ষা করে শেষমেশ কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছেন। এই টাকা কীভাবে উদ্ধার করবেন, সেটাই এখন চিন্তা।
সাইদুল, ফেরদৌস, ইউসুফই নয়Ñ ভাগ্য পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে মালয়েশিয়া যেতে চাওয়া কয়েক হাজার বাংলাদেশি নাগরিক ব্যর্থ মনোরথে অনেকটা অনিশ্চয়তা নিয়েই ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়েছেন।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েকটি এজেন্সির গাফিলতির জন্য কমপক্ষে ৩১ হাজার ৭০১ জন শ্রমিক মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পাননি। প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা কত? তার হিসাবও পাওয়া যায়নি কারও কাছে। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) মহাসচিব জানিয়েছেন, ‘প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও টিকিট না পাওয়ায় ৩ থেকে ৪ চার হাজার বাংলাদেশী কর্মী মালয়েশিয়া যেতে পারেননি।’
এদিকে ভিসা ইস্যু হওয়া শ্রমিকদের জটিলতা নিরসনে চেষ্টা চলছে। ভিসা পেয়েও যারা মালয়েশিয়া যেতে পারেননি, তাদের দ্রুত মালয়েশিয়া নিতে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. শামীম আহসান।
অপরদিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে যে বা যারা সংকট সৃষ্টি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী। এ বিষয়ে তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
আজ রবিবার প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক।
অনিয়মের ঘটনায় চার বছর কর্মী পাঠানো বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে বাংলাদেশিদের জন্য আবার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হয়। প্রতিবারের মতো এবারও গড়ে ওঠে বিশেষ সিন্ডিকেট। এই প্রেক্ষাপটে গত মার্চে মালয়েশিয়া জানায়, দেশটি আপাতত আর শ্রমিক নেবে না। যারা কাজের অনুমোদন ও ভিসা পেয়েছেন, তাদের ৩১ মের মধ্যে দেশটিতে প্রবেশের বিষয়ে বলা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত গত ১৬ মে পত্রিকায় জরুরি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। কিন্তু বিষয়টি বাংলাদেশে অবস্থানরত অনেক প্রবাসীকর্মীর নজরে আসেনি। পরবর্তীতে মে মাসের ২০ তারিখের পর বিষয়টি জানাজানি হলে মালয়েশিয়া যেতে শুরু হয় হুলস্থুল কাণ্ড। শেষ মুহূর্তে কর্মীদের মালয়েশিয়া পাঠাতে গতকাল শুক্রবার পরিচালনা করা হয়েছে ১২টি ফ্লাইট। এসব ফ্লাইটে অন্তত ২ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া গেছেন বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক।
এছাড়া গতকাল বিমানবন্দরে বিভিন্ন এজেন্সির ইস্যু করা ভুয়া টিকিট নিয়েও হাজির হন অনেক কর্মী। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালয়েশিয়া যেতে বিভিন্ন এজেন্সিকে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে অন্তত ছয় মাস আগে। এতদিন পেরিয়ে গেলেও এজেন্সিগুলো ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে পারেনি। শেষ মুহূর্তে ভুয়া টিকিট ইস্যু করে তাদেরকে বিমানবন্দরে পাঠিয়েছে। সেখানে গিয়েই তারা জানতে পারেন এ টিকিটগুলো আসল নয়, নকল।
জয়পুরহাটের ফেরদৌস জানান, প্রবাসীকল্যাণ ব্যাংক থেকে ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন তিনি। সাত মাস আগে রিক্রুটিং এজেন্সিকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা দিয়েছেন। গত ২৫ মে দিয়েছেন আরও দেড় লাখ। ঢাকা এসে আবার দিয়েছেন ৫০ হাজার। এছাড়া বেশ কয়েকবার জয়পুরহাট থেকে ঢাকায় যাতায়াত বাবদ এর মধ্যেই খরচ হয়েছে অন্তত ৩০ হাজার টাকা। এর আগে ১৬ বছর মালয়েশিয়া ছিলেন বলে জানান ফেরদৌস। তবে চলে আসতে বাধ্য হন তিনি। এত বছর বিদেশে থেকেও তেমন কোনো সঞ্চয় নেই তার। ভিটেমাটি ছাড়া এখন কোনো সম্পত্তিও নেই।
বিমানবন্দরে অবস্থানরত কর্মী মিনহাজ বলেন, আমার কাছ থেকে ৫ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছে এজেন্সি। এরপর গত পাঁচ দিন ধরে এয়ারপোর্টে এসে ভোগান্তিতে পড়েছি। অপর এক কর্মী রাইসুল জানান, সাড়ে ৬ লাখ টাকা দিয়েছি এজেন্সিকে। এরপর একবার হেড অফিস, একবার এয়ারপোর্ট, আরেকবার টিকিটের অফিসে যাওয়া-আসা করছি। তারা অনলাইনে একটি টিকিট পাঠিয়েছে। কাউন্টারে গিয়ে জানলাম, এই টিকিট ভুয়া। এ রকম কয়েক হাজার মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, গত ২১ মে পর্যন্ত প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় ৫ লাখ ২৩ হাজার ৮৩৪ জন কর্মীকে মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমোদন দেয়। এরপর আর অনুমোদন দেওয়ার কথা না থাকলেও মন্ত্রণালয় আরও ১ হাজার ১১২ জনকে অনুমোদন দেয়। গত বৃহস্পতিবার অর্থাৎ ৩০ মে পর্যন্ত ৫ লাখ ২৪ হাজার ৯৪৬ জন বাংলাদেশি মালয়েশিয়ার ভিসা পেয়েছেন। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় গেছেন ৪ লাখ ৯১ হাজার ৭৪৫ জন।
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বাংলাদেশ থেকে মাত্র ১ হাজার ৫০০ জন ১২টি ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হিসাব অনুযায়ী, মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ হয়নি ৩১ হাজার ৭০১ জনের। তবে প্রকৃতপক্ষে কতজন কর্মী যেতে পারেননি, তার সঠিক হিসাবও কেউ জানেন না।
টাকা দেওয়ার পরও কর্মীরা কেন মালয়েশিয়া যেতে পারেননি তা তদন্ত করে দেখবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। গতকাল শনিবার সাংবাদিকদের একথা জানান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী। এ সময় তিনি রিক্রুটিং এজেন্সির গাফিলতিকে দায়ী করে বলেন, মালয়েশিয়া সরকারের অনুমোদিত কোটা অনুযায়ী কর্মী পাঠাতে আমরা বায়রার সঙ্গে বৈঠক করেছি। তাদের সঙ্গে বারবার বসে আলোচনা করে কর্মীর তালিকা চেয়েছি। মে মাসের ১৫ তারিখে মিটিং করে তাদেরকে বলেছি, ভিসা পাওয়ার পর কতজন যাওয়া এবং কতজনের ভিসা আসা বাকি, এগুলোর পূর্ণাঙ্গ তালিকা দিতে। কিন্তু তারা তা তৈরি করেনি, আমাদেরকেও দেয়নি। তারা শেষ সময়ে আমাদের জানায়, কর্মী রেডি আছে। কিন্তু ফ্লাইট পাওয়া যাচ্ছে না। আমি তখন বিমানমন্ত্রী, বিমানের এমডি, সিভিল এভিয়েশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। এরপর ২২-২৩টি ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর বাইরে শিডিউল ফ্লাইট তো আছেই।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, এত ফ্লাইট দেওয়ার পরও কর্মী যাওয়া শেষ হয়নি। কী কারণে এই ভোগান্তির সৃষ্টি তা আমরা তদন্ত করব। তদন্তে যাদের গাফিলতি এবং দোষ প্রমাণ হবে, তাদের আইন অনুযায়ী শাস্তির আওতায় আনা হবে। যারা টাকা দিয়েছেন কিন্তু যেতে পারেনি, তারা আমাদের কাছে অভিযোগ জানালে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব।
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, মালয়েশিয়া যেতে ব্যর্থ শ্রমিকরা বিমানবন্দর ত্যাগ করায় এখানকার পরিস্থিতি এখন শান্ত।
বায়রা মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও টিকিট না পাওয়ায় তিন-চার হাজার বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মী মালয়েশিয়া যেতে পারেননি। আজ (শনিবার) আমাদের অফিস বন্ধ থাকায় কতজন বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন এবং কতজন যেতে পারেননি তার চূড়ান্ত সংখ্যা আমরা এখনও পাইনি। আমরা আগামীকাল (আজ) বলতে পারব।
জটিলতা নিরসনে চেষ্টা চলছে
ভিসা ইস্যুতে শ্রমিকদের মালয়েশিয়া যাওয়ার বিষয়ে জটিলতা নিরসনে কাজ চলছে। এছাড়া ভিসা পেয়েও যারা যেতে পারেননি, তাদের দ্রুত নেওয়ার ব্যাপারে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. শামীম আহসান। গত শুক্রবার রাতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে যান তিনি। রাতভর বিমানবন্দরে অবস্থান করে সেখানকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন কাউন্সিলর লেবার সৈয়দ শরিফুল ইসলাম, প্রথম সচিব প্রেস সুফি আব্দুল্লাহিল মারুফ ও ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট শিহাব হোসাইন। হাইকমিশনার বলেন, দূতাবাসের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ৩১ মে বাংলাদেশ থেকে যারা মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন, ১২টার পরও তারা ইমিগ্রেশন পার হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, ৫ লাখ ২৭ হাজারের বেশি ডিমান্ড লেটার সত্যয়ন করেছে হাইকমিশন। এ পর্যন্ত ৪ লাখ ৭২ হাজারের বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় পৌঁছেছেন। আমরা নিয়োগ কর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি, তারা যেন প্রতিশ্রুত কাজে যোগদান করতে পারেন। আমাদের প্রচেষ্টা চলমান রয়েছে।
কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জিএম কাদেরের
ভিসা পেয়েও প্রায় ৩১ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ (জিএম) কাদের। গতকাল শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন এই নেতা।
তিনি বলেন, কাদের গাফিলতিতে শ্রমবাজারে এত বড় বিপর্যয় হলো, তা বের করতে উচ্চপদস্থ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।