হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:১৯ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
২০০৭ সালের আগে চট্টগ্রাম বন্দরে একটি জাহাজের গড় অবস্থানের সময় ছিল সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১২ দিন। জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম বেশি হওয়ায় তখন ক্ষতি হতো আমদানিকারক ও রপ্তানিকারক উভয়েরই। অতিরিক্ত মাশুল গুনতে হতো বিদেশি জাহাজ মালিকদের। তাই অনেক কোম্পানিই চাইতেন না চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ পাঠাতে। শ্রমিক সংগঠনগুলো সময়ে অসময়ে ডেকে বসত ধর্মঘট। ফলে ব্যাহত হতো আমদানি করা পণ্যের সরবরাহ। সময়মতো কাঁচামাল খালাস করতে পারতেন না শিল্প মালিকরা।
তবে সময় পাল্টেছে। ২০১৫ সালে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পুরোদমে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়ার পর চট্টগ্রাম বন্দরে কমে এসেছে জাহাজের টার্ন অ্যারাউন্ড টাইম। জাহাজের গড় অবস্থান কমে আসায় পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে কমে আসে খরচ। শুধু তাই নয়, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজনের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে বেড়েছে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা। ২০০৭ সালে যেখানে বন্দরে ৯ লাখ ৫৮ হাজার টোয়েনটি ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিটস (টিইইউস) কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হতো, সেখানে ২০১৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০ লাখ ১৯ হাজার টিইইউসে।
বন্দর ব্যবহারকারীরা বলছেন, দেশে প্রতি বছরই আমদানি-রপ্তানির ভলিউম বাড়ছে। সেই অনুপাতে বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হলে নতুন নতুন কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণের বিকল্প নেই। অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব ওমর ফারুক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘জার্মানভিত্তিক একটি কনসালট্যান্সি ফার্মের সমীক্ষায় উঠে এসেছে দেশে প্রতি বছর কন্টেইনার হ্যান্ডলিং গ্রোথ হচ্ছে ১০ থেকে ১২ শতাংশ। বাড়তি এই কন্টেইনার হ্যান্ডলিং কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আমাদের নতুন নতুন কন্টেইনার টার্মিনাল দরকার। বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই লক্ষ্যে কাজ করছে। লালদিয়ার চরে এপিএম টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে, বে-টার্মিনালে তিনটি টার্মিনাল তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো চালু হলে বন্দরের সক্ষমতা অনেক গুণ বেড়ে যাবে। সরকার জাতীয় বন্দর কৌশল (ন্যাশনাল পোর্ট স্ট্র্যাটেজি) তৈরি করছে। এর আওতায় দেশের কোথায় কোথায় বন্দরে সক্ষমতা বাড়ানো যাবে, নতুন নতুন কন্টেইনার টার্মিনাল তৈরি করা যাবে সেটি নিয়ে জাইকার একটি টিম কাজ করছে।’
একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, আগামী ২০৩০ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে ৬৩ লাখ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করতে হতে পারে। ২০৩৫ সালে গিয়ে তা দাঁড়াবে ৮৬ লাখ টিইইউসে এবং ২০৪১ সালে এটি গিয়ে ঠেকবে ১ কোটি ১৪ লাখ টিইইউসে। একই সময়ে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণও বাড়বে। ২০২৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে ১২ কোটি ৯০ লাখ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং করতে হতে পারে। ২০৪০ সালে এটি উন্নীত হবে ১৭ কোটি ৮ লাখ মেট্রিক টনে।
যেভাবে শুরু বন্দরের কার্যক্রম
ইংরেজ শাসনের প্রথম দিকে ইংরেজ ও দেশীয় ব্যবসায়ীরা বার্ষিক এক টাকা সেলামির বিনিময়ে নিজ ব্যয়ে কর্ণফুলী নদীতে কাঠের জেটি নির্মাণ করেন। পরে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম দুটি অস্থায়ী জেটি নির্মিত হয়। ১৮৭৭ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার গঠিত হয়। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম বন্দরে দুটি মুরিং জেটি নির্মিত হয়। ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার কার্যকর হয়। ১৮৯৯-১৯১০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার ও আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে যুক্তভাবে চারটি স্থায়ী জেটি নির্মাণ করে। ১৯১০ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের সঙ্গে রেলওয়ে সংযোগ সাধিত হয়। ১৯২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে মেজর পোর্ট ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তান আমলে ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনারকে চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্ট-এ পরিণত করা হয়, বাংলাদেশ আমলে ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্টকে চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটিতে পরিণত করা হয়। এরপর পর ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে এমভি বাঙ্গাল প্রোগ্রেস নামে একটি জাহাজে আনা কন্টেইনার ডেলিভারির মধ্যদিয়ে প্রথম এ কার্যক্রম শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে কন্টেইনারে পণ্য আমদানি-রপ্তানি।
আমদানি-রপ্তানির ভলিউম বাড়ার কারণে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় কর্তৃপক্ষ। সক্ষমতা বাড়াতে প্রথমে নির্মাণ করা হয় চট্টগ্রাম কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি)। এরপর পর্যায়ক্রমে নির্মাণ করা হয় নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি)। এনসিটি এবং পিসিটি নির্মাণের কারণে বন্দরে বার্ষিক কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বেড়েছে ১৮ লাখ টিইইউস। এ দুটির পর এখন আরও ৪টি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে একটি লালদিয়ার চরে এপিএম কন্টেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়েছে। বে-টার্মিনাল এলাকায় তিনটি টার্মিনাল নির্মাণের কাজও এগিয়ে যাচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এপিএম টার্মিনাল এবং বে-টার্মিনালের কন্টেইনার টার্মিনাল-১-এর নির্মাণকাজ শেষ হতে পারে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ দুটি কন্টেইনার টার্মিনাল চালু হলে বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা বাড়বে অন্তত ২৩ লাখ টিইইউস। এর বাইরে বন্দরের অধীনে কক্সবাজারে মাতারবাড়ীতে নির্মাণ করা হচ্ছে গভীর সমুদ্র বন্দর। বন্দরটি চালু হলে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়বে ১১ লাখ টিইইউস।
সক্ষমতা বৃদ্ধির চালচিত্র
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বন্দরের জেনারেল কার্গো বাথ (জিসিটি) টার্মিনাল, চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), মোংলা বন্দর, পায়রা বন্দর, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) মিলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩২ লাখ ৯৬ হাজার টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা হয়। এসব টার্মিনালের পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং শুরু হলে ২০২৭ সালে বাংলাদেশে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা গিয়ে দাঁড়াবে ৪৯ লাখ টিইইউসে।
এরপর ২০৩০ সালে এপিএম কন্টেইনার টার্মিনাল এবং বে-টার্মিনাল (সিটি-১) চালু হলে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের সক্ষমতা হবে ৬২ লাখ টিইইউস। ওই সময় জিসিটি, সিসিটি এবং এনসিটিতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টিইইউস। মোংলা বন্দরে এক লাখ ২০ হাজার টিইইউস থেকে সক্ষমতা বেড়ে তখন হ্যান্ডলিং হবে ১ লাখ ৯০ হাজার টিইইউস। ৮০ হাজার টিইইউস থেকে বেড়ে পায়রা বন্দরে তখন কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হবে ১ লাখ ২০ হাজার টিইইউস। ২ লাখ ৫০ হাজার টিইইউস থেকে বেড়ে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হবে ৪ লাখ টিইইউস। এক লাখ ২০ হাজার থেকে বেড়ে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে ২ লাখ ৯০ হাজার টিইইউস। অন্যদিকে নতুন চালু হওয়া এপিএম টার্মিনালের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা হবে ৫ লাখ ৫০ হাজার টিইইউস এবং বে-টার্মিনালে (সিটি-১) কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা তৈরি হবে ১৮ লাখ টিইইউস।
২০৪০ সালে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের এই সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়াবে এক কোটি ১৪ লাখে। তখন জিসিটি, সিসিটি এবং এনসিটিতে কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা তৈরি হবে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টিইইউস। মোংলা বন্দরে হবে ৬ লাখ ৩০ হাজার টিইইউস। এ ছাড়া পায়রা বন্দরে ৩ লাখ ৯০ হাজার টিইইইউস, পিসিটিতে ৫ লাখ টিইইইউস, মাতারবাড়ীতে ৬ লাখ ৩০ হাজার টিইইউস এবং এপিএম টার্মিনালে ১০ লাখ টিইইউস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দেখা দেবে। বে-টার্মিনালের কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা তখন হবে ৩৬ লাখ টিইইউস।
যা আছে ত্রি-পঞ্চবার্ষিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিবেদনে
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ত্রি-পঞ্চবার্ষিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রতিবেদনেও একই ধরনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ত্রি-পঞ্চবার্ষিক সক্ষমতা বৃদ্ধির এই প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে সব মিলিয়ে বন্দরের সক্ষমতা রয়েছে ৩৩ লাখ টিইইউস। ২০৩০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরের সক্ষমতা আরও ৪০ লাখ টিইইউস বাড়বে। এর মধ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরে ৮ লাখ, বে-টার্মিনাল সিটি-১ এ ১৮ লাখ, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালে ৫ লাখ ও লালদিয়া টার্মিনালে ৯ লাখ টিইইউস কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়বে।
চলমান এই প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে বে-টার্মিনাল (সিটি-২) তৈরি সম্পন্ন হবে। এতে করে আরও ১৮ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি ২০৪০ সালের মধ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দরের টার্মিনালগুলো চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মাতারবাড়ীতে নতুন করে ১৬ লাখ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা তৈরি হবে।