আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৩:৩১ পিএম
আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৫:১৪ পিএম
চট্টগ্রাম বন্দরের অন্দরে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা ঘুষ, অনিয়ম আর সিন্ডিকেটের সাজানো ‘মধুচক্রে’ অবশেষে ফাটল ধরেছে। এতদিন টাকার বিনিময়ে নিয়ম ভেঙে সুবিধামতো পণ্য খালাসের যে অলিখিত রাজত্ব কাস্টমস, অপারেটর ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টেদের হাতে তৈরি হয়েছিল, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) বিদেশি অপারেটর ‘রেড সি গেটওয়ে’ দায়িত্ব নেওয়ার পর তাতে বড়সড় ধাক্কা লেগেছে। বহু বছর ধরে চলে আসা একই কন্টেইনারের পণ্য ভিন্ন সময়ে খালাস, টার্মিনালের ভেতরে ছোট গাড়ি ঢুকে অপারেশন ধীর করে দেওয়া, নিয়ম ভেঙে জরুরি ডেলিভারি নেওয়া এবং অঘোষিত নানা লেনদেন হঠাৎ কঠোর নিয়ন্ত্রণে পড়ায় বন্দরকেন্দ্রিক অনিয়মের সুবিধাভোগী চক্র নিজেদের আধিপত্য হারানোর শঙ্কায় এখন মুখোমুখি অবস্থানে।
এ ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এলসিএল (ধারণক্ষমতার চেয়ে কম লোড) পণ্য খালাস প্রক্রিয়া। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যখন কোনো পণ্যের চালান একটি পুরো কন্টেইনার ভর্তি করার জন্য যথেষ্ট না হয়, তখন সেই চালানকে এলসিএল বলা হয়। এই পদ্ধতিতে একই কন্টেইনারে একাধিক বিক্রেতার পণ্য একসঙ্গে পাঠানো হয়, যা ফুল কন্টেইনার লোড (এফসিএল)। চট্টগ্রাম বন্দরে এফসিএল পণ্য টার্মিনাল থেকেই ডেলিভারি দেওয়া হয়। এতদিন বন্দরের ভেতর থেকে অবৈধ সুবিধায় এসব পণ্য খালাস করা গেলেও রেড সি গেটওয়ে আন্তর্জাতিক মান ও কাস্টমসের শতভাগ নিয়ম মেনে তা অফডকে পাঠিয়ে দিচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন টেবিলের নিচ দিয়ে চিরাচরিত ঘুষের লেনদেন ও হয়রানি কমেছে, অন্যদিকে অফডকের বাড়তি খরচ ও সময়ের হিসাব মেলাতে গিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন আমদানিকারক ও এজেন্টরা।
চট্টগ্রাম বন্দরে এফসিএল পণ্য টার্মিনাল থেকেই ডেলিভারি দেওয়ায় ছোট ছোট গাড়ি ঢুকে অপারেশন গতিহীন হওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের, কিন্তু এটি বন্ধ করা যায়নি। কারণ বন্দরের ডিপোর বদলে অফডগ থেকে পণ্য খালাস করতে গেলে আমদানি-রপ্তানিকারককে বেশি ভাড়া গুনতে হবে।
ফলে অপারেশনের গতি বাড়ানোর স্বার্থে এফসিএল অফডগে পাঠিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও অপারেটর, কাস্টমস, কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্টদের যোগসাজোশে বন্দরের ভেতর থেকেই এলসিএল খালাস হয়ে আসছে সব সময়। অনেক সময় একই কন্টেইনারে থাকা বিভিন্ন ধরনের পণ্যের আমদানিকারক সুবিধামতো একেক সময়ে পণ্য ডেলিভারি নেন। এক্ষেত্রে কাস্টমসের নিয়ম হলো একই দিন সব পণ্য ডেলিভারি নিতে হবে। চট্টগ্রাম বন্দরে কাস্টমস অফিসারদের ম্যানেজ করে ইচ্ছামতো সুবিধাজনক সময়ে একই কন্টেইনারের পণ্য ভিন্ন সময়ে ডেলিভারি নেন আমদানিকারকরা। এখানেও কাস্টমস কর্মকর্তা, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও অপারেটরের কর্মকর্তাদের একটি যোগসাজশ রয়েছে।
টাকার বিনিময়ে এমন ছোট-বড় নানা অনিয়মের একটি মধুচক্র দীর্ঘদিন ধরে রাজত্ব করছে চট্টগ্রাম বন্দরে। এক্ষেত্রে একটা বড় পরিবর্তন দেখা গেছে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালে। ব্যবসায়ীদের সুবিধামতো এসব নিয়ম ভাঙার বদলে নিয়ম রক্ষা করে অপারেশন পরিচালনায় জোর দিচ্ছে এই টার্মিনালের অপারেটর রেড সি। এটিকে ভালো বললেও এর ফলে নানা অসুবিধার মুখে পড়ার কথা বলছেন ব্যবসায়ী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা। বন্দর কাস্টমসের বিভিন্ন কর্মকর্তাদেরও বিদেশি অপারেটরের বিরুদ্ধে চাকরিবিধি ভেঙে খুব সোচ্চার ভূমিকায় দেখা যাচ্ছে। এটা এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যে, দুবার এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন দিয়ে কর্মীদের সতর্ক করেছে চট্টগ্রাম বন্দর।
কেন এমন পরিস্থিতি এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিভিন্ন সিন্ডিকেট তৈরি করে নিয়ম কানুন ভাঙার মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার বন্দরকেন্দ্রিক যে মধুচক্র সেটি ভেঙে যাওয়ার শঙ্কা থেকে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এতদিন ধরে বাংলাদেশে শুধু দেশি অপারেটররাই জেটি ও টার্মিনাল পরিচালনা করলেও গত দুই বছর ধরে পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে বিদেশি অপারেটর রেড সি। দেশি ও বিদেশি অপারেটরের ক্ষেত্রে কী সুবিধা, কী অসুবিধা মোকাবেলা করছেন এ বিষয়ে জানতে বেশ কয়েকজন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করা হইয়েছে। তাদের বেশ কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।
তেমনই একজন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কিছু সমস্যা হচ্ছে। তবে এটা পরিপার্শ্বিকতার কারণে। তবে সুবিধাও অনেক। যেমন ঘুষের লেনদেন কমে যাচ্ছে। আগে পণ্য খালাস করতে কাস্টমস অফিস থেকে ৭-৮ জনের স্বাক্ষর নিতে হতো। এদের প্রত্যেককে বাধ্যতামূলক ঘুষ দিতে হতো। পরিমাণ সামান্য, কিন্তু এটা নিয়ম হয়ে গেছে। পিসিটিতে এই ৬-৭ জনের কাছে যেতেই হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্টস নিয়ে সেখানে ডেডিকেটেট কর্মকর্তার কাছে গেলেই কাজ হচ্ছে। ফলে টেবিলে টেবিলে ঘুরা, ঘুষ দেওয়াÑ এটা কমছে।’
তবে এটার অসুবিধাও আছে জানিয়ে ওই সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বলেন, ‘আমরা বন্দরের ডিপো থেকে কন্টেইনার খুলে পণ্য নিতে পারতাম। এখন এটা চলে যাচ্ছে অফডগে। বন্দরে থাকলে যেখানে আমার দিনে তিন হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হতো, সেখানে বেসরকারি ডিপোতে গড়ে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হবে। খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আগে ধরেন ইমার্জেন্সি ডেলিভারির দরকার হলে কাস্টমসকে ম্যানেজ করে নিয়ম ভেঙে আমি দিনে দিনে ডেলিভারি নিতে পেরেছি। কিন্তু পিটিসিতে সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তারা এফসিএল পাঠিয়ে দিচ্ছে অফডগে। আবার একসঙ্গে ডেলিভারি ছাড়া দিচ্ছে না। ফলে অনেককে তার একই কন্টেইনারে থাকা অন্য আমদানিকারকের জন্য দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কিন্তু এখানে পিসিটির কিছু যায় আসে না। তারা নিয়ম ভাঙছে না।’
এর বাইরেই মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি, স্ক্রিনিং ছাড়া জালিয়াতি করে অবৈধ পণ্য খালাসসহ নানামুখী অনিয়মের একটি বড় চক্র রয়েছে টার্মিনাল ও জেটিগুলোকে কেন্দ্র করে। প্রায়ই এমন বিভিন্ন চক্র ধরা পড়লেও চক্রের মূল হোতারা সব সময় থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। শতভাগ নিয়ম মেনে টার্মিলান অপারেটিং শুরু হলে এই চক্রে বড় একটি ধাক্কা আসবে এই আলোচনাও চলছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
কেন এসব বিষয়ে পরিচয় দিয়ে কথা বলতে চান না এমন প্রশ্নের জবাবে ওই এজেন্ট বলেন, ‘তাদের নিয়ম মানার যে প্রবণতা সেটা ভালো। কিন্তু আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক অবস্থাটাও আপনি ভাবুন। এখানে এই নিয়মগুলো পালন করতে গেলে নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যেমন ধরেন ব্যবসায়ীর খরচ বেড়ে যাচ্ছে, আবার গার্মেন্টসের যে পণ্য সেটা বিলম্বিত হলে তার উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটবে, শিপমেন্টেও এর প্রভাব পড়বে। এসব কারণে এখানে অনিয়মগুলো হচ্ছে। এগুলো করছে যারা, তারা তো আমাদেরই ফোরামের। অনেক ক্ষেত্রে আমিও এসবে জড়িত হচ্ছি। কাজেই যত যাই হোক এসব কথা বলেতো আমি ফোরামে দাঁড়াতে পারব না।’
সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এসএম সাইফুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেখুন এগুলো কোনো বিষয় না। অপারেটরের কাজ অপারেটিং করা। অপারেট করার সক্ষমতা দেশীয় অপারেটরদের আছে। তাদের ইকুইপমেন্ট নাই। বিদেশিরা ওদের মতো করে মেটারিয়াল আনছে। তবে পিটিসি এখনও পুরো গুছিয়ে উঠতে পারেনি। তাদের পার্ফরম্যান্সে আমরা সন্তুষ্ট না। আমাদের অপারেটরদের ইকুইপমেন্ট প্রযুক্তি দিলে তারাও ভালো করবে।’
বিদেশি অপারেটররা নিজেরা ইকুইপমেন্ট ও প্রযুক্তি আনছে, দেশীয় অপারেটর দীর্ঘদিনে কেন সেটি করেনি এই বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘পিটিসি এখনও সব আনেনি। তারা ধীরে ধীরে আনছে।’
অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক বন্দর বিষয়ক সম্পাদক লিয়াকত আলী হাওলাদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘দেশি অপারেটর বিদেশি অপারেটর নিয়ে আমার অন্য বিষয়ে আপত্তি নেই। আমার আপত্তির জায়গা হলো যে টার্মিনালগুলো আমরা করেছি সেগুলো কেন বিদেশিরা চালাবে। লালদিয়ার চরে যে টার্মিনালের জায়গা লিজ দেওয়া হয়েছে এখানে আমি অসুবিধা দেখি না। তারা নিজেরা টার্মিনাল বানিয়ে নিজেরা চালাবে। কিন্তু যেটা বাংলাদেশের টাকায় হয়েছে সেটা কেন বিদেশিদের দিতে হবে। এটা দেশিরা চালালে আয়ের টাকাটা দেশে থাকত।’