× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিশেষ লেখা : ভূমিকম্প

আপনি-আমি তখন কী করতে পারি

সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার

প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৪৮ এএম

সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার, স্থপতি ও সাংবাদিক

সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার, স্থপতি ও সাংবাদিক

বড় ভূমিকম্প হলে কী ঘটবে? কাউকে এমন প্রশ্ন করলে উত্তর পেতে পারেন- কী আর হবে, ঢাকা শহরটা ধ্বংস হয়ে যাবে! অর্থাৎ বিষয়টি যেন আমরা নিয়তির হাতে ছেড়ে দিয়েছি। ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পের পর কেউ কেউ নিজেকে চাপা পড়া অবস্থায় কল্পনা করে শিউরে উঠছিলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভীতসন্ত্রস্ত অনেক নেটিজেনকেই দেখা গেছে নানা শঙ্কামেশানো স্ট্যাটাস দিতে। কিন্তু এরপর লাগাতার কয়েকটি মৃদু কম্পন হওয়ায় ভূমিকম্পের আলোচনা বোধহয় খানিকটা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বাস্তবতা হলো, প্রতিদিন আমাদের জীবনে এত ঘটনা ঘটে যে, কোনো ইস্যুই আমরা লম্বা সময় ধরে মনে রাখতে পারছি না।

বাস্তবতা হচ্ছে, সক্রিয় ভূ-চ্যুতির কারণে ভূমিকম্পপ্রবণ দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম উঠে গেছে। ঝুঁকিতে আছে ঢাকাসহ বড় শহরগুলো। অন্যান্য এলাকায় ঝুঁকি নেই এমন নয়। তবে যে মাত্রার ভূমিকম্প আমাদের প্রচণ্ড ভয় পাইয়ে দিয়েছিল, একই মাত্রার ভূমিকম্প জাপানের মতো দেশগুলোতে হরহামেশাই হয়। কিন্তু তারা নির্মাণ প্রকৌশলের উৎকর্ষ ঘটিয়ে অর্থাৎ দুর্যোগের পূর্বপ্রস্তুতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে ৫ বা ৬ মাত্রার ভূমিকম্পের সময়ও সেখানকার নাগরিকরা দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে। ৭ মাত্রার ভূমিকম্পেও সেখানে বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা এখনও ধরনের দুর্যোগের জন্য প্রকৌশলগত দিক থেকে তো বটেই, মানসিকভাবেও প্রস্তুত নই।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বা কর্মস্থলে সেরকম প্রশিক্ষণের কারিকুলাম নেই। আমাদের অবকাঠামোর গুণগতমান নিয়েও সন্দেহ আছে। এখানে পরিকল্পনা ছাড়াই নগর বিকশিত হয়েছে। ফলে ভূমিকম্পের ভয়াবহতার বিষয়টি সামষ্টিকভাবে ভুলে থাকার চেষ্টা করাই শ্রেয়- এমনটাই ভাবছি আমরা। কিন্তু যে দুর্যোগ কোনো আগাম ঘোষণা ছাড়াই অতর্কিত আঘাত হানতে পারে, তাকে মোকাবিলার ব্যক্তিগত প্রস্তুতি না রাখা ঠিক নয়। 

দুর্যোগ প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী- তা নীতিনির্ধারকরা জানেন। তবে আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা কতখানি উদ্যোগ নেবেন এবং কতটা সাফল্য পাবেন, সেই অপেক্ষায় বসে না থেকে আমাদের বরং নিজেদের করণীয় কাজগুলো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। ভূমিকম্প স্থায়ী হয় মাত্র কয়েক সেকেন্ড, এই সময়ের মধ্যে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তুতি থাকলে ও সতর্কতা অবলম্বন করা হলে বড় দুর্যোগেও প্রাণ বেঁচে যেতে পারে। ক্ষয়ক্ষতিও কম হতে পারে। যেমন-

যে ভবনে বা অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস করছেন, সেটি মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করুন। অতীতে সেখানে ভূমিকম্পের কারণে কোনো ফাটল দেখা দিলে বা ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকলে দ্রুত একজন অভিজ্ঞ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারের শরণাপন্ন হন। তিনি ঝুঁকি যাচাই করে পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেবেন। তবে দক্ষ স্থপতি ও প্রকৌশলীর নকশা অনুসরণ করে নিয়ম মেনে তৈরি হওয়া স্থাপনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার শঙ্কা কম।

নিজের বাসার ভেতরের বিন্যাস এবং আসবাবপত্রের অবস্থান অনুযায়ী দুর্যোগকালীন সময়ে কোন জায়গাটি মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে ব্যবহার করবেন- সেটি চিহ্নিত করুন। সাধারণত ভবনের লিফট কোর বা কোরের কাছাকাছি ভেতরদিকের কোনো আরসিসি কলামের পাশের জায়গাটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচিত। এমনকি হতে পারে শক্ত কোনো টেবিল বা ফার্নিচারের তলা, যেখানে আশ্রয় নেওয়া যায়। ইন্টারনেটে এ ব্যাপারে বিভিন্ন পরামর্শ পাবেন, ইউটিউবেও অনেক ভিডিও কনটেন্ট খুঁজে পাবেন। ছবি দেখে বিষয়টি বোঝা সহজ হবে।

বাসায় যদি বুকশেলফ, শোকেস, আলমিরা বা এমন কোনো ফার্নিচার থাকে যেটা ভূমিকম্পের সময় কাত হয়ে পড়ে গিয়ে কাউকে আহত করতে পারে, তা হলে সেটি দেয়ালে সেঁটে দেওয়ার ব্যবস্থা করুন। সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য ফলস সিলিং এবং দেয়ালে বিভিন্ন ধরনের প্যানেল ব্যবহার করে থাকলে তা পরীক্ষা করে দেখুন। যদি আপনার কক্ষে বড় কোনো কাচের জানালা বা আয়না থেকে থাকে যা ভূমিকম্পের সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা আছে, তবে সেখানে টেম্পার্ড গ্লাস প্রতিস্থাপনের চেষ্টা করুন; অথবা অন্তত স্বচ্ছ স্টিকার ব্যবহার করে একটা বাড়তি আবরণ দিন যাতে তা ঝুরঝুর করে ভেঙে আপনাকে আহত না করে। বারান্দায় বা ছাদের রেলিংয়ে গাছের টব বা ভারী কিছু রাখবেন না, যা ছিটকে পড়ে গিয়ে পথচারীদের হতাহত করতে পারে। 

বাসার বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংযোগ পরীক্ষা করুন। গ্যাস লাইনে লিকেজ থাকলে তা দ্রুত মেরামত করুন। দুর্যোগের সময় গ্যাস লিক থেকে বড় ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পুরনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে স্পার্ক বা শর্টসার্কিটের আশঙ্কা আছে কি না যাচাই করুন। ভূমিকম্প হলে তাৎক্ষণিকভাবে যেন বিদ্যুতের মেইন সুইচ এবং গ্যাসের চুলা বন্ধ করে দেওয়া যায়, সেই প্রস্তুতি রাখুন। অগ্নিনির্বাপণ সামগ্রী রাখা ভালো।

একটি ছোট ব্যাগে জরুরি সরঞ্জাম হিসেবে টর্চলাইট, হুইসেল, অতিরিক্ত ব্যাটারি বা পাওয়ার ব্যাংক, প্রয়োজনীয় ওষুধ, প্রাথমিক চিকিৎসার সামগ্রী, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানির বোতল এবং কিছু নগদ টাকা রাখুন। দুর্যোগের সম্মুখীন হলে এগুলো টিকে থাকতে সহায়তা করবে।

এবার পারিবারিকভাবে প্রস্তুতি নিন ও মহড়া করুন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে আলোচনা করুন। ভূমিকম্পের সময় কাকে কী করতে হবে এটা আগেই জানিয়ে রাখুন। কে কোথায় আশ্রয় নেবে, শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ সদস্য থাকলে তাকে কীভাবে নিরাপদে রাখা যাবেÑ এ ব্যাপারে পরিকল্পনা করুন। ভূমিকম্প হলে যে যা করবেন, একযোগে সেটির মহড়া করুন। 

ভূমিকম্প শুরু হলে দৌড়ে বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করা অনুচিত। ‘ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড’Ñ এই তিনটি বিষয় মনে রাখুন। শক্ত টেবিল বা ফার্নিচারের নিচে ঢুকে, মাথা হাত বা বালিশ দিয়ে ঢেকে হাঁটু গেড়ে বসে থেকে, নড়াচড়া বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান ধরে রাখা সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। জানালা, কাঁচ, ঝুলন্ত ফ্যান বা ভারী জিনিসের নিচে দাঁড়ানো যাবে না।

সামগ্রিকভাবে ভূমিকম্প নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন মানসিক প্রস্তুতি ও সচেতনতা। আকস্মিক দুর্যোগ নিয়ে ভয় থাকা স্বাভাবিক। তবে সচেতনতা ও পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে আতঙ্ক কম থাকে। এতক্ষণ যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা হলো, সেগুলো অন্যদের সঙ্গেও ভাগ করে নিন, তাদেরও বলুন অন্যদের সঙ্গে ভাগ করতে। এতে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে এই সচেতনতা।

ভূমিকম্প হওয়ার পর তাৎক্ষণিক করণীয় কাজ হলো, কম্পন থামলে ধীরে ধীরে চারপাশ দেখে নেওয়া। কোথাও গ্যাসের গন্ধ, বৈদ্যুতিক তার ছেঁড়া বা দেয়ালে নতুন ফাটল দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ করুন। লিফট ব্যবহার করবেন না এবং গুজবে কান না দিয়ে বিশ্বস্ত উৎস থেকে তথ্য নিন।

পাশাপাশি যারা নতুন ভবন নির্মাণের কথা ভাবছেন, তারা দক্ষ ও যোগ্য লোক দিয়ে জমির মাটির ভারবহন ক্ষমতা পরীক্ষা করে নিন। পেশাদার স্থপতিকে দিয়ে ভবনের নকশা করান- যেন তাতে জরুরি নির্গমনপথ থাকে। ভবনের কাঠামোগত নকশা বা স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করাতে হবে অভিজ্ঞ ও দক্ষ পুরপ্রকৌশলীর মাধ্যমে। ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং বা ইউটিলিটি সার্ভিস ডিজাইনের কাজও পেশাদার প্রকৌশলীদের। ডিজাইন হাতে পেলে অভিজ্ঞ নির্মাতা বা দক্ষ কারিগরদের মাধ্যমে নির্মাণকাজ পরিচালনা করুন যাতে গুণগত মান এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। নির্মাণকাজ নিবিড়ভাবে তদারকি করুন। বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে (বিএনবিসি) সেটব্যাকের নিয়ম থেকে শুরু করে আর্থকোয়েক জোন অনুযায়ী ডিজাইন ক্রাইটেরিয়া নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। প্রকল্পের মালিক হিসেবে আপনার দায়িত্ব হলো, নিয়মনীতির কোনো ব্যত্যয় যেন না ঘটে তা নিশ্চিত করা। এতেই আপনার ‘দুর্যোগের পূর্বপ্রস্তুতি’ অনেকাংশে সম্পন্ন হবে।

লেখক : স্থপতি ও সাংবাদিক


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা