সাক্ষাৎকার : কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম
আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫ ১৩:৪০ পিএম
ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ, ডেবিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং এবং এটিএমসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছে রূপালী ব্যাংক। বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রযুক্তি গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এ ব্যাংক কাজ করছে। প্রতিদিনের বাংলাদেশের সঙ্গে আলাপচারিতায় এ নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ ফেরদাউস খান
প্রশ্ন : ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের জন্য নতুন কী কী সেবা চালু করেছেন?
উত্তর : আমি যোগদান করার পর ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছি। ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রযুক্তি গ্রাহকের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে আমরা মহাব্যবস্থাপক পদমর্যাদার একজন চিফ ইনফরমেশন টেকনোলজি অফিসার নিয়োগ দিয়েছি। চালু করেছি ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপ। আমাদের অন্য সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে ডেবিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং, এটিএম, নিরাপত্তার উদ্ভাবন : টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন, অ্যাকাউন্ট অ্যালার্ট ও বায়োমেট্রিক অথেন্টিকেশন।
প্রশ্ন : ভবিষ্যতে আর কী কী আমানত স্কিম চালু করতে চায় রূপালী ব্যাংক?
উত্তর : রূপালী ব্যাংক ভবিষ্যতে গ্রাহকের চাহিদা, আর্থিক নিরাপত্তা ও সুবিধাকে কেন্দ্র করে নতুন আমানত ও সঞ্চয় স্কিম চালুর পরিকল্পনা করছে। আমরা খুব শিগগিরই ১০ শতাংশ সুদে ৫ বছর মেয়াদে প্রবাসীদের জন্য আমানত স্কিম চালু করব। এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশি ও রেমিট্যান্স গ্রহণকারী (বেনিফিসিয়ারি) ব্যক্তিদের বিশেষ সুবিধা দিতে সঞ্চয়ী হিসাব চালু করা হবে।
প্রশ্ন : আমানতের নিরাপত্তা ও জনগণের আস্থা বাড়াতে করণীয় কী?
উত্তর : ব্যাংকিং খাতে আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জনগণের আস্থা বাড়াতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি সুসংগঠিত ও সামগ্রিক কৌশল নিতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাংকগুলোর কার্যক্রমে কঠোর তদারকি কার্যকর করা এবং সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন, যা সমগ্র অর্থনৈতিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে। পাশাপাশি আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা বাড়ানোর লক্ষ্যে ডিপোজিট ইনস্যুরেন্স কাভারেজ সম্প্রসারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ব্যাংকিং সংকটের সময়ে গ্রাহকের আস্থা অটুট রাখবে। জনগণের আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও সঞ্চয়ের প্রতি উৎসাহ জাগানোর জন্য ব্যাপক ও কার্যকর আর্থিক শিক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এ ছাড়া একটি ক্যাশলেস সোসাইটি গঠনের মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যাংকিং সম্প্রসারণে সহায়তা করতে প্রয়োজনীয় আইন, নীতি ও নির্দেশিকা প্রণয়ন এবং কার্যকর করা অপরিহার্য। এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে ব্যাংকিং খাতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় করবে।
প্রশ্ন : ঋণ পুনরুদ্ধারে কী ধরনের অগ্রগতি হয়েছে?
উত্তর : ঋণ পুনরুদ্ধারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ২০২৫ সালকে আদায় বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ও অবলোপন ঋণ থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা (নগদ প্রায় ৬৬০ কোটি ও সমন্বয় ৪৪০ কোটি) আদায় হয়েছে। যা গত বছরের এই সময় থেকে ৫৮৬ কোটি টাকা বেশি। এ ছাড়া নীতি সহায়তার আওতায় এ ব্যাংকের মাধ্যমে এবং সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করেছেন ৬২ জন গ্রাহক। এদের ঋণে জড়িত টাকার পরিমাণ ১১ হাজার ৭৫৮ কোটি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ৩৬ জন গ্রাহকের নীতি সহায়তা অনুমোদন পাওয়া গেছে। এতে জড়িত টাকার পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৯৩১ কোটি। আশা করছি অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিশ্রেণিকৃত করা সম্ভব হবে। খেলাপিদের বিরুদ্ধে রূপালী ব্যাংক জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।
প্রশ্ন : দেশের বর্তমান আমানতের অবস্থা ও প্রবণতা কেমন?
উত্তর : দেশের ব্যাংকিং খাতে মেয়াদি আমানত ও বিনিয়োগে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটেছে, যা ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা এবং ঝুঁকি মোকাবিলায় সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে চলতি আমানত ও বিলে সামান্য হ্রাস লক্ষ করা গেছে যা মূলত অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রভাবের কারণে হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে আমানত ও ঋণের প্রবণতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল বা ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমানতের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তলবি আমানত গত জুলাইয়ে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ২ দশমিক ২৫ শতাংশ বেশি। আর মেয়াদি আমানত দাঁড়ায় ১৬ লাখ ৮২ হাজার ৫৪৯ কোটি টাকায়, যা গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ৯ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। মোট আমানত দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৮০ হাজার ১০৭ কোটি টাকায় যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি। একই ধারাবাহিকতায়, রূপালী ব্যাংকের আমানত ডিসেম্বর ২০২৪-এ ৬৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছিল। যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৭৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকা হয়েছে।
প্রশ্ন : আপনাদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটা জানতে চাই।
উত্তর : সাম্প্রতিক বছরগুলো বাংলাদেশের আর্থিক খাতের জন্য যেমন কঠিন ছিল, তেমনি রূপালী ব্যাংকের সামনেও একের পর এক চ্যালেঞ্জ এসেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, ডলার সংকট, আমদানি-নির্ভরতা এবং ঋণখেলাপির উচ্চ হার সব মিলিয়ে দেশের ব্যাংকিং খাত ব্যাপক চাপের মধ্যে পড়ে। এই প্রতিকূল পরিবেশে রূপালী ব্যাংক সংকটকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং দায়বদ্ধতার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটি খরচ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হ্রাস, নীতিনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং শাখাভিত্তিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের মাধ্যমে কর্মীদের দক্ষতা, সময়ানুবর্তিতা এবং গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে আধুনিক কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার, ই-ব্যাংকিং অ্যাপ ও মোবাইল ব্যাংকিং সেবা সম্প্রসারিত হয়েছে। এর ফলে একদিকে খরচ কমেছে, অন্যদিকে গ্রাহক সন্তুষ্টি বেড়েছে। রূপালী ব্যাংক প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কি️ন ডলার রেমিট্যান্স আহরণ করে দেশের তফসিলি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অষ্টম অবস্থানে রয়েছে যা আন্তর্জাতিক লেনদেনে ব্যাংকের সক্ষমতা ও আস্থার প্রতিফলন।