নিরাপদ নির্মাণের সন্ধানে
রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৫৬ এএম
রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্রুততম অপরিকল্পিত নগরায়িত শহরগুলোর অন্যতম। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন কারণে হাজারো মানুষ ঢাকায় এসে স্থায়ী হচ্ছে। এই জনচাপ সামলাতে এখানে অসংখ্য বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে; নির্মাণাধীন রয়েছে আরও অনেক ভবন। তবে সাম্প্রতিক কয়েক দফা ভূমিকম্পের পর ঢাকাবাসীর মনে এই প্রশ্ন আরও দানা বেঁধে উঠেছে- এসব বহুতল ভবন কতটা নিরাপদ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঝুঁকির বড় অংশই লুকিয়ে আছে মাটির গভীরে। সেখানে এমন সব বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা উপেক্ষা করলে ভবনের কাঠামো যেকোনো সময় বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা উপেক্ষা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুযায়ী, ভবন নির্মাণের আগে ভূ-প্রযুক্তিগত তদন্ত বাধ্যতামূলক। এ ক্ষেত্রে মাটির ধরন, শক্তি, চাপ বহন ক্ষমতা, ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থান এবং ভূমিকম্প ঝুঁকি যাচাই করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে এ ধাপগুলো প্রায়শই নামমাত্র সম্পন্ন হয়। অথচ মাটির ভারবহন ক্ষমতা ভবনের ফাউন্ডেশন নকশার ভিত্তি।
ঢাকার ভূগঠন বৈচিত্র্যময়। মধুপুর ক্লে, নদীবাহিত বালু, দোআঁশ এবং ভরাট মাটি মিলে শহরের ভূতাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেছে। প্রতিটি স্তরের শক্তি ভিন্ন। কোথাও মাটি শক্ত, কোথাও ভরাটের কারণে দুর্বল। নগর পরিকল্পনায় এই পার্থক্য প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। ফলে এক এলাকায় যে নকশায় নিরাপদ ভবন সহজেই নির্মাণ করা যায়, অন্য এলাকায় সেই নকশা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষত উত্তর, পূর্ব ও নদীতীরবর্তী এলাকার মাটি নরম হওয়ায় সেখানে কখনও ভূমিকম্প হলে লিকুইফ্যাকশন বা মাটি তরল হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এতে পাইল শক্তি হারায়, ভবন বাঁকা হয় বা হঠাৎ ধসে পড়ে। জাপান ও তুরস্কে এ ধরনের ভূমিকম্পের অনেক উদাহরণ আছে। ঢাকার অনেক ভবন ভরাট জমিতে নির্মাণ করায় বর্তমানে সেগুলো একই ধরনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
নালা-খাল বা জলাধার ভরাট করে ভবন তোলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। মাটিকে সঠিকভাবে প্রস্তুত না করলে ভবনের নিচের মাটি ধীরে ধীরে বসে যেতে শুরু করে বা স্থিতি পেতে থাকেÑ যাকে বলে সেটলমেন্ট। এর ফলে দেয়ালে ফাটল ধরে, মেঝে ঢালু হয়, দরজা-জানালা আটকে যায়। কয়েক বছরের মধ্যেই পুরো কাঠামো অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।
যেসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির লেভেল উঁচু এবং মাটি তরলীকরণ (লিকুইফ্যাকশন) হওয়ার প্রবণতা আছে সেখানে সাধারণ পাইলিং যথেষ্ট নয়। অনেক ভবনের নকশায় সিজমিক বা ল্যাটেরাল লোড ডিজাইন উপেক্ষিত থাকে। ভবনের নিচতলায় পার্কিং থাকার কারণে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও ‘সফট স্টোরি’ ধসের আশঙ্কা থাকে, যেখানে নিচের তলার পিলার ভেঙে যাওয়ার মাধ্যমে ভবনের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়।
ঢাকার স্বাভাবিক জলপ্রবাহ দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী। কিন্তু খাল-নালা ভরাট, ড্রেনেজ বন্ধ করে ব্লক কালভার্ট বসানো এবং জলাধার দখল শহরের মাটিকে অস্থিতিশীল করেছে। পানি আটকে থাকলে রাস্তা বসে যায় এবং ভবনের ফাউন্ডেশনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এ ধরনের নগরায়ণ ঢাকাকে ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ শহরে পরিণত করেছে।’
জিওলজিক্যাল সার্ভে অব বাংলাদেশের (জিএসবি) পরিচালক সৈয়দ নজরুল ইসলাম মনে করেন, ভবনের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে বৈজ্ঞানিকভাবে মাটির গুণাগুণ বোঝা অপরিহার্য। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘মাটি পরীক্ষা করার ক্ষেত্রে কোয়ালিটি কন্ট্রোল অপরিহার্য। অনেক সময় সিভিল ইঞ্জিনিয়াররা নিজেরাই মাটি পরীক্ষা করেন, যা তাদের কাজের অংশ নয়। মাটির গুণাগুণ মূল্যায়ন ভূতাত্ত্বিকদের কাজ। জিওলজিস্ট না থাকলে রিপোর্টের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’
তিনি বলেন, ‘ভবন নির্মাণের আগে গ্রাউন্ড ইনফরমেশন সংগ্রহ বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। সরকারের নীতিমালাতেও এ নিয়ে বাধ্যবাধকতা না থাকায় কেউ জিএসবির কাছে এ বিষয়ে তথ্য সংগ্রহে আসে না। ফলে মাটির প্রকৃতি না বুঝে ফাউন্ডেশন নকশা পরবর্তীতে পুরো ভবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে। বাংলাদেশের পলল ভূপ্রকৃতি জটিল। একই শহরে মাটির গুণাগুণের ভিন্নতা থাকে। তাই ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি শহরের মাটির গুণাগুণের ভিত্তিতে মাইক্রোজোনেশন জরুরি। এ ক্ষেত্রে জিএসবি অবদান রাখতে পারে।’
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ঢাকার জলাশয়, প্লাবনভূমি ও নিচু জমি ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ শহরকে ভূমিকম্পের কাছে আরও দুর্বল করেছে। নিরাপদ দূরত্বের নিয়ম না মানায় ভবনগুলো একে অপরের ওপর হেলে পড়ার বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। নতুন নগর পরিকল্পনার যে গেজেট প্রকাশ হয়েছে, তা অবিলম্বে স্থগিত করে সিজমিক মাইক্রোজোনেশন ম্যাপের সঙ্গে সমন্বয় করা উচিত।’
ড. আদিল এ ক্ষেত্রে চারটি বড় দুর্বলতা তুলে ধরেন। প্রথমত, দুই দশক ধরে কার্যকর বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়ত, দেশের জন্য একটি জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা নেই, যা নির্ধারণ করবে কোথায় নগর হবে এবং কোথায় ঘন বা কম ঘন উন্নয়ন হবে। তৃতীয়ত, গত তিন দশকে ঢাকাসহ শহরগুলোতে জলাভূমি ও প্লাবনভূমিতে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ হয়েছে, যা লিকুইফ্যাকশন ঝুঁকি বাড়িয়েছে। চতুর্থত, প্রতিটি ওয়ার্ডে পরিকল্পিত খালি জায়গা বা ওপেন স্পেস থাকা উচিত, যা স্বাভাবিক সময়ে খেলার মাঠ, ভূমিকম্পের সময় রেসকিউ স্পট হিসেবে কাজ করবে।
এ প্রসঙ্গে বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও কিউলার্নের প্রতিষ্ঠাতা ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘বাংলাদেশের বেশিরভাগ মাটি নরম কাদা অথবা লিকুইফ্যাকশনপ্রবণ নরম বালি। এসব মাটিতে ফাউন্ডেশন এবং স্ট্রাকচার ডিজাইনে বিল্ডিং কোড মানা অত্যাবশক। ঢাকার অনেক হাউজিং প্রজেক্টে নরম কাদার ওপর বালি ভরাটের মাধ্যমে উন্নয়ন করা হয়েছে। এর ফলে ভূমিকম্পের প্রভাব কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়, মাটির ভারবহন ক্ষমতা থাকে না। এসব ক্ষেত্রে চিকন লম্বা পাইলের তুলনায় মোটা লম্বা পাইল বেশি কার্যকর। পাইলবেজ গ্রাউটিং করলে ভবনধসের ঝুঁকি কমে। লিকুইফ্যাকশনপ্রবণ নরম বালি স্যান্ড কম্প্যাকশন পাইলের মাধ্যমে শক্ত করলে ভবনধসের আশঙ্কা কমে যায়।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, উন্নয়নের চাপ থাকলেও মাটির বাস্তবতা উপেক্ষা করা যাবে না। মাঝারি ভূমিকম্পও ঢাকাকে বিপর্যস্ত করতে পারেÑ যদি ভবনগুলো মাটির সঠিক বিশ্লেষণ ছাড়া নির্মিত হয়। তাই এখনই দরকারÑ মাটির গভীরের বৈশিষ্ট্য বোঝা এবং তার ওপর ভিত্তি করে টেকসই, রেজিলিয়েন্ট নগর পরিকল্পনা করা।
ঢাকা দ্রুত বদলাচ্ছে। আকাশে উঁচু ভবনের সারি বাড়ছে। কিন্তু নিচের অস্থিতিশীল মাটির বিশ্লেষণ সঠিকভাবে করা না গেলে পুরো নগরায়ণ অনিশ্চয়তার ওপর দাঁড়াবে। নগর বিশেষজ্ঞদের বার্তা স্পষ্টÑ ‘নিরাপদ শহর চাইলে উন্নয়নের শুরুটা করতে হবে মাটির গভীর থেকে।’