× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

তথাকথিত ‘বিজয় দিবস’

আধিপত্যের বয়ান বনাম রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর ভাষা

ফরহাদ মজহার

প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১০:১৪ এএম

আধিপত্যের বয়ান বনাম রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর ভাষা

বিজয় দিবস বাংলাদেশ ও ভারতে বিশেষ দিন হিসেবে পালন করা হয়। প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর দিনটি বিশেষভাবে পালিত হয়। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দিনটিকে বাংলাদেশের ‘জাতীয় দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দিনটি সরকারি ছুটির দিন। নয় মাস মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর প্রায় ৯১ হাজার ৬৩৪ জন সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। এর ফলে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।

বাংলাদেশের বিজয় দিবস (১৬ ডিসেম্বর) ভারত কীভাবে দেখে? এই প্রশ্নটি আসলে স্মৃতি, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও আঞ্চলিক ক্ষমতা বা ভূরাজনৈতিক প্রশ্ন। ভারতীয় বয়ান এখানে আবেগী মৈত্রীকথা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক সামরিক-কূটনৈতিক আখ্যান, যেখানে বাংলাদেশের বিজয় দিবস প্রধানত ভারতের নিজস্ব ঐতিহাসিক বিজয়ের সম্প্রসারণ হিসেবে হাজির করা হয়। এই বয়ান বোঝা জরুরি, কারণ তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক সত্তা গঠন বা রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের গঠন করার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় গভীর প্রভাব ফেলেছে।

বিজয় দিবস ভারতের কাছে কী : ‘ভারতের ১৯৭১ সালের সামরিক বিজয়ের দিন’

ভারতের প্রধান রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক বয়ানে ১৬ ডিসেম্বর মূলত ‘Indo-Pak War of 1971’-এর বিজয় দিবস। ভারতীয় সেনাবাহিনী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসগ্রন্থে এই দিনটি চিহ্নিত হয় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের চূড়ান্ত সামরিক সাফল্য হিসেবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এখানে উপস্থিত, কিন্তু তা মূল ঘটনা নয়; এটি ভারতের যুদ্ধজয়ের ফলাফল।

ভারতের সরকারি ইতিহাসগ্রন্থ History of the Indo-Pak War, 1971-এ ১৬ ডিসেম্বরকে স্পষ্টভাবে “Pakistan’s surrender to Indian Armed Forces” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যেখানে মুক্তি বাহিনীকে সহযোগী শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়, কিন্তু কেন্দ্রীয় কর্তা হিসেবে নয় (দেখুন, S. N. Prasad, Ministry of Defence, India, 1992, pp. 390-405)।

এই বয়ানে বিজয় দিবস মানেÑ ভারতীয় সেনাবাহিনীর পেশাদারত্ব, কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং জাতীয় গৌরবের পুনরুদ্ধার।

ভারতীয় সামরিক স্মৃতিতে ১৬ ডিসেম্বর : ১৯৬২-এর ক্ষত মোচনের মুহূর্ত

ভারতের জাতীয় স্মৃতিতে ১৯৭১ বিশেষ গুরুত্ব পায় ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে পরাজয়ের বিপরীতে। সে কারণে ১৬ ডিসেম্বর ভারতের কাছে শুধু একটি আঞ্চলিক যুদ্ধজয় নয়, বরং জাতীয় আত্মসম্মান পুনরুদ্ধারের দিন।

ভারতীয় সামরিক ইতিহাস ও জনপ্রিয় লেখালেখিতে ১৯৭১-এর নায়ক হিসেবে উঠে আসেন স্যাম মানেকশ, জগজিৎ সিং অরোরা প্রমুখ। ঢাকার রেসকোর্সে আত্মসমর্পণের দৃশ্যটি ভারতীয় সামরিক সংস্কৃতিতে এক ধরনের ‘iconic moment’ হয়ে ওঠে। এই স্মৃতিতে বাংলাদেশের জনগণ বা তাদের রাজনৈতিক সংগ্রাম গরহাজির হয়ে যায়, এর অন্তর্নিহিত ভাষ্য এই দাবিকেই জারি রাখে যে, বাংলাদেশের অভ্যুদয় আদতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিজয় মাত্র। বাংলাদেশের জঙ্গণের রাজনৈতিক সত্তাকে অস্বীকার করার এই বয়ানই আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

শ্রীনাথ রাঘবন (Srinath Raghavan) দেখিয়েছেন, ভারতীয় জনপরিসরে ১৯৭১ স্মরণ করা হয় “India’s decisive victory over Pakistan”; যেখানে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে জন্মায় ভারতের কৌশলগত সাফল্যের ফল হিসেবে (দেখুন, Raghavan, 1971: A Global History of the Creation of Bangladesh, Harvard University Press, 2013, pp. 262-275)।

কূটনৈতিক বয়ান : বিজয় দিবস মানে ভারতের ‘নৈতিক যুদ্ধ’

ভারতীয় কূটনৈতিক ভাষ্যে, ১৬ ডিসেম্বর হলো একটি ন্যায়যুদ্ধের সমাপ্তি। এখানে ভারত নিজেকে উপস্থাপন করে এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবেÑ

যে যুদ্ধ চায়নি

কিন্তু শরণার্থী স্রোত ও মানবিক বিপর্যয়ের কারণে বাধ্য হয়েছে

এবং শেষ পর্যন্ত ন্যায় ও মানবাধিকারের পক্ষে জয়ী হয়েছে

ইন্দিরা গান্ধীর বক্তৃতা ও স্মৃতিকথায় ১৯৭১-এর যুদ্ধকে বারবার “forced upon India” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে (দেখুন, Indira Gandhi, Selected Speeches, Publications Division, Govt. of India, 1972, pp. 170-190)। এই বয়ানে বিজয় দিবস বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক মুক্তির দিন নয়; বরং ভারতের নৈতিক অবস্থানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দিন।

এভাবে বাংলাদেশ বিজয় দিবস ভারতের কাছে এক ধরনের নৈতিক পুঁজি (moral capital); যা তারা বৈশ্বিক পরিসরে ব্যবহার করে।

বিজয় দিবস ও ভারতীয় নিরাপত্তা চিন্তা : জনগণের বিপ্লব নয়, রাষ্ট্রের যুদ্ধ

ভারতীয় বয়ানের একটি গভীর কিন্তু প্রায় অঘোষিত দিক হলোÑ তারা কখনোই ১৬ ডিসেম্বরকে জনগণের বিপ্লবী বিজয় হিসেবে দেখতে চায় না। কারণ যদি ১৯৭১-কে জনগণের স্বাধীন সশস্ত্র গণযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে স্বীকার করা হয়, তাহলে একটি বিপজ্জনক নজির দাঁড়ায় : জনগণ রাষ্ট্র ভেঙে নতুন রাষ্ট্র গঠন করতে পারে।

ভারতের নিজস্ব ভূখণ্ডে কাশ্মির, উত্তর-পূর্ব ভারত, পাঞ্জাব ইত্যাদি অঞ্চলের অভিজ্ঞতার কারণে ভারতীয় রাষ্ট্রচিন্তা কখনোই গণবিচ্ছেদকে (popular secession) নৈতিক আদর্শ হিসেবে স্বীকার করে না। তাই বিজয় দিবস তাদের বয়ানে নিরাপদ তখনই থাকে, যখন তা রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায়।

সুনীল খিলমানি (Sunil Khilnani) দেখিয়েছেন, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ জনগণের সার্বভৌমত্বকে নয়, রাষ্ট্রের অখণ্ডতাকেই চূড়ান্ত নীতি হিসেবে ধরে (দেখুন, Khilnani, The Idea of India, Penguin, 1997, pp. 190-200)। এই চিন্তার আলোকে বাংলাদেশের বিজয় দিবসকেও তারা ‘রাষ্ট্রীয় ফলাফল’ হিসেবেই দেখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

বাংলাদেশের বিজয় দিবস ভারতের বয়ানে কেন ‘সহযোগিতার গল্প’

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ ভারতীয় বয়ানে ১৬ ডিসেম্বর প্রায়ই ‘India-Bangladesh friendship’-এর সূচক হিসেবে হাজির হয়। এই ভাষা প্রথম দর্শনে ইতিবাচক মনে হলেও এর ভেতরে একটি অসম ক্ষমতা-সম্পর্ক কাজ করে। বিজয় দিবস এখানে এমনভাবে উপস্থাপিত হয় যেন বাংলাদেশ কৃতজ্ঞ থাকবে, আর ভারত উদার সহায়তাকারী।

এই বয়ান বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীন রাজনৈতিক সত্তাকে দুর্বল এমনকি অস্বীকার করে এবং স্বাধীনতাকে ভারতের করুণা ও সহায়তার ঘটনা বা ফল (assisted independence) হিসেবে হাজির করে। ভারতীয় কূটনীতিক ও স্মৃতিকথায় এই সুর খুবই স্পষ্ট (যেমন : P. N. Haksar-এর নোটস ও স্মৃতিকথা; রাঘবনের বইয়ে pp. 210-230 পাতায় দেখুন)।

সংক্ষেপে বলা যায়Ñ ভারতের কাছে বাংলাদেশের বিজয় দিবস মোটেও (ক) জনগণের গণযুদ্ধের চূড়ান্ত মুহূর্ত নয় (খ) রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর আত্মপ্রতিষ্ঠার দিন নয় (গ) বরং ভারতের সামরিক, কূটনৈতিক ও নৈতিক বিজয়ের দিন এই বয়ান ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বার্থের দিক থেকে বোধগম্য, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক সত্তা গঠন অর্থাৎ নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গড়ে তোলার ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার বিরোধী। দিল্লির সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক বিরোধ এবং ভারতকে বাংলাদেশের জনগণ তাদের শত্রু জ্ঞান করার উপাদান ভারতীয় বয়ানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকারের মধ্যে নিহিত।

বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক শিক্ষা

এই বাস্তবতা আমাদের একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেয় : বাংলাদেশের জনগণের বিজয় অন্য রাষ্ট্রের বয়ানে সংজ্ঞায়িত হলে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সত্তা এবং রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বিকাশও অন্যের হাতে বন্দি থাকে। বাংলাদেশ ভারতের উপনিবেশ মাত্রÑ এই ধারণাই বলবৎ করে। 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের জন্য জরুরি কাজ হলোÑ

১৬ ডিসেম্বরকে ভারতের সামরিক স্মৃতির ছায়া থেকে বের করে এনে, একটি গণসংগ্রাম-গণযুদ্ধ-গণবিজয়-এর রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার ভেতরে পুনঃস্থাপিত করা। তাহলেই বিজয় দিবস উৎসব নয়, বরং জনগণের সার্বভৌম কর্তব্যের স্মারক হয়ে উঠতে পারে। ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসে এক শক্তিশালী প্রতীকী মুহূর্ত। কিন্তু এই ঘোষণার ভেতরেই এমন কিছু ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক জটিলতা নিহিত রয়েছে, যেগুলো বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক চেতনা গঠনে যেমন ভূমিকা রেখেছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে বিভাজনও উৎপন্ন করেছে। বিশেষ করে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নির্ণায়ক ভূমিকা এবং মুক্তি বাহিনীর সর্বাধিনায়কের (General MAG Osmani) আনুষ্ঠানিক অনুপস্থিতিÑ এই দুই বিষয় বিজয়ের বয়ানকে একরৈখিক ও রাষ্ট্রকেন্দ্রিক করে তুলেছে, যা গণযুদ্ধের চরিত্রকে আড়াল করে।

প্রথমত, ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এর ঘটনাটি মূলত একটি সামরিক আত্মসমর্পণের দিন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এই যৌথ কমান্ডে ভারতীয় সেনাবাহিনী ছিল সংখ্যাগত, প্রযুক্তিগত ও কূটনৈতিকভাবে প্রধান শক্তি। ঐতিহাসিক সত্য হলোÑ ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডিসেম্বরের যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় এত দ্রুত সম্ভব হতো না। এই বাস্তবতা অস্বীকার করা যেমন ইতিহাস বিকৃতি, তেমনি এই বাস্তবতাকে একমাত্র বিজয়ের উৎস হিসেবে দাঁড় করানোও মারাত্মক বিকৃতি। এতে নয় মাসব্যাপী জনগণের সশস্ত্র ও অসশস্ত্র প্রতিরোধÑ গ্রামবাংলার গণযুদ্ধ, গেরিলা অপারেশন, শরণার্থী সংকট, আন্তর্জাতিক জনমত গঠনের সংগ্রাম সবকিছুই শেষ পর্যন্ত এক দিনের সামরিক নাটকে সংকুচিত হয়ে পড়ে। হয়ে পড়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ঘটনা হিসেবে। সেটা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের জনগণকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া। 

এই সংকোচনের সবচেয়ে প্রতীকী প্রকাশ হলো মুক্তি বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এমএজি ওসমানীর অনুপস্থিতি। তিনি আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে ছিলেন নাÑ এটি নিছক একটি প্রটোকলগত বিষয় নয়, বরং ক্ষমতার বয়ান কার হাতে থাকবে, তার একটি গভীর রাজনৈতিক ইঙ্গিত। সামরিক বিজয়ের আনুষ্ঠানিক দৃশ্যে মুক্তি বাহিনীর কমান্ডার অনুপস্থিত থাকা মানে জনগণের যুদ্ধকে রাষ্ট্রীয় বিজয়ের অধীন করে ফেলা। এখানে বিজয় আর জনগণের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফল নয়, বরং একটি রাষ্ট্র। রাষ্ট্র সামরিক সমীকরণের ফল হিসেবে দৃশ্যমান হয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধ ধীরে ধীরে ‘জনযুদ্ধ’ থেকে ‘রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ’-এ রূপান্তরিত হয়, যেখানে জনগণ নায়ক নয়, বরং স্মৃতিচারণার বস্তু মাত্র।

এই রূপান্তরের রাজনৈতিক পরিণতি গভীর। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস হিসেবে একমাত্রিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার ফলে জনগণের রাজনৈতিক চেতনা একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় আবদ্ধ হয়ে পড়ে; যেখানে রাষ্ট্রই ইতিহাসের একমাত্র কর্তা। এর তার বিপরীতে ২৬ মার্চ বা ৭ মার্চের মতো দিনগুলোকে কার্যত অস্বীকার করা হয়, যেগুলো জনগণের প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক উত্থান ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার প্রতীক। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মৃতি গৌণ হয়ে যাওয়ার অর্থ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বাংলাদেশের জনগণের ঐতিহাসিক গাঠনিক প্রক্রিয়াকে রুদ্ধ করে দেওয়া। এর ফলে স্বাধীনতার ধারণা জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা (popular sovereignty) থেকে সরে গিয়ে ভূখণ্ড, পতাকা ও সেনা-আত্মসমর্পণের মধ্যে সংকীর্ণ বৃত্তে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই সীমাবদ্ধতা পরবর্তীকালে রাষ্ট্রক্ষমতার একচেটিয়াকরণকে নৈতিক বৈধতা দেয়Ñ রাষ্ট্র বলতে যা বোঝানো হয়, তা জনগণের ওপর আরোপিত হুকুমদার কর্তৃত্বে পরিণত হয়।

এখানেই বিভাজনের প্রশ্নটি সামনে আসে। বিজয় দিবসের রাষ্ট্রীয় বয়ান এমন এক জাতীয় ঐক্যের ভাষা তৈরি করে, যা ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে সহ্য করতে পারে না। যারা মুক্তিযুদ্ধকে গণঅভ্যুত্থান, কৃষক-শ্রমিকের বিদ্রোহ, কিংবা ঔপনিবেশিক ও অভ্যন্তরীণ শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের অংশ হিসেবে দেখতে চান, তারা সহজেই ‘বিজয়বিরোধী’ বা ‘ইতিহাস বিকৃতকারী’ হিসেবে চিহ্নিত হন। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য নৈতিক বিচ্যুতিতে পরিণত হয়। এই প্রবণতা ১৯৭২-৭৫ সময়কালে যেমন দেখা গেছে, তেমনি পরবর্তী দশকগুলোতেও রাষ্ট্র বনাম জনগণের দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করেছে।

আরও একটি সীমাবদ্ধতা হলোÑ ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় বয়ান বাংলাদেশের রাজনৈতিক চেতনায় নির্ভরশীলতার এক নীরব সংস্কৃতি তৈরি করে। বিজয় যদি মূলত একটি সামরিক হস্তক্ষেপের ফল হিসেবে কল্পিত হয়, তবে জনগণের নিজস্ব সংগঠিত ক্ষমতা, আত্মনির্ভর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রগঠনের দায়বদ্ধতা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই মানসিক কাঠামো পরবর্তীকালে বিদেশনীতি, উন্নয়ন-রাজনীতি এবং নিরাপত্তা বয়ানেও প্রতিফলিত হয়; যেখানে জনগণের ক্ষমতার চেয়ে ‘রক্ষাকর্তা শক্তি’র ওপর আস্থা বেশি দেখা যায়।

সুতরাং ১৬ ডিসেম্বরকে বিজয় দিবস হিসেবে অস্বীকার করার প্রশ্ন নয়; প্রশ্ন হলো একে কীভাবে বুঝব। যদি বিজয়কে শুধুই সামরিক আত্মসমর্পণের দিন হিসেবে উদযাপন করা হয়, তবে তা জনগণের রাজনৈতিক চেতনার পরিসর সংকুচিত করে। কিন্তু যদি একে নয় মাসের গণযুদ্ধের একটি সমাপ্তি-চিহ্ন হিসেবে এবং সেই যুদ্ধের অসম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রকল্প, জনগণের সার্বভৌমত্ব, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রগঠন, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণÑ এসবের প্রশ্ন উন্মুক্ত রেখে স্মরণ করা হয়, তবে ১৬ ডিসেম্বর বিভাজনের নয়, বরং নতুন রাজনৈতিক পুনর্গঠনের উৎস হতে পারে।

এই অর্থে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক চেতনার জন্য প্রয়োজন ১৬ ডিসেম্বরকে রাষ্ট্রীয় বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্ত হিসেবে নয়, বরং জনগণের অসমাপ্ত সংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ হিসেবে পুনরায় পাঠ করতে বা পড়তে শেখা।

বাংলাদেশের জনগণের দিল্লিবিরোধিতা কোনো আবেগী বিচ্যুতি নয়

তাহলে বাংলাদেশের জনগণের দিল্লিবিরোধিতা কার্যত তাদের রাজনৈতিক সত্তার উপলব্ধি এবং নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠনের লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ, ভিন্ন কিছু নয়। এই সারকথাটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আরও প্রাসঙ্গিক, ভূরাজনৈতিকভাবে আরও গুরুত্বপূর্ণ এবং আগামী দিনে বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের রাজনীতির নির্ধারক বিষয় হয়ে উঠবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জনগণের দিল্লিবিরোধিতা কোনো আবেগী বিচ্যুতি নয়; এটি তাদের রাজনৈতিক সত্তার উপলব্ধি এবং নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠনের লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরে কেন এই সত্য আরও স্পষ্ট, আরও প্রাসঙ্গিক এবং ভূরাজনৈতিকভাবে আরও নির্ধারক হয়ে উঠবে ও উঠছে; সে সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলে শেষ করব। 

বাংলাদেশের জনগণের দিল্লিবিরোধিতাকে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় ও মধ্যবিত্ত বয়ানে একটি ‘অপরিণত জাতীয়তাবাদী আবেগ’, ‘অজ্ঞতা’ বা ‘বহির্শক্তির প্ররোচনা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই ব্যাখ্যা মূলত রাজনৈতিক জনগোষ্ঠীর ধারণাকেই অস্বীকার করে। বাস্তবে দিল্লিবিরোধিতা এখানে কোনো বিদেশবিদ্বেষ নয়; এটি একটি সীমান্তবর্তী, অসম ক্ষমতাসম্পন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণের নিজেদের রাজনৈতিক মর্যাদা রক্ষার প্রবৃত্তি। জনগণ যখন উপলব্ধি করে যে, তাদের রাষ্ট্র, ইতিহাস, বিজয় ও স্বাধীনতা অন্য রাষ্ট্রের বয়ানের অধীনে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে, তখন সেই অধীনতাকে অস্বীকার করাই রাজনৈতিক আত্মপরিচয়ের প্রথম ধাপ। এই অর্থে দিল্লিবিরোধিতা কোনো নেতিবাচক অনুভূতি নয়, বরং একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক চিহ্ন; নিজেদের ইতিহাস ও রাজনীতির কর্তা হিসেবে চিনতে শেখার লক্ষণ।

১৯৭১-পরবর্তী ইতিহাসে দিল্লিবিরোধিতা কেন দমিয়ে রাখা হয়েছিল

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের গঠনের প্রক্রিয়া দ্রুত থেমে যায়। কারণ রাষ্ট্রের বৈধতা নির্মাণে ১৯৭১-এর যুদ্ধ ও বিজয়কে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়, যেখানে ভারতের ভূমিকা প্রশ্নাতীত হয়ে ওঠে। এর ফলে দিল্লিবিরোধিতা ধীরে ধীরে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’, ‘মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধিতা’ বা ‘পাকিস্তানপন্থা’র সমার্থক বানানো হয়। এই দমনমূলক বয়ানের ফলে জনগণের একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রবৃত্তি, বড় প্রতিবেশীর আধিপত্য প্রশ্ন করা, অনৈতিক বলে চিহ্নিত হয়। ফলে দি দিল্লিবিরোধিতা আর জনগণের সংগঠিত রাজনৈতিক অবস্থান হতে পারেনি; তা রয়ে গেছে ছিটেফোঁটা ক্ষোভ, গুজব বা আবেগের স্তরে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এই ঐতিহাসিক বিকৃতি ভেঙে দিয়েছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান : জনগণের ‘পরাধীনতা ভাঙার’ মুহূর্ত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মৌলিক তাৎপর্য এখানেই যে, এটি জনগণকে দেখিয়েছেÑ রাষ্ট্র, দল, বিদেশি মিত্র কেউই শেষ বিচারে তাদের রক্ষা করবে না। এই উপলব্ধি শুধু অভ্যন্তরীণ শাসকের ক্ষেত্রেই নয়; এটি আঞ্চলিক ক্ষমতার ক্ষেত্রেও সত্য। জুলাইয়ের সহিংসতা, দমননীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট করেছেÑ বাংলাদেশের জনগণের রক্তপাত আঞ্চলিক শক্তির কাছে একটি ‘ম্যানেজেবল ইভেন্ট’ মাত্র। এই অভিজ্ঞতা দিল্লিবিরোধিতাকে আবেগের স্তর থেকে তুলে এনে রাজনৈতিক চেতনার স্তরে উন্নীত করেছে। বাংলাদেশের জঙ্গণের দিল্লিবিরোধিতা ভারতীয় জঙ্গণের বিরোধতা নয়। এখন দিল্লিবিরোধিতা মানে কেবল ক্ষোভ নয়; মানে প্রশ্ন করাÑ আমাদের রাষ্ট্র কার স্বার্থে পরিচালিত হচ্ছে, আমাদের বিজয়ের ব্যাখ্যা কার হাতে, আমাদের নিরাপত্তা কার কৌশলের অংশ? ইত্যাদি।

কেন জুলাইয়ের পর দিল্লিবিরোধিতা আরও প্রাসঙ্গিক

জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের সামনে যে কর্তব্য হাজির হয়েছে তা হলো, নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠন। এই গঠন সম্ভব নয়, যদি জনগণ নিজেদের চিরকাল কোনো ‘রক্ষক’, ‘মিত্র’ বা ‘বড় ভাই’-এর ছায়ায় কল্পনা করে। দিল্লিবিরোধিতা এখানে একটি নেতিবাচক সম্পর্কচ্ছেদ নয়, বরং একটি প্রয়োজনীয় দূরত্ব নির্মাণ; যার মাধ্যমে জনগণ নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে। জুলাই দেখিয়েছে, রাষ্ট্রের ভেতরের ক্ষমতা যেমন প্রশ্নাতীত থাকতে পারে না, তেমনি রাষ্ট্রের বাইরের প্রভাবও প্রশ্নাতীত থাকতে পারে না। এই প্রশ্ন তোলার রাজনৈতিক ভাষাই দিল্লিবিরোধিতা।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে দিল্লিবিরোধতা এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্বরাজনীতি এখন স্পষ্টভাবে বহু মেরুকেন্দ্রিক। দক্ষিণ এশিয়া আর ‘স্থিতিশীল পেছনের উঠান’ নয়; এটি চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতার এক সক্রিয় ক্ষেত্র। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জনগণের দিল্লি বিরোধিতা একটি নতুন তাৎপর্য পায়। এটি বোঝায়, বাংলাদেশ কেবল রাষ্ট্রীয় এলিটদের মাধ্যমে নয়, জনগণের মধ্য দিয়েও ভূরাজনৈতিক খেলায় প্রবেশ করছে। জনগণ যদি নিজেদের রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে উপলব্ধি করে, তাহলে বাংলাদেশ আর ভারতের নিরাপত্তাবলয়ের নীরব উপাদান থাকতে পারে না। এই অবস্থান ভবিষ্যতে আঞ্চলিক রাজনীতিকে বাধ্য করবে বাংলাদেশের জনগণকে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গণ্য করতে।

উপমহাদেশের রাজনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব

বাংলাদেশের জনগণের এই আত্মোপলব্ধি শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। উপমহাদেশের অন্যান্য প্রান্তÑ কাশ্মির, উত্তর-পূর্ব ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল সবখানেই জনগণ রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তির মধ্যকার অসম সম্পর্ক নতুন করে প্রশ্ন করছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এখানে একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। যদি বাংলাদেশে দিল্লিবিরোধিতা একটি গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী গঠনের ভাষায় রূপ নেয়, তবে তা উপমহাদেশে রাষ্ট্রকেন্দ্রিক স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে একটি নতুন বৌদ্ধিক ও রাজনৈতিক প্রবাহ সৃষ্টি করবে। এ কারণে বিষয়টি শুধু কূটনৈতিক নয়; এটি উপমহাদেশের রাজনৈতিক কল্পনার পুনর্গঠনের প্রশ্ন।

ভবিষ্যৎ নির্ধারক কেন

আগামী দিনে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নির্ধারিত হবে এই প্রশ্নেÑ রাষ্ট্র কি জনগণের ওপর আধিপত্য করবে, না জনগণ রাষ্ট্র ও আঞ্চলিক শক্তির সীমা নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশের জনগণের দিল্লিবিরোধিতা এই দ্বিতীয় সম্ভাবনার পক্ষে একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। এটি যদি গণতান্ত্রিক, সংগঠিত ও রাজনৈতিক রূপ পায়, তাহলে বাংলাদেশ শুধু নিজের রাজনৈতিক সত্তাই পুনর্গঠন করবে না; উপমহাদেশে ক্ষমতার ভাষাও বদলে দেবে। এই অর্থে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দিল্লিবিরোধিতা আর প্রান্তিক কোনো অনুভূতি নয়, এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির সূচক।

অতএব আবারও বলি, বাংলাদেশের জনগণের দিল্লিবিরোধিতা কোনো বিচ্যুতি নয়, কোনো ভুল চেতনা নয়। এটি তাদের নিজেদের রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে গঠনের সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। জুলাই গণঅভ্যুত্থান এই সত্যকে কেবল দৃশ্যমান করেনি; এটি তাকে ঐতিহাসিক কর্তব্যে পরিণত করেছে। এখন প্রশ্ন আর দিল্লিবিরোধিতা করা উচিত কি নাÑ প্রশ্ন হলো, এই বিরোধিতাকে আমরা অগোছাল আবেগে রেখে দেব, নাকি সচেতন রাজনৈতিক সত্তা গঠনের শক্তিতে রূপান্তর করব। এই রূপান্তরের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এবং উপমহাদেশের রাজনীতির নতুন দিকনির্দেশ নির্ধারিত হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা