আনু মুহাম্মদ
প্রকাশ : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:৩৭ এএম
আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:০৭ পিএম
মুক্তিযুদ্ধের দুই বয়ান; আনু মুহাম্মদ
মুক্তিযুদ্ধের বিষয় আলোচনায় সাধারণভাবে প্রধান দুটি বয়ান পাওয়া যায়। একটি হলো, মুক্তিযুদ্ধ মানে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ যেটা নির্ধারণ করবে সেটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আওয়ামী লীগকে সমর্থন মানেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ। তাদের সব অপকর্ম মুক্তিযুদ্ধকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। আরেকটা প্রবণতা হলো, এর মধ্যে নানা বহিঃস্থ বিষয় চক্রান্তকে প্রধান করে তোলা। এই ধারার কথা হলো ভারতের চক্রান্ত ও তাদের স্বার্থসিদ্ধির মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। এরা মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে, গণহত্যাকেও আড়াল করে। এই দুটো চিন্তাধারার সাথেই আমি একমত নই।
এটা ঠিক যে, এখানে ভারতের নানারকম হিসাব-নিকাশ ছিল, তাদের ভূরাজনৈতিক নানা বিবেচনা ছিল। এটাও ঠিক যে, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের বলে যুদ্ধে যারা রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের যুদ্ধ কিংবা স্বাধীন বাংলাদেশ সম্পর্কে কোনো সমন্বিত দিকনির্দেশনা ছিল না, সে কারণে তাদের মধ্যে অনেক রকম দ্বন্দ্ব-সংঘাতও ছিল। ইতিহাস অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে, কী রকম একটা খুবই সূক্ষ্ম তারের ওপর পুরো যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদকে পাই এমন একটি চরিত্র হিসেবে যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধকে সফল করবার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। কিন্তু অনেক ধরনের চাপ ও বৈরিতা তাকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। স্বাধীনতার পরও তাকে সেসবের চাপ বহন করতে গিয়ে ক্ষতবিক্ষত হতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক হয়েও তাজউদ্দীন আহমদ আওয়ামী লীগ সরকারে টিকতে পারেননি, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চক্রান্ত করেও মুশতাক থাকতে পেরেছিলেন।
কিন্তু এসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও একটা বর্বর দখলদার সেনাবাহিনীর আক্রমণ মোকাবিলা করতে গিয়ে বাংলাদেশের জনগণের যে শক্তি, সাহস, তার চেতনা, প্রত্যাশা ও স্বপ্ন ১৯৭১ তৈরি করেছে, তার বিশালত্ব ছোট করার চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই অপচেষ্টা গণহত্যার সহযোগীদের মধ্যেই দেখা যায় বেশি। ’৭১-এ আমরা দেখেছি জনযুদ্ধ, বাংলাদেশের মানুষের এক মহান অভ্যুদয়। কতিপয় আলবদর রাজাকার বাদ দিলে বাকি সকলের সম্মিলিত অসামান্য প্রতিরোধ ও সৃষ্টির সময় তখন। প্রকৃতপক্ষে ১৯৭১ সাল মুক্তিযুদ্ধের শুরুও নয়, ১৯৭১ সাল বাংলাদেশের মানুষের মুক্তিযুদ্ধের শেষও নয়। বাংলাদেশের কিংবা এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের মুক্তিযুদ্ধের একটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ১৯৭১, সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের যুদ্ধ এই জনপদের মানুষের দীর্ঘদিনের মুক্তির যুদ্ধের ধারাবাহিকতার একটি অংশ।
একটি জনগোষ্ঠীর এই সাহস বা শক্তি একটা নির্দিষ্ট সময়ে তৈরি হয় না, তার একটা ধারাবাহিকতা থাকে। ১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ হচ্ছে আমরা তখন মানুষের মুখে ক্ষুদিরামের গান শুনি কিংবা সূর্যসেনের গল্প শুনি, ব্রিটিশবিরোধী লড়াই, তেভাগা আন্দোলন, তেলেঙ্গানা আন্দোলন তাকে শক্তি দেয়। শুধুমাত্র দেশের অতীত থেকে শুনি তা না, ভিয়েতনামের গল্প আসে, চীনের দীর্ঘস্থায়ী জনযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, ব্রিটিশবিরোধী ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের যারা স্মরণীয় তাদের কথা আসে, গল্প আসে, উপন্যাস আসে, এমনকি প্রাচীনকালের দাসবিদ্রোহ থেকে শুরু করে ফরাসি বিপ্লব, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মিথÑ সবকিছুই আমাদের কোনো না কোনোভাবে উত্সাহিত করে, শক্তি দান করে। এই যোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটা অঞ্চলে, একটা এলাকায়, একটা ধারাবাহিকতায়, একটা পরম্পরায় যে লড়াইগুলো হয় সেই লড়াইগুলো অচেতনে থেকেই যায়, নিঃশেষ হয়ে যায় না। অনেক লড়াই আছে যা আপাতদৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়। প্রকৃতপক্ষে অনেক ব্যর্থতার ওপরই সাফল্য দাঁড়ায়।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি আমরা বলি, তাহলে চেতনার একটা দিক তো ছিল বটেই একটা নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। ’৭১-এর যুদ্ধে সমাজের বিভিন্ন অংশ বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করেছে। একটি চেতনা তখন অভিন্ন ছিল যে, এমন একটি দেশ হবে যা পাকিস্তানের মতো হবে না, একটা নতুন ধরনের দেশ হবে। পাকিস্তানি বাহিনীর কতিপয় সহযোগী বাদে সবাই একমত ছিলেন যে, বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এখন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে, কিন্তু অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হয়নি। শ্রেণি, বর্ণ, ধর্ম, জাতিবৈষম্য থেকে মুক্ত রাষ্ট্রের স্বপ্ন থেকে তা এখনও অনেক দূরে।
এগুলো হয়নি বলে মুক্তিযুদ্ধ ব্যর্থ তা নয়, বরং আমাদের বলতে হবে মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতা এখন পর্যন্ত চলছে। আমরা মুক্তির যুদ্ধের মধ্যেই আছি। যত ধরনের লড়াইয়ে আমরা আছি স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, সাম্রাজ্যবাদসহ বিদেশি আধিপত্য, লুণ্ঠন, দখল, পাচারবিরোধী লড়াই কিংবা মানুষের নতুন সমাজের জন্য লড়াই, দেশ ও দেশের সম্পদের ওপর জনগণের মালিকানার লড়াই, শ্রেণিগত-লিঙ্গীয়-জাতিগত-ধর্মীয় বৈষম্য ও নিপীড়নবিরোধী লড়াই, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লড়াই, নারীসহ লিঙ্গীয় অধস্তনতাবিরোধী লড়াই সবগুলোই মুক্তিযুদ্ধের শক্তি ও চৈতন্যের ধারাবাহিকতা। সেজন্যই তা চলমান।
বস্তুত ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের যে স্পিরিট, সাহস বা চেতনা, তাকে স্পর্শ না করে বাংলাদেশের মানুষের মুক্তির অবিরাম লড়াই অগ্রসর করা যাবে না। মানুষের মুক্তির যুদ্ধকে অব্যাহত রাখায় তাই ১৯৭১-কে চিরজাগরূক রাখতে হবে।