গোলাম কিবরিয়া
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:৩৭ পিএম
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৯:৫৪ পিএম
নারী স্বাস্থ্য বিষয়ে সমাজজুড়ে এখনও গভীর সচেতনতার অভাব রয়ে গেছে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘদিনের শোষণ ও বৈষম্যের ইতিহাস। বাস্তবতা হলো- স্বাস্থ্যসেবার অগ্রাধিকার তালিকায় নারী প্রায়শই একেবারে শেষ সারিতে পড়ে। অসুস্থ হলেও নারীকে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার বিষয়টি পরিবারে ততটা গুরুত্ব পায় না, বরং তা অনেক সময় অবহেলিত থেকেই যায়।
ঘর ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা যে বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালন করে, তার নেতিবাচক প্রভাব তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়লেও নারী নিজে, পরিবার কিংবা সমাজÑ কেউই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে না। বরং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের নানা স্বার্থ রক্ষায় নারীকে এক ধরনের ‘ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যার বিনিময়ে তার নিজের সুস্থতা উপেক্ষিতই থেকে যায়।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, কয়েকটি জটিল ও কঠিন রোগে নারীরা বেশি ভুগছে, যেমনÑ গত ২০ বছরে হৃদরোগে মৃত্যুর হার বাংলাদেশি পুরুষের ক্ষেত্রে ৩২ গুণ এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৪৭ গুণ বেড়েছে। কিডনি রোগে আক্রান্তের হার নারীর ক্ষেত্রে ১৪ শতাংশ এবং পুরুষের আক্রান্তের হার ১২ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারীর স্বাস্থ্যহানি ঘটে, যেমনÑ লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় দেশের উপকূলীয় এলাকায় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে (জরায়ুর ক্যানসার, বন্ধ্যাত্ব ইত্যাদি)(সূত্র : নারীপক্ষ)। দুঃখজনক হলেও সত্য দেশের স্বাস্থ্যনীতিতে নারীর বিষয়টি মূলত প্রজনন স্বাস্থ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও প্রজন্ম রক্ষায় নারীর ভূমিকা অপরিসীম হলেও তার সার্বিক শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় যথাযথ গুরুত্ব পায় না। উপরন্তু, প্রচলিত সামাজিক ধারণা, সংস্কার ও চর্চার প্রভাবে নারী নিজেও অনেক সময় নিজের স্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার দিতে শেখে না।
পুষ্টিবিদ সামিনা জামান কাজরী বলেন, বাংলাদেশের কিশোরী ও নারীদের পুষ্টিগত অবস্থা দারিদ্র্য, অল্প বয়সে বিয়ে, বারবার গর্ভধারণ, সীমিত খাদ্যবৈচিত্র্য এবং বিভিন্ন মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টস দ্বারা প্রভাবিত। অনেকেই অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা ও শরীরের কম ওজনে ভোগেন। অন্যদিকে নগরায়ণের ফলে নারীদের মধ্যে অতিরিক্ত ওজন ও অসামঞ্জস্য খাদ্যাভ্যাসজনিত রোগের সমস্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, গর্ভবতী নারী ও দুগ্ধদানকারী মায়েদের পুষ্টিগত চাহিদা পূরণ সুস্থ গর্ভাবস্থা, শিশুর সঠিক বৃদ্ধি এবং মা ও শিশুর দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক খাদ্য নির্বাচন, পুষ্টি শিক্ষা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ এই লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সম্প্রতি সংক্রমণমুক্ত ও নিরাপদ পিরিয়ড নারীর অধিকার প্রসঙ্গে অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. ফারহানা দেওয়ান বলেন, ‘একসময় আমরা মেয়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পেতাম। সে সময়টা আমরা পার করে এসেছি; কিন্তু এখনও অনেক দূর যাওয়া বাকি রয়েছে। আমাদের কাছে রোগী এলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই মাসিক সংক্রান্ত বিষয়গুলো জিজ্ঞাসা করি। কী ধরনের ন্যাপকিন তারা ব্যবহার করছেন এবং এতে কোনো সমস্যা হচ্ছে কি নাÑ সে বিষয়েও জিজ্ঞাসা করে থাকি। এ ক্ষেত্রে অনেকেই কাপড় ব্যবহারের কথা বলে থাকেন। এটি নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে এখনও একটি বড় সমস্যা। এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে যে এ কাপড়টি তারা পুনরায় ব্যবহার করছেন কি না, করলে কীভাবে তা পরিষ্কার করছেন। অনেক নারীই দীর্ঘক্ষণ ধরে একই ন্যাপকিন ব্যবহার করেন, যা মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ঝুঁকি তৈরি করছে।’
পিরিয়ড বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করছে ‘ঋতু’। মেয়েদের পিরিয়ড সংক্রান্ত যে ট্যাবুগুলো সমাজে এখনও বিদ্যমান, সেগুলো নিয়ে কীভাবে কাজ করছে ঋতুÑ এমন প্রশ্নের উত্তরে ঋতুর ফাউন্ডার অ্যান্ড চেয়ারম্যান শারমিন কবির বলেন, আমাদের সমাজে পিরিয়ড এখনও একটি গভীরভাবে প্রোথিত ট্যাবু। এটি এমন একটি বিষয়, যাকে শুধু মেয়েদের ব্যাপার বলে চিহ্নিত করে আলোচনা থেকে দূরে রাখা হয়। স্কুলে পিরিয়ড নিয়ে আলোচনা মানেই ছেলেদের ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া, শিক্ষকদের পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় এড়িয়ে যাওয়া, এমনকি জাতীয় কারিকুলাম থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষায় প্রশ্ন না আসাÑ সব মিলিয়ে বিষয়টি যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই আড়ালে রাখা হয়। এই নীরবতাই পিরিয়ডকে সমাজে আরও বেশি ট্যাবু করে তুলেছে। এই বাস্তবতা বদলানোর লক্ষ্য নিয়েই ২০১৬ সাল থেকে ঋতু কাজ করে যাচ্ছে। ঋতুর লক্ষ্য পিরিয়ড ডিসকাশনকে জেন্ডার নিউট্রাল করা। পিরিয়ড কোনো লজ্জার বিষয় নয়,
এটি একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও শারীরিক প্রক্রিয়া। তাই এই বিষয়টি শুধু মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ছেলেদেরও এই আলোচনার অংশ হতে হবে। কারণ সবাই জানলে, বুঝলে তবেই ট্যাবু ভাঙবে। এই ভাবনা থেকেই ঋতু তাদের ওয়ার্কশপগুলোতে ছেলে ও মেয়েদের একসঙ্গে নিয়ে পিরিয়ড নিয়ে আলোচনা করে। খুব সহজ, বৈজ্ঞানিক ও স্বাভাবিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়Ñ পিরিয়ড কী, কেন হয়, শরীরে কী পরিবর্তন আসে।
পিরিয়ড নিয়ে কথা বলার আরেকটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ঋতু তৈরি করেছে একটি কমিক বই। গল্পের আকারে সাজানো এই বইটি ব্যবহার করে গ্রুপ ডিসকাশন ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ওয়ার্কশপ পরিচালনা করা হয়। এতে কিশোর-কিশোরীরা সহজে যুক্ত হতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং সংকোচ কাটিয়ে উঠতে পারে। পিরিয়ড ট্যাবুর পেছনে বড় একটি কারণ হলো স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার লজ্জা ও আর্থিক অক্ষমতা। এই সমস্যা সমাধানে ঋতু নিয়ে এসেছে রিইউজেবল স্যানিটারি ন্যাপকিন, যা ধুয়ে বারবার ব্যবহার করা যায়। এটি যেমন খরচ কমায়, তেমনই পিরিয়ড ম্যানেজমেন্টকে করে আরও সহজ ও সম্মানজনক।
সময়ের চাহিদায় স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখন নারীর স্বাস্থ্যসেবায় ডিজিটাল প্রযুক্তি ও টেলিমেডিসিন ব্যবহারে বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে কথা হয় হেড, হেলথকেয়ার এন্টারপ্রাইজ, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (রিটায়ার্ড) ড. তৌফিকুল হাসান সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, নারীর স্বাস্থ্যসেবাকে আরও সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে ব্র্যাক হেলথকেয়ার ডিজিটাল প্রযুক্তি ও টেলিমেডিসিন ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। অনলাইনে চিকিৎসকের পরামর্শ, ডিজিটাল প্রেসক্রিপশন, রিপোর্ট সংরক্ষণ ও ফলোআপ সেবার মাধ্যমে গর্ভবতী নারী, কর্মজীবী নারী এবং দূরবর্তী এলাকার নারীরা ঘরে বসেই নিরাপদ ও মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন। ডিজিটাল প্লাটফর্ম নারীদের গোপনীয়তা ও সম্মান বজায় রেখে ধারাবাহিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্র্যাক হেলথকেয়ার একটি জীবনচক্র-ভিত্তিক ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ব্র্যাক হেলথকেয়ার মাতৃত্বকালীন সেবা, নিরাপদ প্রসবপূর্ব ও পরবর্তী চিকিৎসা, পুষ্টি পরামর্শ, পরিবার পরিকল্পনা এবং সার্ভিক্যাল ক্যানসার স্ক্রিনিং কার্যক্রম পরিচালনা করছে। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য ও হরমোনজনিত সমস্যায় বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে নারীদের জন্য একটি সমন্বিত ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ন্যাশনাল ইয়ুথ কনফারেন্স অন ফ্যামিলি প্ল্যানিং-২০২৫-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লেনারি সেশনে মেরি স্টোপস বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কিশোয়ার ইমদাদ বলেন, ‘পরিবার পরিকল্পনা নিশ্চিত করা মানেই নারীর নিজের শরীর, জীবন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিশ্চিত করা। এটি নারীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে নারীর শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো বাল্যবিয়ে। বাল্যবিয়ে শুধু একটি মেয়ের শৈশব কেড়ে নেয় না, বরং তার স্বাস্থ্য, আত্মবিশ্বাস ও সম্ভাবনাকেও ধ্বংস করে দেয়।’
দেশে বিয়ের পর পরিকল্পিত সময়ের আগেই ৪৭ শতাংশ নারী গর্ভধারণ করছেন। গ্রামের তুলনায় শহরের বস্তিতে গর্ভধারণের এই হার তিন গুণের বেশি। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে নববিবাহিত দম্পতিদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার সংক্রান্ত প্রেক্ষাপট ও চাহিদা নিরূপণ’ শীর্ষক এই গবেষণা দুই বছর ধরে করা হয়েছে। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, বিয়ের পরপরই গ্রামে ৬০ শতাংশ এবং শহরের বস্তিতে ৬৬ শতাংশ নারী পড়াশোনা বন্ধ করেছেন। এর পেছনে স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আপত্তি, মা-বাবার সিদ্ধান্ত, বিয়ের পর বাসস্থান পরিবর্তন, সামাজিক রীতি এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা কাজ করেছে। এর ফলে নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। নারীর স্বাস্থ্য-অধিকার বিষয়ে (শারীরিক, মানসিক, যৌন ও প্রজনন) সচেতনতা বৃদ্ধিই পারে নারীর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে, সংশ্লিষ্টদের এমনটাই অভিমত।