সাক্ষাৎকার: রাফাত উল্লা খান
প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২ ঘণ্টা আগে
আপডেট : ২ ঘণ্টা আগে
আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও রাফাত উল্লা খান
এসএমই খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমএসএমইর বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও রাফাত উল্লা খান
প্রশ্ন: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সিএমএসএমই খাতের বর্তমান অবদানকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?
উত্তর: বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যদি একটি বিশাল বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করি, তাহলে সিএমএসএমই খাত হলো তার শিকড়। শিকড় যেমন চোখে দেখা যায় না কিন্তু পুরো বৃক্ষকে বাঁচিয়ে রাখে, ঠিক তেমনি সিএমএসএমই খাত দেশের অর্থনীতির ভেতরের শক্তিকে ধারণ করে আছে। আমাদের দেশের কর্মসংস্থানের একটি বড় অংশ এই খাতের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। শহরের ছোট কারখানা, বাজারভিত্তিক ব্যবসা, গ্রামীণ উৎপাদনমুখী উদ্যোগ, কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্পÑ সবকিছু মিলিয়ে সিএমএসএমই খাত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করছে। একই সঙ্গে এটি নতুন উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় ভিত্তি হচ্ছে এই খাত। কারণ বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান সাধারণত নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত থাকে, কিন্তু সিএমএসএমই দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে দেয়। ফলে আঞ্চলিক বৈষম্য কমে, স্থানীয় সম্পদের ব্যবহার বাড়ে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- নারী, তরুণ এবং প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য এই খাত একটি বাস্তব সুযোগের ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তাই আমি সিএমএসএমই খাতকে শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত হিসেবে দেখি না; বরং বাংলাদেশের টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করি।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পোদ্যোক্তা তৈরিতে সিএমএসএমই খাতকে কেন ‘উদ্যোক্তা তৈরির সবচেয়ে বড় প্ল্যাটফর্ম’ বলা হয়?
উত্তর: এর সবচেয়ে বড় কারণ হলো, প্রায় সব বড় ব্যবসার শুরুটাই ছোট থেকে। আজ যেসব প্রতিষ্ঠান দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে, তাদের অনেকেই একসময় ক্ষুদ্র বা মাঝারি উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল। সিএমএসএমই খাত একজন উদ্যোক্তাকে ব্যবসার বাস্তব শিক্ষা দেয়। এখানে তিনি শেখেন বাজার বুঝতে, ঝুঁকি নিতে, সীমিত সম্পদ দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে এবং গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী নিজেকে পরিবর্তন করতে। এই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তীতে বড় ব্যবসা গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি করে। আরেকটি বিষয় হলো, এই খাতে প্রবেশের জন্য সব সময় বড় পুঁজি প্রয়োজন হয় না। একজন মানুষের যদি একটি ভালো ধারণা, পরিশ্রম করার মানসিকতা এবং এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা থাকে, তাহলে তিনি একটি ছোট উদ্যোগ দিয়েই ব্যবসায়িক যাত্রা শুরু করতে পারেন। এ কারণেই আমি মনে করি, বাংলাদেশের আগামী দিনের শিল্পোদ্যোক্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এবং ব্যবসায়িক নেতা আজকের সিএমএসএমই খাত থেকেই উঠে আসবেন।
প্রশ্ন: দেশের নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনি মনে করেন?
উত্তর: বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা শুধু অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক এখন ব্যবসায়িক উন্নয়নের অংশীদার। অনেক তরুণ উদ্যোক্তার উদ্ভাবনী চিন্তা রয়েছে, নতুন ব্যবসায়িক মডেল রয়েছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় মূলধনের অভাবে তারা এগোতে পারেন না। এই অবস্থায় ব্যাংকিং খাত তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। তবে আমার বিশ্বাস, শুধু অর্থ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা পরিকল্পনা বোঝা, সঠিক অর্থায়ন কাঠামো নির্বাচন করা, আর্থিক শৃঙ্খলা সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া এবং ব্যবসার বিভিন্ন পর্যায়ে সহায়তা করাÑ এসব ক্ষেত্রেও ব্যাংকের ভূমিকা থাকা উচিত। আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই কাজ করছে। আমরা চাই নতুন উদ্যোক্তারা ব্যাংককে শুধুমাত্র অর্থের উৎস হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে দেখুক।
প্রশ্ন: আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি সিএমএসএমই খাতকে কেন অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করে?
উত্তর: আমাদের কাছে সিএমএসএমই খাত শুধুমাত্র একটি ব্যবসায়িক সুযোগ নয়; এটি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান রাখার একটি কার্যকর মাধ্যম। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের মূল দর্শনের মধ্যে রয়েছে- সম্পদের সুষম বণ্টন, উৎপাদনমুখী অর্থায়ন এবং সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন। সিএমএসএমই খাত এই দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেখা যায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র হচ্ছে এই খাত। তাই শুরু থেকেই আমরা এটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আসছি। বর্তমানে আমাদের সিএমএসএমই বিনিয়োগ পোর্টফোলিও প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা এবং এর আওতায় ৯ হাজার জনেরও বেশি উদ্যোক্তা আর্থিক সেবা গ্রহণ করছেন। এই সংখ্যা আমাদের জন্য কেবল একটি অর্জন নয়; বরং দেশের উদ্যোক্তাদের প্রতি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
প্রশ্ন: বর্তমানে আপনার ব্যাংকের সিএমএসএমই বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর আকার কত এবং এ খাতে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
উত্তর: বর্তমানে আমাদের সিএমএসএমই বিনিয়োগ পোর্টফোলিও প্রায় ১০ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা, যা আমাদের মোট বিনিয়োগ পোর্টফোলিওর প্রায় ২২ শতাংশ। আমরা এই খাতকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করি। সে কারণে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এই অংশকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তা, তরুণ উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, গ্রামীণ উদ্যোগ এবং নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসাগুলোকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবা ও সহজতর অর্থায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরও বেশি উদ্যোক্তাকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন, ক্ষুদ্র ও উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জন্য আপনার ব্যাংকের বিশেষ বিনিয়োগ পণ্য বা আর্থিক সেবাগুলো সম্পর্কে জানতে চাই।
উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন এক রকম নয়। একজন নতুন উদ্যোক্তার চাহিদা যেমন ভিন্ন, একজন প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তার প্রয়োজনও তেমনি আলাদা। এই বাস্তবতা বিবেচনা করেই আমরা কয়েকটি বিশেষায়িত বিনিয়োগ পণ্য চালু করেছি। এর মধ্যে ‘তিজারা’ সাধারণ সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে। ‘নিসা’ বিশেষভাবে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজাইন করা হয়েছে এবং এটিও জামানতবিহীন। অন্যদিকে ‘আত-তাওফিক’ এবং ‘আল-আওয়ানা’ জামানতের বিপরীতে বৃহত্তর বিনিয়োগ সুবিধা প্রদান করে। এর ফলে উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসার আকার, প্রয়োজন এবং সক্ষমতা অনুযায়ী উপযুক্ত অর্থায়ন পণ্য নির্বাচন করতে পারেন। এর পাশাপাশি ট্রেড ফাইন্যান্স, ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট, ডিজিটাল ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং এবং বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের সুবিধাও প্রদান করা হচ্ছে।