× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভূমিকম্পের ভয়

বদলে যাচ্ছে ফ্ল্যাট কেনার হিসাব-নিকাশ

রাহাত হুসাইন

প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৩৬ পিএম

বদলে যাচ্ছে ফ্ল্যাট কেনার হিসাব-নিকাশ

বিশ্বের দ্বিতীয় ঘনবসতিপূর্ণ শহর রাজধানী ঢাকা। জমির উচ্চমূল্য ও জনসংখ্যার চাপের কারণে নগরবাসী কংক্রিট-নির্ভর বহুতল ফ্ল্যাটের দিকেই বেশি ঝুঁকছেন। তবে সম্প্রতি কয়েক দফা ভূমিকম্প আবাসন নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ভূমিকম্পের স্বল্পস্থায়ী কাঁপুনিতেই অনেক নাগরিকের মনে প্রশ্ন জেগেছেÑ যে ভবনে তারা বসবাস করছেন বা যে ফ্ল্যাট কিনতে যাচ্ছেন, সেটি ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা নিরাপদ।

এই উদ্বেগের প্রভাব পড়ছে ঢাকার আবাসন বাজারেও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের মতো শুধু লোকেশন, দাম বা ফ্ল্যাটের ফিনিশিং নয়; ক্রেতারা এখন ভূমিকম্প-সহনশীল নকশা, মাটির গুণাগুণ, পাইলিংয়ের গভীরতা এবং সামগ্রিক নির্মাণমানকে গুরুত্ব দিয়ে ফ্ল্যাট কেনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

একসময় ফ্ল্যাট কেনা মানেই ছিল ‘নিজের একটা ঠিকানা’। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চয়তার প্রশ্ন। রিয়েল এস্টেট খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরে ক্রেতাদের প্রশ্নের ধরন আমূল বদলে গেছে। আগে যেখানে জিজ্ঞেস করা হতো পার্কিং আছে কি না, ছাদে কমিউনিটি স্পেস মিলবে কি না, এখন সেখানে প্রশ্ন আসেÑ ভবনের পাইল কত গভীরে গেছে, রডের গ্রেড কী, মাঝারি বা বড় ভূমিকম্পে ভবন কতটা চাপ সহ্য করতে পারবে।

রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর, গেণ্ডারিয়া, ধোলাইপাড়, বসুন্ধরা, ডেমরা, মুগদা, বাসাবো, উত্তরা ও রামপুরার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ফ্ল্যাট খুঁজতে গিয়ে অনেক ক্রেতাই এখন দ্বিধায় পড়ছেন। কম দামে ফ্ল্যাট মিললেও ভবনের বয়স, নকশা এবং নির্মাণ অনুমোদনের ইতিহাস দেখে অনেকেই পিছিয়ে যাচ্ছেন। কেউ নতুন প্রকল্পে আগ্রহ দেখাচ্ছেন আবার কেউ উল্টোভাবে নতুন কিন্তু অচেনা নির্মাতার চেয়ে পুরনো ও পরিচিত ডেভেলপারের ভবনকেই বেশি নিরাপদ মনে করছেন। সাধারণ ক্রেতার বড় দুর্বলতা এখানেই- তিনি প্রকৌশলী নন, নকশা পড়ে ঝুঁকি বিশ্লেষণের সক্ষমতাও তার সীমিত। এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে রিয়েল এস্টেট খাতের ভেতরেও। একদিকে দ্রুত মুনাফার আশায় গড়ে ওঠা ছোট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান; অন্যদিকে তুলনামূলক বড় ডেভেলপাররা যারা এখন নিরাপত্তাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্রুশিওর ও প্রচারণায়ও এই পরিবর্তনের ছাপ পড়ছে।

দেশের আবাসন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) বলছে, ফ্ল্যাট বা প্লট কেনার আগে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানটি তাদের সদস্য কি না, তা যাচাই করা জরুরি। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২-এর ২১ ধারায় বলা হয়েছেÑ দেশে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে রিহ্যাবের সদস্যপদ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। রিহ্যাবের সদস্য না হয়ে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা করা আইনত অবৈধ।

রিহ্যাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্রিক ওয়ার্কস লিমিটেডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী ভূঁইয়া প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘ভবন নির্মাণের শুরু থেকেই বাসিন্দাদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছেন রিহ্যাবের সদস্যরা। তারা বিল্ডিং কোড অনুসরণ করেই ভবন নির্মাণ করেন। তার দাবি, এখন পর্যন্ত ভূমিকম্পে রিহ্যাব সদস্যদের নির্মিত কোনো ভবনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে দেশে উৎপাদিত রড ও সিমেন্ট ভূমিকম্প-সহনশীল মান বজায় রেখেই তৈরি হচ্ছে, যা একসময় বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো। এ ছাড়া নির্মাণমান উন্নয়নে দেশের সাতটি বিভাগে রিহ্যাবের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে নির্মাণ শ্রমিকদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থান করছে। বড় মাত্রার ভূমিকম্প না হলেও মাঝারি কম্পন নিয়মিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু নগরের বাস্তবতা ভিন্ন। অধিকাংশ ভবনই নির্মিত হয়েছে জলাভূমি ভরাট করে; কোথাও নরম মাটির ওপর ভারী কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। এত দিন এই দুর্বলতা চোখে পড়েনি, তবে ভূমিকম্পের কাঁপুনিতে মানুষ তা এখন অনুভব করতে শুরু করেছে।

রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি ও ‘বিল্ডিং ফর ফিউচার’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তানভিরুল হক প্রবাল বলেন, ভবন নির্মাণের প্রতিটি ধাপে বাসিন্দাদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় রেখেই ভবনের নকশা প্রণয়ন করতে হবে। নির্মাণকাজে ব্যবহৃত রড, সিমেন্ট ও বালুর গুণগত মান এবং সঠিক সংমিশ্রণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি যথাযথ তদারকির মাধ্যমে পাইলিংয়ের মান ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি তদারকি ও মান নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তবে নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। নির্মাণ শিল্পে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। শুধু মানসম্পন্ন নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না; নিয়মিত তদারকি ও কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াও সমানভাবে জরুরি। এ ধরনের পদক্ষেপ ভবনের স্থায়িত্ব এবং বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে সহায়তা করবে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু ক্রেতা সচেতন হলেই হবে না; ভবন নির্মাণে রাষ্ট্রীয় তদারকি দুর্বল থাকলে ঝুঁকি থেকেই যাবে।’

ব্যাংকঋণ নিয়ে ফ্ল্যাট কেনা মধ্যবিত্তের জীবনে একটি বড় সিদ্ধান্ত। ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে পরিবারগুলোর আলোচনাও বদলেছে। ভূমিকম্পের ঝুঁকি সেই সিদ্ধান্তকে আরও কঠিন করে তুলেছে। অনেকেই বলছেন, জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে কেনা ফ্ল্যাট যদি বড় কম্পনে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয়, মানসিক বিপর্যয়ও। এই ভয়ই এখন আবাসন বাজারের বড় চালিকাশক্তি। ঢাকার ফ্ল্যাট বাজার এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। কেবল চকচকে টাইলস আর ঝকঝকে লিফট আর মানুষকে আগের মতো টানছে না। মানুষ খুঁজছে নিশ্চিন্ত ঘুম। ভূমিকম্পের ভাবনা সেই চাহিদাকে আরও তীব্র করেছে। প্রশ্ন একটাইÑ এই চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি নির্মাণব্যবস্থা সত্যিই বদলাবে, নাকি নিরাপত্তাও এক দিন বিজ্ঞাপনের শব্দে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে?

শেষ পর্যন্ত মানুষ একটি ছাদই চায়; যার নিচে সে নির্ভয়ে রাত কাটাতে পারে। ভূমিকম্পের ভাবনায় সেই নির্ভরতা আজ আর সহজ নয়। তবু সেই নিশ্চিন্ত আশ্রয়ের খোঁজেই বদলাচ্ছে সাধারণ মানুষের আবাসনের স্বপ্ন।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা