ব্রেস্ট ক্যানসার
ড. কাজী তাসনুভা তারান্নুম
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ১৪:১৮ পিএম
ড. কাজী তাসনুভা তারান্নুম, প্রফেশনাল হেলথ কনসালট্যান্ট, সিনফ্যাথ শ্রীনাকারিন হসপিটাল ব্যাংকক
ব্রেস্ট ক্যানসার বা স্তন ক্যানসার শব্দটি আমাদের সমাজের নারীদের কাছে এক গভীর আতঙ্কের নাম। ক্যানসার মানেই শরীরের কোনো একটি নির্দিষ্ট অংশের কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। যখন স্তনের টিস্যু বা কোষগুলো অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়তে শুরু করে, তখনই তাকে আমরা ব্রেস্ট ক্যানসার বলে থাকি। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই যুগে ভয় না পেয়ে সচেতন হওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে এই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
ঝুঁকির কারণ ও বংশগতির ভূমিকা
ব্রেস্ট ক্যানসার কেন হয়, তার কোনো একক বা নির্দিষ্ট কারণ এখনও চিকিৎসকরা শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স ৪০ পার হওয়ার পর নারীদের এই ঝুঁকি বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বংশগত বা জেনেটিক কারণ এখানে বড় ভূমিকা রাখে। যদি পরিবারের কোনো সদস্য যেমন- মা, খালা, নানি বা ফুফুর ব্রেস্ট ক্যানসারের ইতিহাস থাকে, তবে পরবর্তী প্রজন্মের নারীদের বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। এছাড়াও শরীরে BRCA1 ও BRCA2 নামক জিনের অস্বাভাবিক পরিবর্তন এই ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
জীবনযাত্রা ও পারিপার্শ্বিক প্রভাব
বর্তমান সময়ের অনিয়মিত জীবনযাপন ব্রেস্ট ক্যানসারের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা শারীরিকভাবে খুব একটা পরিশ্রম করেন না, অলস জীবনযাপন করেন কিংবা যাদের শরীরের ওজন প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি, তাদের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রবল। এ ছাড়া যারা সন্তান জন্ম দিতে দেরি করেন কিংবা শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ পান করান না, তাদের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি দেখা দেয়। দীর্ঘকাল কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হরমোনাল থেরাপি নেওয়া এবং অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবনও এই মারণব্যাধির পথ প্রশস্ত করতে পারে।
নিজেই নিজের পরীক্ষা ও লক্ষণসমূহ
ব্রেস্ট ক্যানসার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ‘সেলফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন’ বা নিজের স্তন নিজেই পরীক্ষা করা। ৪০ বছর বয়সের পর প্রতি মাসে নিয়মিত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের স্তন ও বগলের নিচের অংশ পরীক্ষা করা উচিত। যদি কোথাও কোনো শক্ত চাকা বা গোটা অনুভূত হয়, যা আগে ছিল না, কিংবা সেই চাকার আকার যদি দিন দিন বাড়তে থাকে, তবে তা বিপদের লক্ষণ হতে পারে। এ ছাড়া স্তনের চামড়া কুঁচকে যাওয়া, রঙের পরিবর্তন হওয়া, স্তনবৃন্ত ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়া কিংবা স্তনবৃন্ত দিয়ে রক্ত বা অস্বাভাবিক তরল নির্গত হওয়া দেখা দিলে, নিপলের চামড়াটা একটু লালচে ভাব হয়ে গেলে দেরি না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।
ব্যায়াম ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন
ব্রেস্ট ক্যানসার হয়তো শতভাগ প্রতিরোধ করা যায় না, কিন্তু সচেতন থাকলে এর ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এখানে রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। নারীদের বয়স বাড়ার সাথে সাথে মাংসপেশি বা মাসল ম্যাস কমতে থাকে, তাই চিকিৎসকরা হাঁটাচলার পাশাপাশি হালকা স্ট্রেন্থ ট্রেনিং করার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া শিশুকে নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়ানো মায়ের শরীরের হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা করে, যা ক্যানসার প্রতিরোধে সহায়তা করে।
রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের পথ : ক্যানসার কোন পর্যায়ে আছে তা বোঝার জন্য চিকিৎসকরা বেশ কিছু পরীক্ষা করে থাকেন।
ব্রেস্ট ক্যানসারের কোন স্টেজে আছেন?
চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর শুরুতে তারা ক্লিনিক্যাল এক্সামিনেশন করবেন। এরপর মেমোগ্রাম করা হবে। সে জায়গায় যদি কোনো ধরনের চাকা থেকে থাকে, সেই চাকাটিকে এফএনএস বা বায়োপসি করা হয়। বায়োপসিতে সূক্ষ একটা সুঁইয়ের মাধ্যমে ওখান থেকে একটা কোষ নিয়ে সেটার পরীক্ষা করে দেখা হবে সেটা ম্যালিগনেন্ট নাকি বেনাইন। অর্থাৎ ক্যানসারটা কতটুকু খারাপ পর্যায়ে আছে নাকি শুধুই বেনাইন টিউমার সেটা পরীক্ষা করা হবে। কখনও কখনও সিটিএ স্ক্যান, এমআরআই বা বোন স্ক্যান করা হয়। এগুলো করার উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্যানসারটা কোন স্টেজে আছে সেটা বোঝা। ক্যানসারের চারটি স্টেজ বা পর্যায় থাকে।
বায়োপসিসহ বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় রোগী কোন স্টেজে আছেন। স্টেজের ওপর নির্ভর করে সাধারণত চিকিৎসা নির্ধারণ করা হয়। যত দ্রুত ডিটেক্ট হবে মানে যত আর্লি স্টেজে ধরা পড়বে, ক্যানসারের তত বেশি প্রোগনোসিস ভালো। মানে ক্যানসার ভালো হয়ে যাওয়ার বা নিরাময় হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। যদি টিউমার পাওয়া যায় তাহলে অনেক সময় টিউমার অথবা পুরো ব্রেস্ট রিমুভ করে দেওয়া হয়। এটা মূলত নির্ভর করে স্টেজ ও টিউমারের ধরনের ওপর। এরপর দেওয়া হয় কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি। রোগীর সুস্থ জীবনযাপনের উদ্দেশ্যে কখনও কখনও টার্গেটেড থেরাপিও দেওয়া হয়।
লেখক : প্রফেশনাল হেলথ কনসালট্যান্ট, সিনফ্যাথ শ্রীনাকারিন হসপিটাল ব্যাংকক