সাক্ষাৎকার : শারমিন কবির
আরফাতুন নাবিলা
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:২৫ পিএম
আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৬:২৮ পিএম
শারমিন কবির, ফাউন্ডার অ্যান্ড চেয়ারম্যান, ঋতু
মেয়েদের পিরিয়ড সংক্রান্ত বিভিন্ন ট্যাবু সমাজে এখনও বিদ্যমান। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষদের নিয়ে এই ট্যাবু ভাঙানোর কাজ করছে ঋতু।কিশোরী থেকে নারীর মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিভিন্ন দিক নিয়ে ঋতুর ফাউন্ডার অ্যান্ড চেয়ারম্যান শারমিন কবির কথা বলেছেন প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরফাতুন নাবিলা
প্রশ্ন : মেয়েদের পিরিয়ড সংক্রান্ত যে ট্যাবুগুলো সমাজে এখনও বিদ্যমান, সেগুলো নিয়ে কীভাবে কাজ করছে ঋতু?
উত্তর : আমাদের সমাজে পিরিয়ড এখনও একটি গভীরভাবে প্রোথিত ট্যাবু। এটি এমন একটি বিষয়, যাকে শুধুমাত্র মেয়েদের ব্যাপার বলে চিহ্নিত করে আলোচনা থেকে দূরে রাখা হয়। স্কুলে পিরিয়ড নিয়ে আলোচনা মানেই ছেলেদের ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া, শিক্ষকদের পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় এড়িয়ে যাওয়া, এমনকি জাতীয় কারিকুলাম থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষায় প্রশ্ন না আসা- সব মিলিয়ে বিষয়টি যেন ইচ্ছাকৃতভাবেই আড়ালে রাখা হয়। এই নীরবতাই পিরিয়ডকে সমাজে আরও বেশি ট্যাবু করে তুলেছে। এই বাস্তবতা বদলানোর লক্ষ্য নিয়েই ২০১৬ সাল থেকে ঋতু কাজ করে যাচ্ছে। ঋতুর লক্ষ্য পিরিয়ড ডিসকাশনকে জেন্ডার নিউট্রাল করা। পিরিয়ড কোনো লজ্জার বিষয় নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও শারীরিক প্রক্রিয়া। তাই এই বিষয়টি শুধু মেয়েদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ছেলেদেরও এই আলোচনার অংশ হতে হবে। কারণ সবাই জানলে, বুঝলে তবেই ট্যাবু ভাঙবে। এই ভাবনা থেকেই ঋতু তাদের ওয়ার্কশপগুলোতে ছেলে ও মেয়েদের একসাথে নিয়ে পিরিয়ড নিয়ে আলোচনা করে। খুব সহজ, বৈজ্ঞানিক ও স্বাভাবিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়Ñ পিরিয়ড কী, কেন হয়, শরীরে কী পরিবর্তন আসে।
পিরিয়ড নিয়ে কথা বলার আরেকটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ঋতু তৈরি করেছে একটি কমিক বই। গল্পের আকারে সাজানো এই বইটি ব্যবহার করে গ্রুপ ডিসকাশন ও ইন্টারঅ্যাকটিভ ওয়ার্কশপ পরিচালনা করা হয়। এতে কিশোর-কিশোরীরা সহজে যুক্ত হতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং সংকোচ কাটিয়ে উঠতে পারে।
পিরিয়ড ট্যাবুর পেছনে বড় একটি কারণ হলো স্যানিটারি ন্যাপকিন কেনার লজ্জা ও আর্থিক অক্ষমতা। এই সমস্যা সমাধানে ঋতু নিয়ে এসেছে রিইউজেবল স্যানিটারি ন্যাপকিন, যা ধুয়ে বারবার ব্যবহার করা যায়। এটি যেমন খরচ কমায়, তেমনি পিরিয়ড ম্যানেজমেন্টকে করে আরও সহজ ও সম্মানজনক।
প্রশ্ন : পিরিয়ড সংক্রান্ত জটিলতার (যেমন : PCOS, এন্ডোমেট্রিওসিস) জন্য কি বিশেষ কোনো ডেডিকেটেড ক্লিনিক বা কনসালটেন্সি সার্ভিস আছে?
উত্তর : ঋতু এখন পর্যন্ত সার্ভিস বেইজড অর্গানাইজেশন নয়, তাই আমরা এই জায়গাটায় সরাসরি ফোকাস করছি না, তবে আমাদের অনবোর্ড গাইনোকোলজিস্ট আছেন। কেউ যদি আমাদের কাছ থেকে গাইনোকোলজিস্টদের সাপোর্ট নিতে চান তবে আমরা যোগাযোগ করিয়ে দেই। সরাসরি গিয়ে তার সাথে দেখা করে পরামর্শ নেওয়া যায়।
প্রশ্ন : স্কুল বা কলেজের মেয়েদের জন্য পিরিয়ড হাইজিন বা মাসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিয়ে আপনাদের কোনো আউটরিচ প্রোগ্রাম আছে কি?
উত্তর : ঋতুর মেইন কাজের অংশটাই হচ্ছে স্কুল-কলেজের মেয়েদের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা। বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে, বস্তিতে গিয়ে নানা ধরনের ওয়ার্কশপ পরিচালনা করে ঋতু। নানা ধরনের কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বাংলা ও ইংরেজি উভয় মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরাসরি সেশন পরিচালনা করা, ঢাকার বিভিন্ন বস্তি এলাকায় যেখানে তথ্যের অভাব বেশি সেখানে নিয়মিত কাজ করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা (মিঠামইন, নিকলী, অষ্টগ্রাম) যেখানে যাতায়াতব্যবস্থা কঠিন, সেখানেও স্বাস্থ্য সুরক্ষা বার্তা পৌঁছে দেওয়া। প্রযুক্তির দিক থেকেও ঋতু অনেকখানি অগ্রসর হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফেসবুক বা অন্যান্য অনলাইন মাধ্যমে রেগুলার লাইভ প্রোগ্রাম এবং ক্যাম্পেইন, 17.com নামে টিনেজারদের জন্য বিশেষায়িত একটি প্ল্যাটফর্ম রয়েছে যেখানে শুধু মেয়েদের পিরিয়ড নয়, বরং ছেলে-মেয়ে উভয়ের বয়ঃসন্ধিকালীন শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন এবং লাইফস্টাইল নিয়ে সঠিক তথ্য প্রদান করা হয়।
সারা বাংলাদেশে ঋতুর কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ৪০০+ দক্ষ ভলান্টিয়ার ও ট্রেইনার রয়েছেন যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রজেক্টভিত্তিক সেশন পরিচালনা করেন। ঋতু স্থানীয় ট্রেইনারদের সাথে কোলাবোরেশন করে এবং তাদের অনলাইন ও অফলাইনে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্ষমতা বৃদ্ধি করে যেন তারা ঋতুর লক্ষ্য বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রশ্ন : ঋতুর রিইউজেবল স্যানিটারি ন্যাপকিন কীভাবে মেয়েদের পিরিয়ডকালীন সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে?
উত্তর : বাংলাদেশে ঋতুই প্রথম বাণিজ্যিকভাবে রিইউজেবল বা ধুয়ে ব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন বাজারে নিয়ে আসে। এটি আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উপাদানের এক অনন্য সমন্বয়। ন্যাপকিনের কাপড় ও গুণগত মান বিসিএসআইআর দ্বারা সার্টিফাইড। বিশেষায়িত ইমপোর্টেড কাপড় দিয়ে ঢাকার নিজস্ব ফ্যাক্টরিতে অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর পরিবেশে এটি তৈরি করা হয়। এর এবজরবেন্সি পাওয়ার অনেক বেশি, যা দীর্ঘক্ষণ নিশ্চিন্ত রাখে। এতে কোনো বাড়তি ব্লিচ বা ক্ষতিকারক কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না, যা ত্বকের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ। সাধারণ ডিসপোজেবল ন্যাপকিন মাটিতে মিশতে ৫০০-৮০০ বছর লাগলেও ঋতুর ন্যাপকিন সাধারণ কাপড়ের মতোই মাটিতে মিশে যায়। বারবার ব্যবহারযোগ্য হওয়ায় এটি পরিবেশের ওপর কোনো বাড়তি চাপের সৃষ্টি করে না। একবার কিনলে ধুয়ে ধুয়ে টানা এক বছর (১২টি সাইকেল) ব্যবহার করা যায়। ফলে প্রতি মাসে ন্যাপকিন কেনার দুশ্চিন্তা থাকে না। স্বল্প আয়ের বা সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের জন্য এটি অত্যন্ত কার্যকর, কারণ বারবার অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন হয় না।
প্রশ্ন : ঋতুর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
উত্তর : ভবিষ্যৎ নিয়ে ঋতুর বেশ কিছু পরিকল্পনা রয়েছে। যার মধ্যে আছে- বর্তমানে ২২টি জেলায় ঋতুর নিজস্ব প্রশিক্ষিত ভলান্টিয়ার ও ট্রেইনার থাকলেও ঋতুর লক্ষ্য দেশের ৬৪টি জেলাতেই দক্ষ ও ডেডিকেটেড টিম গঠন করা। এই স্থানীয় টিমগুলো প্রতিটি অঞ্চলে ঋতুর মিশন ও লিগ্যাসিকে পৌঁছে দেবে। ‘গল্পে গল্পে বয়ঃসন্ধি’ কোর্সের মাধ্যমে কিশোরীরা পিরিয়ডকে ভয় না পেয়ে যেন আত্মবিশ্বাসের সাথে মোকাবিলা করে সেভাবে কাজ করা। ঋতু এমন একঝাঁক কিশোরী তৈরি করতে চায়, যারা নিজেরা সচেতন হওয়ার পাশাপাশি তাদের স্কুল ও কমিউনিটিতে পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেবে। যারা পিরিয়ড ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে, ঋতু সেইসব সংস্থা ও ব্যক্তিদেরও প্রশিক্ষণ এবং সাপোর্ট দিচ্ছে যাতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পিরিয়ড পোভার্টি দূর হয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পিরিয়ড সংক্রান্ত নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখা এবং বিদ্যমান নীতিগুলো সংশোধনে কাজ করার স্বপ্ন দেখে ঋতু। দক্ষিণ এশিয়াসহ সারা বিশ্বে বাংলাদেশের সফল মডেলগুলো নিয়েও কাজ করতে চায় ঋতু।