বিশেষ লেখা
খন্দকার মোঃ ওয়াহিদ সাদিক (শুভ)
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১২:৩১ পিএম
খন্দকার মোঃ ওয়াহিদ সাদিক (শুভ), নির্বাহী প্রকৌশলী, রাজধানী উন্নয়ক কর্তৃপক্ষ (রাজউক)
সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সূচিত হয়েছে ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’-এর নতুন ধারা। ১৯৭০ সালে প্রথম এ ধারণার প্রকাশ ঘটে। তবে তার উদ্দেশ্য ছিল মূলত নদীদূষণ ও বায়ুদূষণের ফলে বিপর্যস্ত বাস্তুসংস্থানের ক্ষেত্রে পুনরুদ্ধারের ক্ষমতা জাগিয়ে তোলা। কিন্তু ২০০০ সাল-পরবর্তী সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। উন্নয়ন সহযোগীদের কল্যাণে বর্তমানে বাংলাদেশেও ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’-এর ধারণার প্রসার ঘটছে। এদেশের নগর ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক জীবনযাপনের সঙ্গে বিষয়টির গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশের পাঠকদের এ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দিতে লিখেছেন রাজউকের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার মোঃ ওয়াহিদ সাদিক (শুভ)
রেজিলিয়েন্স শব্দটির সঠিক বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেকে একে ‘সহনশীলতা’ বা ‘স্থিতিস্থাপকতা’ হিসেবে চিহ্নিত করলেও এই শব্দের মাধ্যমে এর প্রকৃত অর্থ তুলে ধরা মুশকিল। রেজিলিয়েন্স মূলত পরিবর্তিত অবস্থা থেকে প্রকৃত অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষমতা। ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’ হলো নগরে যদি কোনো দুর্যোগ ঘটে, যত দ্রুত সম্ভব সেই নগরের কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার সক্ষমতা। সে অর্থে ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’-এর বাংলা প্রতিশব্দ হতে পারে ‘নগরের অভিঘাত সহনশীলতা’। এর সঙ্গে নগরীর ভৌত অবকাঠামো, সমাজব্যবস্থা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং অর্থনীতির সক্ষমতা সম্পৃক্ত। ইউএন-হ্যাবিটাটের (জাতিসংঘের মানববসতি বিষয়ক কর্মসূচি) সংজ্ঞা অনুযায়ী, যেকোনো নগরব্যবস্থার ও তার বাসিন্দাদের সমস্ত দুর্যোগ এবং চাপের মধ্যেও নিয়মিত কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসইভাবে অভিযোজন ও রূপান্তরিত করার পরিমাপযোগ্য ক্ষমতাকে ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’ বলা যেতে পারে। একটি শহর যদি নিজেকে এমনভাবে রূপান্তরে সক্ষম হয় যে, দুর্যোগ সংক্রান্ত যেকোনো আঘাত ও চাপকে মোকাবিলা করতে পারে, মানিয়ে নিতে পারে এবং পুনরুদ্ধার করতে পারে, তবে সেই শহরকে ‘রেজিলিয়েন্ট সিটি’ বলা যেতে পারে।
জাতিসংঘের বিবেচনায়, একটি রেজিলিয়েন্ট সিটির তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে; যেগুলো হলোÑ প্রথমত, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসকল্পে ক্রমাগত প্রচেষ্টা, পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন; দ্বিতীয়ত, উচ্চতর অভিযোজন ক্ষমতা; এবং তৃতীয়ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা। এসব বৈশিষ্ট্য সমন্বিত, প্রতিক্রিয়াশীল এবং রূপান্তরশীল প্রক্রিয়ায় অর্জন করতে হবে। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৭টি বিশ্বজনীন লক্ষ্যের মধ্যে ১১তম লক্ষ্যটি আরবান রেজিলিয়েন্স সম্পর্কিত। ১১তম লক্ষ্যটি হলোÑ ‘টেকসই নগর ও জনপদ : নগর ও জনবসতিগুলোকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, অভিঘাত সহনশীল ও টেকসই করে তোলা।’ ২০৩০ সালের মধ্যে উক্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করার বিষয়ে বৈশ্বিক ঐকমত্য রয়েছে।
সিটি রেজিলিয়েন্স ইনডেক্সে ঢাকার অবস্থান : ২০২৩ সাল থেকে একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সিটি রেজিলিয়েন্স ইনডেক্স’-এর ধারণা প্রবর্তন করেছে। বিশ্বের ২৫টি শহর নিয়ে গবেষণা করে এই ‘সিটি রেজিলিয়েন্স ইনডেক্স’ প্রস্তুত করা হয়েছে। এই সূচকের মাধ্যমে শহরগুলোর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা যায়। শহরগুলোকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ১-১০০-এর মধ্যে নাম্বার দেওয়া হয়। ‘সিটি রেজিলিয়েন্স ইনডেক্স’ নির্ধারণের জন্য অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামো, পরিবেশ, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বিষয়াদি বিবেচনা করা হয়। অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামোর মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি সরবরাহ, পরিবহন ও যোগাযোগ, ভবন এবং ইন্টারনেট সংযোগকে মূল্যায়ন করা হয়। পরিবেশগত বিষয়ের মধ্যে বন্যা, তাপদাহ, বায়ুদূষণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, কার্বন হ্রাসকরণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল্যায়ন করা হয়। সামাজিক উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে সরকারের ডিজিটাল তথ্যপ্রবাহ ও বিশ্বাসযোগ্যতা, অপরাধ ও জনননিরাপত্তা, আয়বৈষম্য ও সামাজিক সুরক্ষা ইত্যাদি বিষয়কে মূল্যায়ন করা হয়। অর্থনৈতিক বিষয়সমূহের মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক ঝুঁকি, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা পরিবেশ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের বিষয়সমূহকে মূল্যায়ন করা হয়। ‘সিটি রেজিলিয়েন্স ইনডেক্স’-এর মূল্যায়নে ঢাকা ১০০-এর মধ্যে পেয়েছে ৪৩ নাম্বার এবং ২৫টি শহরের মধ্যে রয়েছে ২৪তম অবস্থানে। এ থেকে বোঝা যায়, ঢাকা শহরের দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবিলায় অনেক কাজ বাকি রয়েছে এবং এ বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রয়োজন আরও প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন : রেজিলিয়েন্স অর্জনের ক্ষেত্রে তিনটি পর্যায় রয়েছে। প্রথমেই রয়েছে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বা প্রশমন প্রস্তুতি। এ পর্বে ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ, সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন এবং ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়। দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে দুর্যোগ-পরবর্তী সাড়া প্রদান ও উদ্ধার তৎপরতা এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বপ্রস্তুতি। সবশেষ পর্যায়ে রয়েছে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন ও পুনর্নির্মাণ।
বিশ্বব্যাংকের মতে, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও প্রস্তুতি সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে প্রতি এক ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে চার ডলার সমপরিমাণ সুফল পাওয়া যায়। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলো, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ-সংক্রান্ত যতগুলো প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর ৯০ শতাংশই হচ্ছে দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধারকাজে জরুরি সাড়া দেওয়া বিষয়ে, আট শতাংশ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও প্রস্তুতি বিষয়ে এবং দুই শতাংশ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্গঠন কাজে। সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পের চিত্র : বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ন্যাশনাল রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম এবং আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। ভূমিকম্পে সাধারণত নগর অঞ্চলে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়। তাই ভূমিকম্পকে ‘আরবান ডিজাস্টার’ বলা হয়। এ প্রকল্পের আওতায় রাজউক যে কাজগুলো করেছে, তার সবগুলোই ছিল ভূমিকম্প দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও প্রস্তুতিমূলক। রাজউক অধিভুক্ত এলাকার ঝুঁকি অন্তর্ভুক্তিমূলক ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ছাড়াও রাজউকের নকশা অনুমোদন প্রক্রিয়াকে আধুনিক করার লক্ষ্যে ইলেকট্রনিক কনস্ট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেম (ইসিপিএস) প্রণয়ন করা হয়েছে এবং বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) প্রতিপালনের কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে।
এ ছাড়াও আরবান রেজিলিয়েন্স কার্যক্রম অব্যাহত রাখার উদ্দেশ্যে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতায় সরকারি মালিকানাধীন ট্রাস্ট হিসেবে ‘আরবান সেফটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইনস্টিটিউট’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রস্তাবিত ‘আরবান সেফটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইনস্টিটিউট’ গঠিত হলে নিয়মিতভাবে আরবান রেজিলিয়েন্স কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজধানী ঢাকা ছাড়াও দেশব্যাপী রেজিলিয়েন্স বা অভিঘাত সহনশীল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
লেখক: নির্বাহী প্রকৌশলী, রাজধানী উন্নয়ক কর্তৃপক্ষ (রাজউক)