সাক্ষাৎকার : ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান
হুমায়ুন মাসুদ
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৪:৩৯ পিএম
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান
নতুন জাহাজ নির্মাণের বৈশ্বিক ইতিবাচক প্রভাব দেশের শিপ বিল্ডিং খাতেও লেগেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে নতুন জাহাজ নির্মাণের কার্যাদেশ পেতে শুরু করেছে দেশীয় শিপ ইয়ার্ডগুলো। দেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্পের অগ্রগতি নিয়ে কথা বলেছেন ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হুমায়ুন মাসুদ
প্রশ্ন : ওয়েস্টার্ন মেরিনের বর্তমান অব্স্থা কী? মন্দা অবস্থা কেটেছে কি?
উত্তর : ওয়েস্টার্ন মেরিন ২০০০ সালে যাত্রা শুরু করে। এরপর ২০০৫ সাল থেকে ২০০৮-এর মধ্যে আমরা ইউরোপ থেকে বেশকিছু জাহাজ তৈরির ওয়ার্কঅর্ডার পাই। জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ইকুয়েডর, নরওয়ে ও ডেনমার্কের মতো উল্লেখযোগ্য দেশ থেকেও অর্ডার পাই। ওই জাহাজগুলো নির্মাণ করে দক্ষতার সঙ্গে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করি। আফ্রিকার কেনিয়ার জন্যও আমরা জাহাজ তৈরি করি। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ৪টি জাহাজ রপ্তানি করেছি। এরপর বৈশ্বিক মন্দা, করোনা মহামারি- এসব মিলিয়ে বৈশ্বিক বাজারে নতুন জাহাজ নির্মাণের চাহিদা কমে যায়। তবে ২০২২-২০২৩ সাল থেকে বৈশ্বিক বাজারে নতুন জাহাজ নির্মাণ বাড়ছে। আমরা মন্দাবস্থা কাটিয়ে উঠতে শুরু করেছি, নতুন করে অর্ডার পাচ্ছি। ২০২৩ সালের দিকে আমরা মারওয়ান শিপিংয়ের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের ৮টি জাহাজ রপ্তানির অর্ডার পেয়েছিলাম। ওই ৮টি জাহাজের মধ্যে ৬টি ইতোমধ্যে হস্তান্তর করেছি। বাকি দুটি নির্মাণাধীন আছে।
প্রশ্ন : চলতি বছর আপনারা ৬টি জাহাজ রপ্তানি করেছেন। ২০২৬ সালে কয়টি জাহাজ রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে?
উত্তর : আমরা এই বছর এখন পর্যন্ত ৬টি জাহাজ রপ্তানি করেছি। আরও দুটি জাহাজের নির্মাণকাজ এখন চলমান আছে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আরও তিনটি জাহাজ রপ্তানির একটি অর্ডার নিয়ে ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলছে। আগস্ট মাসে নরওয়ের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একটি জাহাজ নির্মাণের জন্য আমরা চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যে এই জাহাজের নির্মাণকাজ শুরু করব। আশা করছি, ২০২৬ সালে আমরা ১০টির বেশি জাহাজ রপ্তানি করতে পারব।
প্রশ্ন : দেশীয় জাহাজ নির্মাণে কেমন সাড়া পাচ্ছেন?
উত্তর : তার আগে বলি, বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় কিন্তু বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। এখানে আগে ছিল শুধু চট্টগ্রাম বন্দর, এখন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর হচ্ছে। এপিএম টার্মিনাল হচ্ছে, বে-টার্মিনাল হচ্ছে। পানগাঁও টার্মিনাল আছে। বন্দরের সম্প্রসারণের কারণে আগামী কয়েক বছর দেশেও অনেক টাগবোট ও ছোট জাহাজের চাহিদা তৈরি হবে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্র বন্দর, এপিএম টার্মিনাল, বে-টার্মিনাল হলে এখন যেই পরিমাণ টাগবোট ও সার্ভিস ভ্যাসেল আছে, তার তিনগুণ প্রয়োজন পড়বে। তাই বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধÑ যদি দেশি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের এসব জাহাজ, টাগবোট নির্মাণ করার সক্ষমতা থাকে, তাহলে সেসব প্রতিষ্ঠানকে দিয়েই এসব তৈরি করুন। এতে একদিকে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে, অন্যদিকে দেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বিকশিত হবে। তাই দেশি জাহাজ নির্মাণে দেশি শিপ বিল্ডিং প্রতিষ্ঠানকেই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
প্রশ্ন : ইউরোপের দেশগুলো থেকে কেমন অর্ডার পাচ্ছেন?
উত্তর : ইউরোপের যেসব দেশে আমরা আগে জাহাজ রপ্তানি করেছিলাম, সেই সব ক্রেতা আমাদের কাছে আবারও জাহাজ নির্মাণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কারণ ওদের আমরা যেসব জাহাজ দিয়েছিলাম, সেগুলো মানসম্মত, সেগুলো এখনও ভালোভাবে চলছে। ২০ বছরের মতো সময় ধরে জাহাজগুলো ভালো সার্ভিস দেওয়ায় ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও জাহাজ তৈরির জন্য এগিয়ে আসছে। জার্মানির একটি প্রতিষ্ঠান মোট ১০টি জাহাজ নির্মাণ করার আগ্রহ জানিয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের কথা হচ্ছে। চলতি বছর অর্ডার চূড়ান্ত হলে আশা করছি ২০২৬ সালের মাঝামাঝি আমরা জাহাজগুলোর নির্মাণকাজ শুরু করতে পারব।
প্রশ্ন : ইউরোপের অর্ডার পেতে হলে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কীভাবে এগোতে হবে?
উত্তর : বিদেশি জাহাজ নির্মাণের অর্ডার পাওয়ার মতো অনেক সুযোগ আর দক্ষতা- দুটোই আছে আমাদের। কারণ আমরা কম খরচে অনেক দক্ষ এবং আধা দক্ষ জনশক্তি কাজে লাগাতে সক্ষম। যেটি জাহাজ নির্মাণকারী বড় বড় দেশের কোথাও নেই। তাই আমরা চেষ্টা করলেই বৈশ্বিক বাজার ধরতে পারি। তবে এজন্য আমাদের প্রচার চালাতে হবে। কারণ ইউরোপের দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশ পরিচিত শিপ ব্রেকিং কান্ট্রি হিসেবে। বাংলাদেশে যে বিশ্বমানের জাহাজ নির্মাণ করা হয়, সেটি তারা খুব একটা জানে না। বাংলাদেশ যে মানসম্মত জাহাজ নির্মাণ করে এটি আমাদের বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে হবে। সরকার তৈরি পোশাক শিল্পের বাজার ধরতে বিভিন্ন দেশে মেলা করে; ঠিক একইভাবে সরকার জাহাজ নির্মাণ শিল্পকেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই ও আফ্রিকার কিছু দেশে এক্সপোর মাধ্যমে তুলে ধরতে পারে।