বিশেষ লেখা : দুর্যোগ মোকাবিলা
আদিল মুহাম্মদ খান
প্রকাশ : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১১:৩৯ এএম
আদিল মুহাম্মদ খান, প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)
ঢাকা এমন একটি মহানগর, যেটি জনসংখ্যা, অবকাঠামো, ভবনের ঘনত্ব এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে অনেক আগে থেকেই বিপর্যস্ত। তার ওপর সম্প্রতি ঢাকা ও এর আশপাশে বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। এই ভূমিকম্পগুলো নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের কঠিন এক প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে- এই কম্পনগুলো কি বড় কোনো বিপর্যয়ের পূর্বাভাস?
মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে রাজধানী ঢাকাসহ নরসিংদী-মাধবদী-টঙ্গী অঞ্চলে ৫.৭, ৪.৩, ৩.৭ এবং ৩.৩ মাত্রার একাধিক ভূকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। ভূতত্ত্ববিদদের ভাষায়, এই ধারাবাহিকতা এ অঞ্চলের সক্রিয় ফল্ট লাইনের চাপ বৃদ্ধি ও পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে যে শক্তি ভূগর্ভে জমে ছিল, তা এখন টুকরো টুকরো হয়ে বেরিয়ে আসছে। এর পরিণতি কী হতে পারেÑ এ প্রশ্নই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকার ৩০ শতাংশের বেশি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে : ঢাকা তিনটি সক্রিয় ফল্ট লাইনের সংযোগে দাঁড়িয়ে আছেÑ মাধবদী ফল্ট, মধুপুর ফল্ট এবং ত্রিপুরা-ব্রহ্মপুত্র ফল্ট। এর ওপর রয়েছে লাখ লাখ পুরনো ও নির্মাণকোড-বহির্ভূত ভবন। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে ঢাকা নগরীর ৩০ শতাংশের বেশি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে পুরান ঢাকা, মিরপুর, গাজীপুর, টঙ্গী, মালিবাগ-মগবাজারসহ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা। যে শহরে ভবনের আগুনে বড় বিপর্যয় ঘটার নজির রয়েছে, সেখানে বড় আকারের ভূমিকম্প কতটা ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেÑ তা অনুমান করা কঠিন নয়।
প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, জরুরি প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন
ঢাকা মহানগরীতে যেকোনো মাঝারি থেকে বড় ধরনের ভূমিকম্প শহরকে দুর্যোগের মুখে ঠেলে দিতে পারে। প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত, জরুরি প্রস্তুতি ও বাস্তবায়ন। কিন্তু আমাদের নগর প্রশাসন ও নীতিনির্ধারণী প্রস্তুতি তার সঙ্গে কি তাল মিলিয়ে চলেছে? ভবন অডিট কি যথাসময়ে শেষ হচ্ছে? বিদ্যালয়, হাসপাতাল, উন্মুক্ত মাঠ- এসব জরুরি স্থাপনা কি দুর্যোগসহনশীলভাবে প্রস্তুত? আমাদের উদ্ধারকারী বাহিনী কি বহুতল ভবনধস মোকাবিলায় পর্যাপ্ত সরঞ্জামে সজ্জিত? প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর, কিন্তু প্রয়োজনীয়।
এখনও সময় আছে। বড় ক্ষতি না হলেও এই ঘন ঘন ভূমিকম্প আমাদের সতর্কবার্তা দিয়েছে। নগর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বিল্ডিং অডিট, ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামোর পুনর্নির্মাণ, জরুরি খোলা জায়গার সংরক্ষণ, কমিউনিটির প্রস্তুতি এবং গণসচেতনতা- সবই এখন জরুরি জাতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আমরা দুর্যোগ প্রতিরোধে বিশ্বে একাধিক সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছি। সেসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ঢাকাকে এখনই ভূমিকম্প-সহনশীল নগরে রূপান্তর করা যায়।
ঢাকার নগরায়ণ : ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ডসহ নানা ঝুঁকি
দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ মহানগর ঢাকা আজ এক বহুমাত্রিক সংকটের মুখোমুখি। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। এই অবিশ্বাস্য ঘনত্ব শহরকে শুধু চাপের মুখেই ফেলেনি, বরং ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ডসহ নানামুখী দুর্যোগে ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে। দ্রুত ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, অনানুষ্ঠানিক বসতির বিস্তার, নির্মাণবিধির দুর্বল প্রয়োগ এবং পরিবেশগত অবক্ষয় মিলে ঢাকা আজ বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। এমনকি বড় ভূমিকম্পের কারণে দূর্বল গ্যাস ও বিদ্যুৎ এর লাইন বিপর্যস্ত হয়ে সেখান থেকেও বড় আকারের অগ্নিকাণ্ড শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অপরিকল্পিতভাবে ও অব্যবস্থাপনায় পরিচালিত কেমিক্যাল গোডাউন বা শিল্প এলাকা থেকেও ছড়িয়ে পড়তে পারে আগুনÑ যা পরবর্তী সময়ে নগরের আবাসিক এলাকাসহ অন্যান্য এলাকার ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের কারণ হতে পারে।
নগরায়ণ ও জনসংখ্যার ঘনত্ব
ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ও নগর সম্প্রসারণ যথাযথ পরিকল্পনা অনুসরণ করে হয়নি। ফলে অপর্যাপ্ত অবকাঠামোর বিপরীতে শহরজুড়ে গড়ে উঠেছে বিক্ষিপ্ত সুউচ্চ ভবন, অতিঘন অনানুষ্ঠানিক বসতি। এই অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ শহরে নাগরিকদের বিপন্নতা বাড়িয়েছে। ভূমিকম্প, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগ-সহনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে।
ভবন কাঠামো ও ঝুঁকি
রাজউক, ডিএনসিসি, ডিএসসিসি ও ফায়ার সার্ভিসের মূল্যায়নে দেখা যায়, ঢাকার বিপুলসংখ্যক ভবনই ভূমিকম্প-সহনশীল নয়। আইন ও কোড থাকলেও এর প্রয়োগ দুর্বল; অনুমোদন, পরিদর্শন ও তদারকিÑ সব ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলার অভাব। বিশেষ করে পুরান ঢাকার চকবাজার, বংশাল, লালবাগের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ভবনগুলো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি
সরু রাস্তা, যানজট এবং ফায়ার সার্ভিসের যাতায়াত-অযোগ্য লেন অগ্নিকাণ্ডে দ্রুত সাড়া দেওয়াকে প্রায় অসম্ভব করে তুলেছে। শহরের পুকুর-খাল ভরাট হওয়ায় অগ্নিনির্বাপণের পানির উৎস কমে গেছে। অধিকাংশ ভবনে জরুরি সিঁড়ি, ফায়ার এক্সিট, ডিটেকশন সিস্টেম কিংবা অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র কার্যকর নয়।
অনিয়ন্ত্রিত ভূমি ব্যবহার ও জলাভূমি ভরাট
ঢাকার জলাধার ও খোলা জায়গা প্রায় বিলুপ্ত; ফলে শহরের পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা কমেছে। জলাভূমি ভরাট করা এলাকায় অবাধে উঁচু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এ সকল এলাকায় ভূমিকম্পের সময় কম্পনপ্রবাহ বেড়ে যায়, ফলে ভবনগুলোর ভূমিকম্প ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।
নগর সংস্থাসমূহের সক্ষমতা ও সমন্বয়ের সংকট
নগর ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থার দায়িত্ব থাকলেও সমন্বয়হীনতা প্রকট। রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভাগÑ সবাই আলাদা আলাদাভাবে কাজ করে। দুর্যোগ প্রস্তুতির মহড়া ও নাগরিক সচেতনতা খুবই সীমিত।
দুর্যোগ-সহনশীল নগর পরিকল্পনার অভাব
ঢাকার বেশিরভাগ ভবনই উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন ভবন নির্মাণেও বিল্ডিং কোডের প্রয়োগ নেই। পুরান ঢাকার ঝুঁকি এখন পুরো শহরেই ছড়িয়ে পড়েছে। আবাসিক এলাকায় কারখানা, গুদাম, রাসায়নিক ব্যবসা থাকার কারণে বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শহরে খোলা জায়গা, আশ্রয়কেন্দ্র ও জরুরি সেবাকেন্দ্রের ঘাটতি বড় দুর্যোগ মোকাবিলায় সক্ষমতাহীনতা সৃষ্টি করেছে। বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতিগুলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু সেগুলোর উন্নয়ন বা পুনর্বাসনে স্পষ্ট রূপরেখা নেই। শিল্প ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম আবাসিক এলাকায় ঢুকে গিয়ে নিরাপত্তা সংকট বাড়িয়েছে। পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও তদারকিÑ এই তিন স্তর আলাদা কর্তৃপক্ষের হাতে, ফলে কেউই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। রাজনৈতিক প্রভাব ও নগর সংস্থাসমূহের দুর্নীতি আমাদের নগরকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করেছে।
ভূমিকম্প ও দুর্যোগ সহনশীল ঢাকা গড়তে করণীয়
স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ : স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগগুলো ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। পুরান ঢাকা, মতিঝিল, মগবাজার, মোহাম্মদপুরসহ অতিঝুঁকিপূর্ণ এলাকা জরিপ করে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা প্রকাশ করতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তার বাধ্যতামূলক অভিযান করে গুদাম, রাসায়নিক ব্যবসা ও বাণিজ্যিক ভবনে বসবাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়াতে হাইড্রোলিক ল্যাডার, মোবাইল ইউনিট ও নতুন ফায়ার স্টেশন স্থাপন করতে হবে। জরুরি পানির উৎস পুনরুদ্ধার করতে পুকুর-খাল পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি গঠন করে নির্মাণ কোডের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
মধ্যমেয়াদি উদ্যোগ : এক থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রেট্রোফিটিং বাধ্যতামূলক করা দরকার। স্কুল, হাসপাতাল, সরকারি ভবনগুলোতে অগ্রাধিকার দিয়ে এই কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। পুরান ঢাকার মতো অতিঝুঁকিপূর্ণ এলাকার জন্য রাস্তা প্রশস্তকরণ, ফায়ার লেন তৈরি ও রাসায়নিক ব্যবসা স্থানান্তরের উদ্যোগ নিতে হবে। আবাসিক এলাকা থেকে শিল্প ও গুদাম অপসারণ করা প্রয়োজন। অনুমোদন ও পরিদর্শনের পূর্ণ অনলাইন স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল বিল্ডিং পারমিট সিস্টেমের পূর্ণ বাস্তবায়ন দরকার।
দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ : নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা থাকলে ৫ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব। নগর সরকার গঠন করে রাজউক, সিটি করপোরেশন ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে এক প্রশাসনিক কাঠামোয় আনা একান্ত দরকার। এজন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। উন্নয়নের বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে নতুন প্রবৃদ্ধিকেন্দ্র তৈরি করে ঢাকার ওপর চাপ কমানো প্রয়োজন। ভূমিকম্প, অগ্নি, জলবায়ু ঝুঁকি অন্তর্ভুক্ত করে ও নিরাপত্তাকে প্রাথমিক মানদণ্ড নির্ধারণ করে শহরের রিস্ক-সেনসিটিভ স্পেশাল প্ল্যান তৈরি করতে হবে। নির্মাণ শিল্পে প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে ভূমিকম্প-সহনশীল ভবন নির্মাণ করতে হবে। নাগরিক সচেতনতা ও দুর্যোগ প্রস্তুতির জন্য ড্রিল, স্কুলভিত্তিক শিক্ষা, কমিউনিটি টিম গঠন করতে হবে।
আগামীর প্রত্যাশা
ঢাকা শুধু জনসংখ্যার দিক থেকে নয়, ঝুঁকির দিক থেকেও বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক শহরগুলোর একটি। ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডÑ যেকোনো বড় বিপর্যয় মুহূর্তেই লাখো কোটি মানুষের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।ভূমিকম্পসহ যেকোনো দুর্যোগ বিবেচনায় নিয়ে নিরাপদ ঢাকা গড়তে প্রয়োজন কঠোর নির্মাণবিধি প্রয়োগ; প্রয়োজন দুর্যোগ-সহনশীল উন্নয়ন পরিকল্পনার পাশাপাশি রাজনৈতিক সদিচ্ছা। ঢাকাকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে তুলতে কার্যকর নগর পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। এই লক্ষ্যসমূহ অর্জনের পথে যেকোনো ধরনের আপসকামিতা আমাদের নাগরিক জীবনের বিপন্নতা আরও বাড়িয়ে দেবে।