ফরিদা আখতার
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:০৯ পিএম
আমি যখনই একাত্তরের কথা মনে করার চেষ্টা করি আমার কাছে কয়েকটি বিশেষ মুহূর্ত খুবই প্রধান হয়ে ওঠে। সে মুহূর্ত বা সময় এখন অনেক দূরের কিন্তু মনে করতে গেলেই মনে হয় এই তো সেদিনের কথা। আমি তখন কেবল ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছি। চট্টগ্রাম কলেজে অর্থনীতিতে অনার্স ক্লাসে ভর্তি হয়েছি।
হঠাৎ যুদ্ধ। আমি তখন চট্টগ্রামে। মার্চ মাসের শুরু থেকেই বুঝতে পারছিলাম যে ঘটনা অন্যদিকে যাচ্ছে। চারদিকে তারই আভাস পাচ্ছিলাম। রেডিও শোনা আমাদের নিয়মিত কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ৭ মার্চ শেখ মুজিবের বক্তৃতা মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। খুবই উজ্জীবিত হলাম।
আমি নিয়মিত ডায়রি লিখতাম না। তবে ১৯৭১-এ আমি যা যা শুনেছি, আমার একটি ডায়রিতে লিখে রেখেছিলাম। ডায়রিটি এখনও আমার কাছে আছে। বছরের শুরুতে কিছু লিখেছিলাম, তবে যুদ্ধের ঘটনা বলতে গেলে জুন মাস থেকে লেখা শুরু। তবে ২৩ নভেম্বরের পর আর লিখতে পারিনি। কারণ আমাদের এলাকায় পাকসেনাদের উৎপাত বেড়ে গিয়েছিল। প্রায়ই তারা মুক্তিযোদ্ধা খুঁজতে আসত। বাড়ি বাড়ি হঠাৎ ঢুকে তল্লাশি চালাত। আব্বা জানতেন যে, আমি ডায়রি লিখি। তিনি ভয় পেয়ে গেলেন, কারণ এই ডায়রি যদি পাকসেনাদের সহযোগী রাজাকাররা দেখে তাহলে মহাবিপদ হবে। তিনি ডায়রিটি পুড়িয়ে ফেলতে চাইলেন। আমি কান্নাকাটি করতে লাগলাম। পরে বুদ্ধি করে বাসার ভেতরে ভেন্টিলেটরের মধ্যে চড়ুই পাখির বাসার ভেতরে গুঁজে রাখলাম। পাকসেনা ঠিকই একদিন আমাদের বাসায় হানা দিয়েছিল। আমার ভীষণ ভয় লেগেছিল, গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারা চড়ুই পাখির বাসায় হাত দেয়নি। ভাগ্য ভালো। সে কারণে আজও ডায়রিটি আমার হাতে আছে। ডায়রিটি পড়তে গিয়ে আমার এখনকার অনুভূতির সঙ্গে মেলাতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি যে, মুক্তিযুদ্ধ সবকিছুকেই ভিন্নভাবে দেখতে শিখিয়েছিল। যেমন ৬ জুন আমি লিখেছিলাম : ‘সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছে অঝোর ধারায়। বর্ষা এসে গেছে। অবশ্য এ বর্ষা ইনশাআল্লাহ আমাদের জন্য সুখবর বয়ে আনতে পারে কারণ পাকিস্তানি সেনারা বর্ষায় পূর্ব বাংলায় টিকতে পারবে না। আমাদের মুক্তিফৌজ এই সুযোগে অনেক কিছুই করতে পারবে...।’ মনে হতো যে প্রকৃতিও আমাদের সহায়। আমার মনে হতো পশ্চিম পাকিস্তানে বৃষ্টি হয় না। তাই সেখানকার সেনারা বর্ষায় গ্রামে কী অবস্থা হয় তা জানবে না। এই ভেবে খুশি থাকতাম বৃষ্টি হলেই।
আমি প্রতিদিন স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতাম। এটাও ছিল আমার নেশার মতো। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে পাওয়া খবরগুলো শুনে বুঝতে পারতাম আমরা কোন দিকে এগোচ্ছি। ১১ জুন শুনলাম, ‘নিজের অভিজ্ঞতা থেকে’ নামক অনুষ্ঠানে আশরাফুল আলম পাক সরকার নিয়ন্ত্রিত ঢাকা বেতারের সকল গোপন জালিয়াতি ফাঁস করে দিয়েছেন। মিথ্যা প্রচার ও বর্বরতা চরম সীমায় পৌঁছে গেছে। ১৭ জুন শুনলাম বাংলাদেশের একটি ফুটবল টিম হবে এবং কয়েকটি প্রদর্শনী ম্যাচ খেলে তারা বাংলাদেশের জন্য টাকা আয় করবে। ২১ জুন শুনলাম ঢাকার জনৈক পিআইএ সিকিউরিটি অফিসার এসআর হোসেন নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কথিকায় পাকিস্তানের অনেক কারসাজি ফাঁস করে দিলেন। অনেক বাঙালি কর্মচারী ছাঁটাই করা হয়েছে। এর পরিবর্তে অনেক অবাঙালিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানালেন এমনিতেই পিআইএতে মাত্র ১৫% বাঙালি নেওয়া হতো আর তাও নিম্ন বেতনভুক্ত। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এদের ওপর অনেক অত্যাচার হয়েছে। শুনতে শুনতে রেগে গিয়ে লিখেছিলাম ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হোক। বাঙালিরা অনেক সহ্য করেছে। এসব ঘটনা শুনে আর কল্পনা করতে পারি না যে ওদের সঙ্গে আপস হবে। আর আপস নয়, এবার স্বাধীনতা চাই। ২৩ জুন ‘সাংবাদিকদের ডায়রি’ নিবন্ধে একটি কথিকা হলো। এতে রাজশাহীর সিপাই ভাইদের কঠিন আত্মত্যাগের কাহিনী ছিল। শত শত পুলিশ উদ্বুদ্ধ হয়ে
হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নিয়েছে। শুনে আমার খুব লজ্জা লেগেছিল। আমি লিখেছিলাম। পুলিশ সম্পর্কে আমাদের সবসময় ধারণা তারা ঘুষ খায়, তাই কোনো দিন সহজভাবে নিইনি। কিন্তু এই ঘটনা শুনে মনে হলো তারা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে।
২৮ জুন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বক্তৃতা দিল। তার বক্তৃতা সবাই শুনেছে ঠিকই সবাই অপেক্ষা করছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এই ব্যাপারে কী বলে। সেদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র কোনো মন্তব্য করেনি। আকাশবাণীও কিছু বলেনি। তবে খবরের পরপরই ইংরেজিতে একটি বিশেষ প্রোগ্রাম ‘conquerer spoke’ প্রচার করা হয়। এই ভাষণের ওপর অনেক বিদ্রূপ করা হয়। জানতে পারলাম ভারতের পার্লামেন্টে সারাদিন বাংলাদেশ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে। অনেকেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি তুলেছেন।
আমাদের পাড়ার অনেকে বললেন এভাবে ইপিআরের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায়...। হয়তোবা।
৩ জুলাই স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের খবরে শুনলাম মার্কিন ফেডারেল পার্টি মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে কেন তারা পাকিস্তানে বাংলাদেশে গণহত্যার জন্য অস্ত্র পাঠাচ্ছে। এই আমেরিকা এখনও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মানুষের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপ করছে। তারা নিজেরাই এখন হানাদার বাহিনী। তাদের চরিত্র একই রয়ে গেছে, অথচ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো মার্কিন সরকারের সহযোগিতায় ক্ষমতায় থাকতে চায়। তাহলে আমরা এত কষ্ট করে কেন স্বাধীন হলাম। আজ ২০০৫-এ বসে লিখতে গিয়ে আমার মনে কষ্ট হচ্ছে।
১১ জুলাই আমরা আমাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেদিনের লেখা থেকে একটু তুলে ধরছিÑ দুপুর ১২টায় গ্রামের বাড়ির পথে রওনা হলাম। পথে ধ্বংসলীলা দেখেছি। ঘরের পর ঘর দোকানের পর দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
অনেকগুলো ধসে পড়ে আছে। কালুরঘাট ব্রিজে এসে বাস থামল। একজন রেঞ্জার উঠল চেক করার জন্য কিন্তু বিশেষ কিছু চেক করল না। বুঝতে পারছি এভাবে চেক করতে করতে ওরাও হাঁপিয়ে উঠেছে। তাই ফাঁকি দিতে শুরু করেছে।
গ্রামের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের মধ্যে দুদল গড়ে উঠেছে। কেউ আওয়ামী লীগের পক্ষে, কেউ মুসলিম লীগের পক্ষে। বাড়ির প্রায় সব মহিলাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আর ছেলেদের মধ্যে অল্প বয়স্করা। কিন্তু বয়স্ক পুরুষরা অবুঝের মতো কথা বলছে। তারা স্বাধীন বাংলা বেতার শুনতে দিচ্ছে না। আমি নিয়মিতভাবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র শুনি বলে একজন মুরব্বি গোছের আমার সঙ্গে দেখাই করলেন না। তবুও দাদা ও নানা বাড়িতে বসে আমি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শুনলাম। সেদিন রক্তের স্বাক্ষর অনুষ্ঠান শুনলাম, কয়েকজনের চিঠি পড়া হয়েছে। ফেরার পথে কালুরঘাট ব্রিজে আবার চেক হলো। এবার পাকসেনা। সে উঠে অনেককে কালেমা পড়াল। খুব রাগ হলো আমার। কী মনে করছে তারা। আমরা কি ওদের মতো মুসলমান নই?
স্বাধীন বাংলা বেতারে দৃষ্টিপাত অনুষ্ঠানে শুনলাম কয়েকজন মুক্তিফৌজ অবসর সময় গান করছিল, আর ওরা নাকি নাটকও করবে। মুক্তিফৌজদের খুশি রাখার জন্য তারা এই কাজ করছিল। শুনে খুব ভালো লাগল। ১৮ জুলাই লক্ষ্য করলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে কয়েকটি নতুন অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়েছে যেমন কচিকাঁচার ডালি, স্কুলের ছেলেমেয়েদের জন্য অনুষ্ঠান, উর্দুতে বিশেষ অনুষ্ঠান, রাজনৈতিক পরিক্রমা ও জল্লাদের দরবার। সবই উপভোগ্য হয়েছে। রাত ৮টা ২০ মিনিটে শুরু হয়ে ১০টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত চলে।
সকালে একটানা মেঘের গর্জন হয়েছিল আর আমরা সবাই ভেবেছিলাম বোমা ফুটছে। পরে জানতে পেরে খুব হেসেছিলাম। তবে ব্যাপারটা আরও অনেকের ক্ষেত্রে হয়েছে। অর্থাৎ আমরা সবাই চাইছিলাম মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অভিযান চালিয়ে যাক। তাই বর্ষাকালেও মেঘের গর্জন নয়, বোমার শব্দই আশা করছিলাম।
এরই মধ্যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শুনলাম শেখ মুজিবের বিচার হবে। মনে মনে ভয়ে কাটিয়েছি অনেক দিন। যদি মেরে ফেলে? ২৮ জুলাই থেকে চরমপত্রের পরিবর্তে ‘জল্লাদের দরবার’ এবং শেখ মুজিবের বিচার প্রহসন এই নিয়ে অনুষ্ঠান হয়েছে। ৩ আগস্ট শুনলাম পাক সরকার কবরী ও আব্দুল জব্বারকে মার্শাল ল’ কোর্টে ডেকেছে, ১২ আগস্টের মধ্যে হাজির হতে হবে, নইলে তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার করা হবে। সেদিন আমার জন্য খুশির খবর ছিল মুক্তিফৌজরা সিলেট এয়ারপোর্টে মেশিনগানের গুলিতে বিমান ভূপাতিত করেছে। খবরটি আমি আকাশবাণীতে শুনি। খুশিতে আত্মহারা হয়ে আমি ঘুমাতে গিয়েছিলাম সেই রাতে।
আগস্ট মাসের শেষে দেখলাম স্বাধীন বাংলা বেতারে কিছু পরিবর্তন এসেছে। সকালে শুধু খবর ও বজ্রকণ্ঠ, দুপুরেও তাই, রাতে অগ্নিশিখা, খবর ও বজ্রকণ্ঠ হয়ে শেষ। আমি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লাম। কোনো অঘটন ঘটল না তো?
এই লেখায় আমি পুরো নয় মাসে যা লিখেছি, তা লিখতে পারব না। আমার স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান শোনা একদিনের জন্যও থামেনি। প্রতিদিন শুনেছি। এরই মধ্যে চট্টগ্রামে আমরা যে বাড়িতে থাকতাম, সে পাড়ার ছেলেরাও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে।
এতদিন যাদের কথা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে শুনতাম, এখন দেখি তারা আমাদের আশপাশে আছে। আবু ভাইরা এখন মুক্তিযোদ্ধা। নভেম্বর মাসে শুনলাম মিলিটারি এসে আবু ভাইদের বাসা নাকি উড়িয়ে দেবে। আবু ভাইদের একমাত্র বোন হেলেন তাদের বাসায় থাকতে পারত না। সে রাতে আমাদের বাসায় এসে ঘুমাত। মিলিটারির ভয়ে আমাদের পাড়ার অনেক পরিবার বিশেষ করে যারা ভাড়া বাসায় থাকেন, তারা চলে যেতে লাগলেন। আমরা কেবল নতুন বাড়ি করে এসেছিলাম। সেখানে আমার মা মুরগি পালছেন, গাছপালা লাগিয়েছেন। যখনই যাওয়ার কথা হয় আম্মা আর কটা দিন দেখি বলে। এভাবে শেষ পর্যন্ত আমাদের যাওয়া হলো না। আমি নিয়মিত আবু ভাইদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। মনে হচ্ছিল স্বাধীন হয়েই যাব। যেকোনো দিন। ধীরে ধীরে কাপড় কিনে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে পাওয়া নির্দেশ অনুযায়ী পতাকা সেলাই করে ফেললাম। সেবার নভেম্বর মাসে ঈদ হয়েছিল। আমি ঈদের কাপড় কেনার সময় সবুজ রঙের কাপড় একদিন, হলুদ কাপড় একদিন আর লাল কাপড় একদিন এভাবে ছিট-কাপড় ফেরিওয়ালার কাছ থেকে কিনলাম। বাড়িতেও কেউ বুঝতে পারেনি।
ভেন্টিলেটরের মধ্যে চড়ুইপাখির খড়ের বাসার নিচে লুকিয়ে রেখে ডায়রিটি রক্ষা পেল, কিন্তু বিজয় দিবসের আগ পর্যন্ত আর লেখা হলো না।
ফরিদা আখতার, উন্নয়নকর্মী, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা